ট্যানাস! সামনে এগিয়ে চিৎকার করে ডাকলাম। সাবধান! এটা একটা ফাঁদ! ওরা জনতার হুঙ্কারে তলিয়ে গেলো আমার কথা। এক পা এগোতেই পেছন থেকে একটা হাত জড়িয়ে ধরলো আমাকে। বহু চেষ্টা করেও ছাড়া পেলাম না, র্যাসফারের বর্বর সহযোগীরা টেনে সরিয়ে নিয়ে চললো আমাকে। ঠিক এই ধরনের কাজের জন্যেই রাখা হয়েছে ওদের, যেনো কেউ সতর্ক করতে না পারে ট্যানাসকে।
হোরাস, শক্তি দাও! ওদের বাধা দেওয়ার বদলে পেছনে হেলে পড়লাম, যেদিকে টানা হচ্ছিল আমাকে। এক মুহূর্তের জন্যে ভারসাম্য হারাল তারা, এক ঝটকায় মুক্ত হলাম আমি। আবার ধরে ফেলার আগেই মঞ্চের কাছাকাছি পৌঁছে গেলাম দৌড়ে।
হোরাস, গলায় জোর দাও! প্রার্থনা করে চলেছি; শেষমেষ সবটুকু শ্বাস নিয়ে চেঁচিয়ে উঠলাম, ট্যানাস, সাবধান! ও তোমাকে মেরে ফেলতে চাইছে।
এবারে জনতার চিৎকার ছাপিয়ে আমার কণ্ঠস্বর পৌঁছুল ট্যানাসের কানে। ওর চোখের কুঞ্চন এবং ঘারের শক্ত হয়ে যাওয়া নজর এড়ালো না আমার। রাসফারও শুনতে পেয়েছে আমার কথা। সাথে সাথেই, অনুশীলনের পদক্ষেপ ভেঙে সামনে বাড়ল সে। নিচ থেকে উপরে ধেয়ে যাওয়া তার জোরালো কোপে বাহু সমান উচ্চতায় থরথর করে কাঁপতে লাগলো ট্যানাসের তলোয়ার ।
অবাক করে না দিতে পারলে কখনই এই ফাঁক পেতো না সে ট্যানাসের প্রতিরক্ষায়। বিশাল দুই কাঁধের শক্তিতে ঝাঁপিয়ে পড়ল র্যাসফার এবারে। ট্যানাসের মাথার আচ্ছাদনের এক ইঞ্চি মতো নিচে, ডান চোখের বরাবর তলোয়ার শানাল সে। চোখ গেলে দিয়ে, করোটি এফোঁড়-ওফোঁড় করে দেয় এমন আঘাত।
কিন্তু আমার চিৎকার এক মুহূর্তের সুযোগ এনে দিয়েছিল ট্যানাসকে, দারুনভাবে রক্ষণ-কৌশল ব্যবহার করলো সে। তলোয়ারের হাতল দিয়ে ঠেকিয়ে রাসফারের কবজিতে প্রতিআক্রমণ করলো। তলোয়ার ধারী হাত একটু নেমে গেলো র্যাসফারের, সেই মুহূর্তে তার চিবুক এবং মুখে ঘুষি হাঁকালো ট্যানাস। এতে করে অবশ্য মূল আঘাত পুরোপুরি ঠেকানো গেলো না। যে আঘাতে তার চোখ গেলে গিয়ে পাকা তরমুজের মতো ফেটে যাওয়ার কথা ছিলো করোটি, সেটা কেবল তার জ কেঁটে হাড় পর্যন্ত গভীরে পৌঁছে গেলো।
সাথে সাথেই রক্তের একটা স্রোত এসে ঢেকে ফেলল ট্যানাসের মুখ। ডান চোখে কিছু দেখতে পাচ্ছে না সে। পরে যেতেই র্যাসফার চড়াও হলো তার উপর। মুক্ত হাতে চোখের রক্ত পরিষ্কার করে দৃষ্টি শক্তি ফিরে পাওয়ার প্রয়াস পেলো ট্যানাস। নিজেকে সে সম্ভবত আর রক্ষা করতে পারছে না; প্রাসাদের রক্ষীরা আমাকে ধরে না রাখলে কোমরের ছুরি বের করে ঝাঁপিয়ে পড়তাম ওর সাহায্যে।
প্ৰথম খুনে আক্রমণটা সামলে নিতে পারল ট্যানাস। আরো দুটো আঘাত ধারণ করলো শরীরে, বাম উরুর উপরে একটা, অস্ত্রধারী হাতের পেশিতে আরো একটা ছোট্ট কাটা। পেছনে সরে, মাথা নিচু করে ঠেকিয়ে চললো সে। রাসফার কোনো সুযোগ দিচ্ছে না, ভারসাম্য বা সম্পূর্ণ দৃষ্টি শক্তি কোনোটাই ফিরে পায় নি ট্যানাস এখনও। হাপরের মতো উঠানামা করছে র্যাসফারের ঘাম-চর্চিত বুক, মশালের আলোয় চকচক করছে, কিন্তু তার গতি বা আক্রমণের প্রচণ্ডতা এতটুকু কমে নি।
আমি যদিও তলোয়ারবাজ নই, শিল্পের বোদ্ধা আমি। বহুবার অনুশীলনে দেখতে দেখতে র্যাসফারে ভঙ্গিমা জানা হয়ে গেছে আমার। তার আক্রমণ ভঙ্গির নাম খামসিন, অর্থাৎ মরুর বাতাস। তার বিশাল দেহ এবং শক্তিমত্তার সাথে দারুনভাবে খাপ খায় এই ভঙ্গিমা। বহু শতবার তাকে এটা অনুশীলন করতে দেখেছি আমি, এখন তার পায়ের নড়াচড়া দেখে বুঝতে পারলাম–প্রস্তুতি নিচ্ছে সেটার জন্যে। শেষ এক আঘাতে সবকিছুর সমাপ্তি টানতে চাইছে ।
প্রহরীদের সাথে ধস্তাধস্তির এক পর্যায়ে চেঁচিয়ে উঠলাম ট্যানাসের উদ্দেশ্যে। খামসিন! তৈরি থাকো! জনতার গর্জনে আমার চিৎকার চাপা পড়ে গেলো বলে ভেবেছিলাম, ট্যানাসও কোনো প্রতিক্রিয়া দেখালো না। পরে সে অবশ্য আমাকে বলেছিল, আমার কথা শুনেছিল সে; দৃষ্টির বাধা সত্ত্বেও আমার সতর্কবাণী বাঁচিয়েছিল তাকে।
এক ধাপ পেছালো র্যাসফার, খামসিন-এর ধ্রুপদী ভঙিমা, এক মুহূর্তের জন্যে ঢিল দিয়ে প্রতিপক্ষের উপর চড়াও হওয়া। শরীরের ভার বদল করে বাঁ পা সামনে চলে এলো। সমস্ত ভরবেগ এবং শক্তি ডান পায়ের উপর চাপিয়ে আক্রমণে গেলো র্যাসফার, যেনো কোনো দানবপাখি উড়বার প্রস্তুতি নিচ্ছে। দুই পা যখন মাটি ছুঁল, তার তলোয়ারের চোখা মাথা ট্যানাসের গলা বরাবর ধরা। অবর্ণনীয় শক্তিমত্তার বহিঃপ্রকাশ ছিলো সেটা। কোনো কিছুই পারবে না একে ঠেকিয়ে দিতে কেবল একটি বিশেষ দক্ষতা ছাড়া বন্ধ-ঘাত।
ঠিক যখন আঘাত করবার প্রাক্কালে রয়েছে র্যাসফার, সমান শক্তির বিচ্ছুরণ দেখিয়ে সামনে বাড়ল ট্যানাস। ছেড়ে দেওয়া তীরের মতোই প্রতিপক্ষের উদ্দেশ্যে ছুটে গেলো সে। শূন্যে, র্যাসফারের ফলার সাথে সংঘর্ষ ঘটল ট্যানাসেরটার, ওটাকে নামিয়ে আনতে সক্ষম হলো সে; হাতলের কাছে এসে জমে গেলো সেই মরণ-আঘাত । নিখুঁত একটা বন্ধ-ঘাত।
দুই যোদ্ধার ভর এবং গতি ন্যস্ত হলো রাসফারের মুঠোয় ধরা তলোয়ারের ফলায়। আঘাতের প্রাবল্য সহ্য করতে পারল না সেটা, দুইভাগ হয়ে গেলো। বুকে বুকে সেঁটে আছে এখন ওরা দুজন। যদিও ট্যানাসের অস্ত্র এখনও অক্ষত, সেটা ব্যবহার করতে পারছে না সে। তার অস্ত্রধারী হাত রাসফারের দেহের পেছনে সেঁটে আছে, আটকে রেখেছে দানবটাকে শরীরের সাথে।
