প্রকৃত জ্ঞানী ব্যক্তির কথা শুনুন! হে মহান সম্রাট, শিল্পী এবং লিপিকারের যোগ্য সম্মান দিন! সাহসী যোদ্ধা এবং বিশ্বস্ত ভত্যকে পুরষ্কৃত করুন। মরুর বুক থেকে নিশ্চিহ্ন করে ফেলুন দস্যুর দল। সাধারণ লোকের জন্যে উদাহরণ তৈরি করুন, তাদের জীবনাচরণের সঠিক পথ দেখান। কেবলমাত্র তাহলেই আমাদের এই মিশর আবারো সুখে-শান্তিতে মহান হবে।
মঞ্চের মাঝখানে হাঁটু গেলে বসে পরে ট্যানাস, দুই হাত প্রসারিত করে বলতে থাকে। হে ফারাও, আপনি আমাদের পিতা । আমাদের সমস্ত ভালোবাসা আপনার উদ্দেশ্যে। আমাদের এই ভালোবাসার প্রতিদান দিন। আমরা প্রার্থনা করি, আমাদের দাবি পূরণ করুন।
সেই মুহূর্ত পর্যন্ত আমার ট্যানাসের নির্বোধ বাগীতায় বিভোর হয়ে ছিলাম। সংবিৎ ফিরে পেতে তাড়াতাড়ি ইশারা করলাম যেনো পর্দা টেনে দেওয়া হয়। ধীরে ভেসে উজ্জ্বল সাদা পর্দা আড়াল করে ফেললো ট্যানাসকে। অবিশ্বাসের বজ্রাঘাতে নিঃশব্দে বসে থাকে জনতা, যেনো তারা চলৎশক্তিহীন হয়ে গেছে।
স্বয়ং ফারাও ভাঙলেন এই বিভোর। দাঁড়ালেন তিনি, প্রসাধন-চর্চিত তার মুখ ভাবাবেগহীন। ধীরে, সভাসদদের সঙ্গী করে মন্দির ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন। মাথা ঝুঁকিয়ে তাঁকে সম্মান জানানোর পূর্ব মুহূর্তে আমার মনিব ইনটেফের দিকে চেয়ে দেখলাম। তার চোখে-মুখে ছিলো নিঃশব্দ উল্লাস।
*
সেই রাতে মন্দির থেকে পাহারা দিয়ে ট্যানাসের বাসস্থানে দিয়ে এলাম ওকে, বন্দরের কাছে নিজের বাহিনীর সঙ্গে থাকে সে। পুরোটা সময় ওর পাশে থেকে কোমরের অস্ত্রে সতর্ক হাত রেখে চললাম, যে কোনো সময় আক্রমণের আশঙ্কা করছি। ট্যানাস কিন্তু নির্বিকার। আসলেই নিজের বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে যে বিপদ হতে পারে, সে সম্পর্কে সে এতটুকু সচেতন নয়।
সময় হয়ে এসেছিলো, কেউ একজনকে অবশ্যই উঠে দাঁড়িয়ে বলতে হতো কথাগুলো, কি বলো টাইটা? অন্ধকার গলিপথে জোরালো প্রতিধ্বনি তুলছে তার কণ্ঠস্বর । যেনো ওত পেতে থাকা আততায়ীকে আহ্বান জানাচ্ছে। কোনো প্রত্যুত্তর করা থেকে বিরত রইলাম আমি।
নিশ্চই এটা আশা কর নি তুমি, তাই না টাইটা? সত্যি করে বল । একদম অবাক হয়ে গিয়েছিলে না?
আমরা সবাই অবাক হয়েছিলাম, এবারে সম্মত হলাম ওর কথায়। এমনকি ফারাও পর্যন্ত।
কিন্তু উনি মনোযোগ দিয়ে শুনেছেন, টাইটা। সব কিছু। দারুন দেখালাম যা হোক, কী বলো?
যখনই র্যাসফারের পরিকল্পিত আক্রমণে ইনটেফের যোগসাজশ নিয়ে বললাম, উড়িয়ে দিলো ট্যানাস। এটা অসম্ভব, টাইটা। তোমার কল্পনা ওটা। ইনটেফ ছিলেন আমার বাবার ঘনিষ্ঠ বন্ধু। তিনি কেমন করে এটা করতে চাইবেন? আর তাছাড়া, আমি তার মেয়েজামাই হতে যাচ্ছি, তাই না? আহত শরীর নিয়েও প্রাণখোলা হাসিতে রাতের নৈশব্দ ভাঙে ট্যানাস।
তুমি ভুল ভেবেছিলে, বলে চলে সে। র্যাসফার নিজেই বড়াই করে মার খেলো। উচিত সাজা পেয়েছে। এতো জোরে আমাকে আলিঙ্গন করলো ট্যানাস, ব্যথা পেলাম। তুমি আজ রাতে দুই বার বাঁচিয়েছে আমাকে। তোমার কথা না শুনলে র্যাসফার এতক্ষণে মেরে ফেলতো আমাকে। কেমন করে এগুলো পারো তুমি? আমি নিশ্চিত, তুমি আসলে জাদু জানো, ভবিষ্যত দেখতে পাও। আবারো জোরে হেসে উঠে সে।
এই আনন্দে আমি কেমন করে বাধা দিই? ছোট্ট একটা বালকের মতো ও, কঠোর, বিশালদেহী বালক। ওকে ভালো না বেসে পারা যায় না। নিজেকে, এবং তার প্রিয়জনদের কী বিপদে সে ফেলেছে আজ, এটা এখন তাকে বোঝানো সম্ভব নয়।
থাক, আজ সে আনন্দে বিভোর থাকুক; কাল যুক্তি দিয়ে ওকে বোঝানোর একটা চেষ্টা করে দেখবো। বাড়ি ফিরে মাথার কাটাটা সেলাই করে দিলাম, অন্যান্য ক্ষতগুলোও পরিচর্যা করতে হলো। পচনের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্যে আমার নিজের তৈরি মধু এবং লতাগুল্মের মিশ্রণ লেপে দিলাম ক্ষতমুখে। সবশেষে, রাতের জন্যে লাল শেপেনের কড়া-মাত্রা খেতে দিয়ে ক্রাতাসের প্রহরায় রেখে এলাম তাকে।
মধ্যরাতের বহু পরে আমার প্রকোষ্ঠে ফিরে দেখি দুইজন ডাক পাঠিয়েছে আমাকে: আমার মিসট্রেস, লসট্রিস আর মুমূর্ষ র্যাসফার। র্যাসফারের দুই সঙ্গী মিলে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে চললো আমাকে। ঘামে জবজব কাপড়ের উপর শুয়ে অভিশাপ আর গালাগাল বকে চলছিলো সে; সেথ এবং অন্যান্য দেবতাদের ডাকছে তার এই করুণ অবস্থা দেখে যাওয়ার জন্যে।
ওহে, টাইটা! বহুকষ্টে এক কনুইয়ের উপর ভর দিয়ে মাথা একটু উঁচালো র্যাসফার আমাকে দেখে। এত ব্যথা-বিশ্বাস করবে না! আমার বুকে আগুন জ্বলছে। দেবতাদের কসম, সবগুলো হাড় ভেঙে গেছে, মাথায় এতো ব্যথা মনে হয় ছিঁড়ে যাবে!
চিকিৎসকই বলুন আর ক্ষত-নিরাময়কারী; একটা ব্যাপার আমি দেখেছি, আপনার সামনে কেউ কাতরাতে থাকলে সাহায্য না করে পারা যায় না, তা সে যতই র্যাসফারের মতো বমিজাগানিয়া জন্তু হোক না কেন। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে চামড়ার তৈরি থলে থেকে আমার চিকিৎসাবিদ্যার সরঞ্জাম খুলে কাজে লেগে পড়লাম।
র্যাসফারের নিজস্ব নির্ণয় সঠিক দেখে দারুন ভালো লাগলো; প্রচুর নীলা-ফোলা আর অগভীর কাটা-ছেঁড়া ছাড়াও কমপক্ষে তিনটে বুকের হাড় ভেঙেছে তার, মাথার পেছনে প্রায় আমার মুঠোর সমান একটা ফোলা। বুকের একটা হাড় এমনভাবে ভেঙে সরে গেছে, ফুসফুঁসে ঢুকে যাওয়ার আশঙ্কা ছিলো। দুই বর্বর সঙ্গী ধরে রাখলো র্যাসফারকে, ওদিকে আমি আগের জায়গায় বসলাম ভেঙে যাওয়া হাড়টা, গুঙ্গিয়ে, হুঙ্কারে, কান্নায় আস্ফালন করে চললো র্যাসফার। শেষমেষ, ভিনেগারে ভিজিয়ে একটা লিনেনের পট্টি বেঁধে দিলাম বুকের চারধারে। এতে করে, ভিনেগার শুকিয়ে গেলে সংকুচিত হয়ে কাপড়টা সেঁটে থাকবে বুকে।
