মঞ্চের পেছনে হতাশায় মুষরে পড়লাম আমি। এতক্ষণের বক্তব্যে কম করে হলেও পঞ্চাশজন প্রভাবশালী শত্রু তৈরি করেছে ট্যানাস। সামনের সারির অতিথি তাঁরা সবাই। একদিন এরাই উচ্চ-রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন হবেন। মনে-প্রাণে চাইছি, এবারে থেমে যাক ট্যানাস, কিন্তু সে বলে চলে।
হায়, দেবতাগণের ভূমি! আমি বলছি সেই বর্বর আর ডাকাত দলের কথা, যারা আজ ওত পেতে আছে প্রতিটি ঝোঁপের আড়ালে, পাহাড়ের চূড়ায়। আজ কৃষককে কাজ করতে হয় বর্ম পাশে রেখে, পথিক ভ্রমণ করে অস্ত্র হাতে।
সাধারণ জনতা আবারো সমর্থন জানায় ট্যানাসের কথায়। দস্যুদলের অত্যাচারে সমগ্র মিশর আজ অতিষ্ঠ। শহরের কাদার তৈরি দেওয়ালের ওপারে আমরা সবাই অরক্ষিত। শ্রাইক নামধারী এই দস্যুরা নির্মম। আইনের কোনো বালাই নেই তাদের কাছে ।
ঠিক জনতার মনের কথা বলেছে ট্যানাস, হঠাই আমিও এক আবেগে কেঁপে উঠি। এমন আবেগেই তো যুগে যুগে ঘটেছে অভ্যুত্থান, ধ্বসে পড়েছে বহু সম্রাটের সাম্রাজ্য। ট্যানাসের পরবর্তী বাক্যে আমার সন্দেহ সত্যি হলো।
খাজনা আদায়কারীর চাবুকের তলায় কেঁদে ফিরছে গরিবেরা, আর মহৎ ব্যক্তিরা কেবল নিজেদের আরাম-আয়েশে ব্যয় করেন সময়-দর্শকসারীর পেছন থেকে একটা হুঙ্কার ওঠে, ভয়ের বদলে উত্তেজনা বোধ করতে থাকি আমি। এ কী কোনো পরিকল্পিত আচরণ? আমার জানার বাইরে ধূর্ত এবং চতুর ট্যানাস?
হোরাসের কসম! নিজের রক্তে যেনো ডাক শুনতে পাই। আমাদের জন্মভূমি এখন অভ্যুত্থানের প্রান্তসীমায় দাঁড়িয়ে। নেতৃত্ব দানে ট্যানাসের চেয়ে যোগ্য আর কে হতে পারে? মন খারাপ হলো এই ভেবে তার পরিকল্পায় আমাকে নেয় নি ট্যানাস। যতোটা চাতুর্যের সাথে আমি গীতি লিখি বা নকশা করি, জাগরণের জন্যে কী সেই রকম বাক্য আমি তৈরি করতে পারতাম না?
দর্শকের মাথার উপর দিয়ে সাগ্রহে তাকালাম, মনে মনে আশা করছি যে কোনো মুহূর্তে নিজের বাহিনী নিয়ে প্রবেশ করবে ক্ৰাতাস। ফারাও-এর মাথা থেকে দ্বৈত-মুকুট ছিনিয়ে নিয়ে ট্যানাসের রক্তাক্ত মস্তকে বসাচ্ছে ক্ৰাতাস–এই দৃশ্য কল্পনা করে আমার ঘারের ছোটো চুলগুলো দাঁড়িয়ে গেলো। কতই না উত্তেজনায় তখন চিৎকার করে উঠতাম আমি, ফারাও দীর্ঘজীবী হোন! রাজা ট্যানাস দীর্ঘজীবী হোন!
ট্যানাস তখনও বলে চলেছে। ঘোরের ফেরে আমি দেখতে লাগলাম, অভ্যুত্থান হয়েছে মরুভূর বুকে। আমার ছোট্ট সোনা লসট্রিসকে পাশে নিয়ে আমাদের এই মিশরের সিংহাসনে বসে ট্যানাস, রাজ-উজিরের পদে আসীন আমি দাঁড়িয়ে তার ঠিক পেছনে। কেন যে আমাকে অন্তর্ভুক্ত করলো না সে এই পরিকল্পনায়!
তার পরবর্তী বাক্যে এই প্রশ্নের উত্তর পেয়ে গেলাম। আমার সৎ, সাধারণ, মহৎ হৃদয় ট্যানাসকে ভুল বুঝেছিলাম আমি। চাতুৰ্য্য আর প্রতারণার স্থান যার কাছে নেই।
কোনো পরিকল্পনা ছিলো না এই ভাষণের পেছনে। এ হলো নির্ভীক ট্যানাসের মনের কথা। সাধারণ জনতার উদ্দেশ্যে এবারে অনলবর্ষণ শুরু করলো সে।
আমার কথা শোনো, হে মিশর! এ কেমন দেশ, যেখানে নষ্টরা অধিকার করে আছে সমস্ত চরাচর? যেখানে দেশপ্রেমিকেরা দণ্ডিত, যেখানে প্রাজ্ঞ লোকেদের অবহেলা করা হয়? যেখানে হিংসুটে, মগজহীনেরা ছিঁড়ে ফেলতে চায় সত্যভাষীর জিভ?
কোনো শব্দ বেরোয় না কারো মুখ ফুটে। ধনী-নির্ধন, মহান-তুচ্ছ সবার মনোযোগ অধিকার করে আছে কেবল আমার ট্যানাস। কেন যে আমার সাথে পরামর্শ করলো না ও! আমি জানি কেন করে নি। সে জানতো, আমি বাধা দিতাম তাকে।
এ কেমন সমাজ যেখানে পিতাকে অবজ্ঞা করা হয়? এমন সমাজ কী চাই আমরা, যেখানে একজন ক্রীতদাস অধিকার করে রাখুক গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদ? মূল্যবান সম্পদ যাক অযোগ্যের হাতে, আমরা কী এটাই চাই?
হে হোরাস, তিক্ততার সাথে ভাবলাম, আজ আর কারো নিস্তার নেই ওর ধারালো কথার কোপ থেকে। নিজে যা সত্যি এবং সঠিক মনে করছে, নিরাপত্তার কথা না ভেবে তাই বলে চলেছে ট্যানাস।
অন্তত একজন খুবই উৎফুল্ল তার এই সত্য-ভাষণে। আমার পাশে এসে হাত চেপে ধরলো লসট্রিস।
ও কী সুন্দর, তাই না টাইটা? শ্বাসের তলায় বলে সে, প্রতিটি বর্ণ সত্য। আজ রাতে ও অবশ্যই একজন তরুণ দেবতা!
ওর মন্তব্যে সায় জানানোর মতো মানসিক অবস্থা বা ইচ্ছা কোনোটাই ছিলো না আমার, দুঃখের সাথে মাথা নিচু করে শুনতে লাগলাম ট্যানাসের কথা ।
ফারাও, আপনি আমাদের পিতা। প্রতিরক্ষা আর নিরাপত্তার জন্যে আপনার কাছে দাবি জানাই আমরা। যোগ্য এবং কৌশলী লোকের হাতে দিন প্রশাসনিক কাজের ভার। গর্দভ এবং চাটুকারদের চলে যেতে বলুন তাদের আস্তকুঁড়ে। অবিশ্বাসী পুরোহিত আর ষড়যন্ত্রী শাসকদের ফিরিয়ে নিন, যারা আজ পরভোজীর মতো খেয়ে ফেলছে আমাদের প্রিয় জন্মভূমি।
হোরাস জানেন, আমি সবচেয়ে বেশি ঘৃণা করি পুরোহিতদের। কিন্তু কেবল মাত্র একজন চরম সাহসী বা বোকা লোকের পক্ষেই সম্ভব তাদের বিরুদ্ধে কথা বলা, তাঁরা অত্যন্ত প্রভাবশালী, হিংসুটে। আর চাটুকার আর ষড়যন্ত্রীর কথা যদি বলি, আমাদের এই মাতৃভূমির শত বছরের ইতিহাসে তারা ছিলো, আর ইনটে তাদের শিরোমণি। করুণায় মন ভরে গেলো আমার প্রিয় বন্ধুর জন্যে, পুরো সামাজিক ব্যবস্থা পরিবর্তন করার উপায় বলে যেতে লাগলো সে ফারাও-এর উদ্দেশ্যে।
