দ্বৈত-যুদ্ধের শ্রান্তিতে তখনও হাঁপাচ্ছিলো ট্যানাস, বড় করে শ্বাস টেনে মঞ্চের সম্মুখে এগুলো সে, কাব্যনাট্য শেষের ঘোষণার প্রস্তুতি নিচ্ছে। জনতার মুখোমুখি হতেই নীরবতা নেমে এলো, রক্ত-ঘামে-রাগে আবৃত ট্যানাস এই মুহূর্তে দর্শনীয় ব্যক্তিত্ব।
দুই হাত মন্দিরের ছাতের দিকে তুলে জোরালো শব্দে বলে উঠে ট্যানাস, আমন রা, আমাকে কণ্ঠস্বর দাও! বলবার ক্ষমতা দাও! বক্তার চিরাচরিত রীতি এটা।
তাকে কণ্ঠস্বর দাও! বলুক ও! চেঁচিয়ে উঠে জনতা, সাম্প্রতিক দৃশ্যাবলিতে উন্মত্ত ।
ট্যানাস এক অদ্ভুত মানুষ, ঠিক যতোটা পারদর্শী অস্ত্রবাজীতে, ততটাই দক্ষতা তার আছে ভাষায়, পরিকল্পনায় । আমি জানি, সে হয়তো ঠিকই স্বীকার করবে বেশিরভাগ পরিকল্পনার বীজ তার মধ্যে বপন করেছে সেই তুচ্ছ দাস, টাইটা। তবে এতে কোনো সন্দেহ নেই, তার ভঙ্গিমা অপূর্ব।
বাগ্মীতায় ট্যানাসের বিকল্প পাওয়া ভার। যুদ্ধ শুরুর আগে নিজের বাহিনীর উদ্দেশ্যে তার ঘোষণা কিংবদন্তি হয়ে আছে। আমি তার সবগুলো শুনি নি, তবে ট্যানাসের বিশ্বস্ত সহচর কাতাস সবই মুখস্ত করে রেখেছে। অনেকগুলো মূল্যবান বক্তব্য তার কাছ থেকে শুনে শুনে সংগ্রহ করে রাখা হয়েছে আমার প্যাপিরাসের স্ক্রোলে।
এমনকি সাধারণ জনতার হৃদয় ছুঁয়ে যাওয়ার ক্ষমতা আছে ট্যানাসের। আমার মনে হয় সহজাত স্বতঃস্ফুর্ততা এবং স্বচছ সতোর কারণেই ওটা পারে সে। ট্যানাসের আহ্বানে হাসিমুখে মৃত্যুকে পর্যন্ত বরণ করে নিতে প্রস্তুত বহুজন।
সদ্য সমাপ্ত দ্বৈত-যুদ্ধের মত্ততা আর ইনটেফের ফাঁদ টপকে ট্যানাসের বেরিয়ে আসার চিত্র তখনও ঘুরপাক খাচ্ছিল মনে, আমার কোনোরকম সাহায্য ছাড়া ওর বক্তব্য শুনতে বেশ আগ্রহী হয়ে অপেক্ষা করছিলাম। সত্যি বলতে, আমার সহায়তা নেয় নি বলে কিছুটা উদ্বিগ্ন হয়ে আছি, বেফাঁস কিছু না আবার বলে বসে ট্যানাস! চাতুর্য্য কিংবা ধূর্ততা ট্যানাসের মহৎ গুণাবলির মধ্যে পড়ে না।
মিশরীয় রাজ্যের প্রতীক হাতে ইঙ্গিত করলেন ফারাও, মাথা ঝাঁকিয়ে অনুমতি দিলেন বক্তব্য পেশ করার। আগ্রহের আতিশায্যে সামনে ঝুঁকে বসে জনতা, কেউ কোনো শব্দ করছে না।
আমি, শকুন-মস্তকধারী হোরাস বলছি, শুরু করে ট্যানাস, জনতা উৎসাহ জোগায় তাকে। হা-কাহ-টাহ, মিশরের বর্তমান নাম যে আদি-শব্দ থেকে এসেছে, সেটাই উচ্চারণ করলো ট্যানাস। দশ হাজার বছরের প্রাচীন এই জন্মভূমির হয়ে কথা বলছি আমি, দেবতাদের শিশুকাল থেকে যা আমাদের মাতৃভূমি। এমন দুই রাজ্যের হয়ে বলছি, যারা মূলত এক ও অভিন্ন।
মাথা নেড়ে নিজের সম্মতি জানালেন মহান ফারাও।
হায়, কৃষ্ণভূমি! বাৎসরিক বন্যায় নীল নদের পলিমিশ্রিত পানি কালো বর্ণ ধারণ করে। এই মাতৃভূমির কথা বলছি আমি, আজ যা সন্ত্রস্ত, দ্বিধাবিভক্ত; গৃহযুদ্ধে টালমাটাল, রক্তাক্ত এবং সম্পদহারা। আমার মতোই উপস্থিত জনতা থমকে যায় । অশ্রুত সত্য কথা বলছে ট্যানাস। ইচ্ছা হলো দৌড়ে মঞ্চে গিয়ে ওর মুখ চেপে ধরি। অসহায় মনে হতে লাগলো নিজেকে।
হায়, টা-মেরি! আরো একটি ভূতপূর্ব নাম যার অর্থ প্রিয় জন্মভূমি। আমার তত্ত্বাবধানে ইতিহাস ভালোই রপ্ত করেছে ট্যানাস। বুড়ো, অথর্ব সেনাপতিগণ, যারা ব্যর্থ হয়েছেন শত্রুকে রুখে দিতে; আমি তাদের কথা বলছি। প্রাচীন, অযোগ্য বুড়ো যারা নির্দ্বিধায় অপচয় করেন তরুণ রক্ত–আমি সেইসব লোকেদের কথা বলছি।
দ্বিতীয় সারিতে বসা মিশরের সাহসী সিংহ উপাধিপ্রাপ্ত নেমবেট, রাগে-আক্রোশে দাঁড়িতে হাত চালালেন। অন্যান্য বয়োজ্যেষ্ঠ সেনাপতিরা ভুড় কুঁচকে, অস্ত্রের খাপে আঘাত করে নিজেদের মনোভাব প্রকাশ করলেন। আর তাদের সবার মাঝখানে বসে উল্লাসের হাসি হাসছেন আমার মনিব ইনটেফ। এক ফাঁদ থেকে বেঁচে ফিরে আবারো নিজেকে ফাঁদে ফেলছে ট্যানাস।
আমাদের প্রিয় জন্মভূমি আজ শত্রুর অভয়ারণ্য, আজ তার মহতী সন্তানেরা তলোয়ার হাতে তুলে নেওয়ার বদলে নিজেদের বিকলাঙ্গ করে ফেলে, দ্বিতীয় সারিতে বাপের দুপাশে বসা লসট্রিসের দুই ভাই মেনসেট আর সোবেকের উদ্দেশ্যে কঠোর চোখে তাকালো ট্যানাস।
রাজার দেওয়া প্রত্যাদেশ অনুযায়ী কেবলমাত্র বিকলাঙ্গরা সেনাবাহিনীতে যোগদান থেকে ক্ষমা পায়, সেই কারণেই দক্ষ শল্যবিদের সাহায্যে নিজেদের বুড়ো আঙুল কেটে ফেলেছে দুই ভাই। এতে করে তলোয়ার ধরা বা ধনুক টানা কোনোটিই সম্ভব নয় তাদের পক্ষে। কর্তিত অঙ্গ প্রদর্শনে কোনো লজ্জা নেই তাদের, গর্বিত চিত্তে নদীর ধারের ছাপড়ায় জুয়া খেলে তারা।
তরুণদের জীবন নিয়ে বুড়োদের ছিনিমিনি খেলাই হলো যুদ্ধ, লসট্রিসের ভাইদের বলতে শুনেছি আমি। দেশপ্রেম ফালতু কথা। যার ইচ্ছা মরুক, আমরা যুদ্ধে যাবো না। এই হলো উন্নাসিক দুই ভাইয়ের মনোভাব।
এখন, ট্যানাসের তীর্যক মন্তব্যে অপ্রস্তুত হয়ে নিজেদের বাম হাত কাপড় দিয়ে আড়াল করে তারা। যদিও তারা দুজনেই ডানহাতি, ঘুষের বদৌলতে বাম-হাতি বলে নিজেদের পরিচয় প্রতিষ্ঠিত করেছে।
বিশাল উন্মুক্ত অংশের পেছনে বসা সাধারণ জনতা মেঝেতে পা ঠুকরে নিজেদের সম্মতি জানায় ট্যানাসের বক্তব্যে। যুদ্ধ নৌকার দাঁড় তো টানে এদেরই সন্তানেরা, এদের সন্তানেরাই মরুর প্রখর রোদে প্রহরা দেয়।
