মিশরীয় সেনাবাহিনীর প্রত্যেক সদস্যের দক্ষতা আছে কুস্তিতে। পরস্পরকে ঝাঁপটে ধরে এখন মঞ্চে ঘুরছে দুই মল্লযোদ্ধা। চোখে চোখে তাকিয়ে, মাথার আচ্ছদনের আঘাতে আঘাতে, পায়ের গোড়ালির প্যাঁচে ফেলে দিতে চাইছে পরস্পরকে। শক্তি আর প্রতিজ্ঞায় সমানে সমান।
দর্শক বেশ আগেই টের পেয়ে গেছে, কোনো ভুয়া-লড়াই নয় এটা, এতে পরাজয় মানে মৃত্যু। ভেবেছিলাম আজকে সন্ধার মতো রক্ত-তৃষ্ণা মিটে গেছে তাদের, কিন্তু তা সত্যি নয়। আরো, আরো রক্তের জন্যে চিৎকার করছে তারা।
শেষপর্যন্ত ট্যানাসের বাহুপাশ থেকে নিজেকে মুক্ত করে ফেলল র্যাসফার। ভাঙা তলোয়ারের ডগা দিয়ে ট্যানাসের আহত ভুডুতে আক্রমণ শানালো। মাথা সরিয়ে নিয়ে ওটা এড়াল ট্যানাস। শিকারের চতুস্পার্শ্বে প্যাঁচ ছাড়ানো অজগরের মতো র্যাসফারের বুকে পেঁচিয়ে ধরলো সে। এতে প্রচণ্ড ছিলো সেই বেষ্টনী, র্যাসফারের অবয়ব যেনো ফুলে-ফেঁপে উঠল, রক্ত জমা হতে লাগলো মুখে। বুকের বাতাস বেরিয়ে যাওয়ায় হাঁস ফস করতে লাগলো সে। দৃশ্যত দুর্বল হয়ে পড়েছে র্যাসফার। প্রচণ্ড চাপে ফেটে গেছে র্যাসফারের পিঠের একটা ফোঁড়া, পুঁজ গড়িয়ে এসে জমা হচ্ছে তার কোমরের কাছে।
দম বন্ধ করা বেষ্টনীর ভেতরে ব্যথায় গুঙিয়ে উঠলো র্যাসফার। আরো সেঁটে ধরলো ট্যানাস। কাঁধ একটু নিচু করে প্রতিপক্ষকে গোড়ালির উপর নামতে বাধ্য করলো সে। ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছে দানব, পেছাতে শুরু করেছে। বিশাল একটা থামের দিকে চলেছে দুই যোদ্ধা। তলোয়ার আড়াআড়ি রেখে র্যাসফারকে বিশাল সেই স্তম্ভের সাথে ঠেসে ধরলো ট্যানাস। প্রচণ্ড শব্দে গুঙিয়ে উঠে দুই হাত ছড়িয়ে পরে র্যাসফারের, ভাঙা অস্ত্রটা হাত থেকে মাটিতে পরে পাথরের মেঝেতে শব্দ তুলে সরে যায়।
হাঁটু ভেঙে নেতিয়ে পড়ে র্যাসফার, ট্যানাসের আলিঙ্গনে। কোমর বাঁকিয়ে মাথার উপর দিয়ে ছুঁড়ে ফেলে ট্যানাস তাকে। প্রচণড শব্দে মাটিতে আছড়ে পরে সে। ঠিক আগুনে পোড়া পলকা কাঠির মতোই মটমট শব্দে ভাঙতে শুনলাম আমি রাসফারের কয়েকটি বুকের হাড়। মরুর তরমুজের মতো মাথাটা পাথরের মেঝেতে শব্দ করে বাড়ি খায়।
যন্ত্রণায় কাঁদছে র্যাসফার । হাত তুলবার শক্তিও অবশিষ্ট নেই। যুদ্ধের উন্মত্ততায়, দর্শকের একটানা হুঙ্কারে ট্যানাসও পশু হয়ে গেছে। ধরাশায়ী র্যাসফারের সামনে দাঁড়িয়ে দুই হাতে তলোয়ার উঁচু করলো সে। ভয়ঙ্কর সেই দৃশ্য। চোখের আঘাত রক্তের মুখোশে ঢেকে ফেলেছে তাকে, ঘাম এবং রক্ত ভিজিয়ে ফেলেছে বুকের লোম, কাপড়।
মারো! মেরে ফ্যালো শয়তানটাকে!
ট্যানাসের তলোয়ারের ডগা নিশানা করেছে র্যাসফারের বুকের মধ্যিখানে, এখনই নেমে আসবে ওটা, শেষ হবে জানোয়ারটার ভবলীলা। আমি মনে-প্রাণে চাইছিলাম, তাই করুক ট্যানাস। দেবতারা জানেন, কী ভীষণ ঘৃণা করি আমি তাকে। এই নির্মম দৈত্যটা খোঁজা করেছিলো আমাকে।
কিছুই হলো না। আমার বোঝা উচিত ছিলো, ট্যানাস কখনও আত্মসমর্পণকারী শত্রুকে মেরে ফেলবে না। ওর চোখের উন্মত্ততা ফিকে হয়ে এলো। মাথাটা একটু আঁকালো সে, যেনো বাস্তবে ফিরিয়ে আনল নিজেকে। এরপর, আঘাত করার বদলে র্যাসফারের বুকে একটু ছোঁয়ালো সে তলোয়ারের ডগা। র্যাসফারের বুকের লোমের অরন্যে এক বিন্দু রক্ত উজ্জ্বল হয়ে জ্বললো। আর তারপর, নাটকের বাক্য আবৃত্তি করতে লাগলো ট্যানাস।
এভাবেই নিজের ইচ্ছা শক্তিতে আমি বাধলাম তোকে, আলো থেকে নির্বাসন দিলাম। অন্ধকার জগতের আনাচে-কানাচে ঘুরে ফির তুই চিরকাল। যা কিছু মহৎ, যে মানুষরূপী দেবতা আছেন, তাদের কারো চেয়ে বেশি ক্ষমতা তোর থাকবে না। চোর এবং কাপুরুষ, প্রতারক এবং লম্পট, মিথ্যুক এবং খুনী, সমাধি-চোর আর ধর্ষাকামী, ছলনাময় এবং অবিশ্বস্তদের অধিকার থাকবে তোর হাতে। আজ থেকে, তুই মন্দের দেবতা। চলে যা এখান থেকে, হোরাস এবং তার পুনরুত্থিত পিতা, ওসিরিস-এর অভিশাপ তোর সঙ্গী হলো।
ব্ল্যাসফারের বুক থেকে অস্ত্র সরিয়ে নিয়ে একপাশে ফেলে দেয় ট্যানাস। পাথরের মেঝেতে ঝনঝন আওয়াজ তোলে সেটা। ছুটে গিয়ে আমাদের সৃষ্ট নীল নদের পানিতে হাঁটু গেড়ে বসে সে, এক আজলা পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলে মুখের রক্ত। কোমরের কাপড় ছিঁড়ে বেঁধে ফেলে হাতের আঘাত।
আমাকে ছেড়ে র্যাসফারের দুই বর্বর সঙ্গী ছুটে গিয়ে উঠে বসতে সাহায্য করলো তাদের আহত মনিবকে। ওদের সাহায্যে টলোমলো করে পায়ের উপর দাঁড়াল র্যাসফার, কষ্ট করে শ্বাস টানছে, আহত জন্তুর মতো শব্দ করছে মুখ দিয়ে। আমার ধারণা, ভীষণভাবে আহত হয়েছে সে। মঞ্চ থেকে টেনে-হিঁচড়ে তাকে নিয়ে গেলো দুইজন, দর্শকের বিদ্রূপ-উপহাস ছুটে গেলো পিছুপিছু।
আমার মনিব, ইনটেফের মুখের ভাবাবেগে এই মুহূর্তে কোনো খাদ নেই। আমার লেশমাত্র সন্দেহও এবারে তিরোহিত হয়। এভাবেই ট্যানাসের উপর প্রতিশোধ নিতে চেয়েছিলেন তিনি সমগ্র জনতার সামনে তার মেয়ের সামনে; ওকে মেরে ফেলে শাস্তি দিতে চাইছিলেন লসট্রিসকে।
ইনটেফের হতাশা এবং অসন্তুষ্টি দারুন আনন্দের খোরাক যোগালো আমার মনে, র্যাসফারের জন্যে কী অপেক্ষা করছে ভেবে ভালো লাগছে। ট্যানাসের দেওয়া মারের চেয়েও বেশি কিছু দিতে চাইবেন ইনটেফ তাকে, এই ব্যর্থতার জন্যে-সন্দেহ কি! ব্যর্থ কারো জন্যে আমার মনিবের এতটুকু মায়া-দয়া নেই।
