গাইতে গাইতে মঞ্চ ত্যাগ করলেন দেবী, তার পুত্রকে রখে গেলেন অজানা যুদ্ধে। বিপুল আগ্রহের সাথে পরবর্তি ঘটনাবলির জন্যে অপেক্ষা করে আছে দর্শক।
উন্মত্ত সেথ প্রবেশ করলো মঞ্চে; ভালো এবং মন্দ, সৌন্দৰ্য্য এবং পঙ্কিলতা, সম্মান এবং অসম্মানের মধ্যে চলে আসা চিরকালীন লড়াই শুরু হবে এবার। দর্শক অধীর আগ্রহে তৈরি এর জন্যে। স্বয়ংক্রিয় ঘৃণার প্রকাশে জনতা স্বাগত জানাল তাঁকে। মঞ্চে, আস্ফালনরত রাসফার হিংস্র মুখভঙ্গি করলো দর্শকের উদ্দেশ্যে; উরুসন্ধি চেপে ধরে কোমড় নাচিয়ে অশ্লীল ইশারা করলো দর্শকের দিকে, ক্ষেপে আগুন হলো জনতা।
মেরো ফ্যালো ওকে, হোরাস! হুঙ্কার দিয়ে উঠে তারা। কুৎসিত মুখটা থেতলে দাও!।
সেথ্ নেচে চলে তাদের সম্মুখে।
মহান ওসিরিসের খুনীকে মেরে ফ্যালো! ঘৃণায়, আক্রোশে উন্মাদ হয়ে গেছে দর্শক।
ওর মুখটা থেতলে দাও!
নাড়ি-ভূড়ি ছিঁড়ে বের করো!
মাথাটা ফেলে দাও! চিৎকার করে তারা।
মারো ওকে, মারো!
শেষমেষ সেথ যেনো প্রথমবারের মতো দেখতে পেলো তার ভ্রাতুস্পুত্রকে। কালো দাঁতের মাঝখান থেকে জিহ্বা বের করে ভেঙচি কাটল, রুপালি লালা ঝরে পড়ছে মুখের দুই কোনো বেয়ে। কখনও ভাবি নি, নিজেকে আরো বেশি বমিজাগানিয়া প্রমাণ করতে পারে রাসফার, কিন্তু আজ আমার সেই ভুল ভাঙল।
এই পুঁচকিটা কে রে? জানতে চায় সে। পুরো একটা দুর্গন্ধময় শ্বাস ছাড়ে ট্যানাসের মুখের উপর। সম্পূর্ন অপ্রস্তুত ছিলো ট্যানাস এটার জন্যে, নিজের অজান্তেই এক পা পেছাল সে; র্যাসফারের মদমত্ত পেটের বিশ্রী গন্ধ সহ্য করা মুশকিল।
দ্রুতই নিজেকে ফিরে পেলো ট্যানাস। নিজের প্রথম বাক্য বলল। আমি হোরাস, ওসিরিসের পুত্র।
অট্টহাসিতে ফেটে পরে সেথ। কি চাও হে তুমি? মরা দেবতার বাচ্চা ছেলে?
আমি প্রতিশোধ নিতে এসেছি। আমার বাবা, মৃত দেবতা ওসিরিসের মৃত্যুর বদলা চাই।
তাহলে আর খুঁজে লাভ নেই, চিৎকার করে উঠে সেথ। আমিই সেথ, তারা খেকো, পৃথিবী ধ্বংসকারী।
নিজেদের তলোয়ার খাপমুক্ত করে দুই দেবতা ঝাঁপিয়ে পরে পরস্পরের উদ্দেশ্যে। মধ্য-মঞ্চে ঝনঝন শব্দে মিলিত হয় তাদের ধারালো ফলা। আহত হওয়ার আশঙ্কায় তামার বদলে কাঠের তলোয়ার ব্যবহারের পরিকল্পনা ছিলো আমার, কিন্তু তাদের দুইজনের কেউই রাজী হয় নি। র্যাসফারের আবেদনে সাড়া দিয়েছেন ইনটেফ। তিনি আদেশ জারি করেছেন, সবাই যেনো আসল অস্ত্র ব্যবহার করে। বাধ্য হয়ে আমাকে তা মেনে নিতে হয়েছে। অবশ্য, এতে করে বাস্তবতা এসেছে দৃশ্যে; আর এখন, তলোয়ারের ফলা দিয়ে একে অন্যেরটা আটকে রেখে চোখে চোখে চেয়ে আছে দুই অভিনেতা।
দারুন বৈপরীত্য তাদের অবয়বে, এতটা ভিন্ন, নাটকের মূল ভাবই যেনো প্রকাশ করে চলেছে। ভালো এবং মন্দের চিরকালীন যুদ্ধ এটা। ট্যানাস লম্বা, সুদর্শন, সভ্য। সেথ দুর্ধর্ষ, ভারী-বাকা পায়ের বর্বর। একদমই দৃশ্যমান তাদের বৈপরীত্য। দর্শকের মনোভাব এই মুহূর্তে যুদ্ধংদেহী।
একই সঙ্গে পরস্পরকে পিছনে ঠেলে দেয় তারা, আবার মিলিত হয়। বাতাসে কাটছে ফলা, মাথা নিচু করে, কোপ মেরে পাশ কাটাচ্ছে পরস্পরের আঘাত। ওরা দুজনেই ফারাও-এর সেনাবাহিনীর চৌকষতম তলোয়ারবাজ যোদ্ধা।
মশালের আলোয় পাক খেয়ে চমকাতে লাগলো তাদের অস্ত্র, নীল নদের অস্থির উপরিতল থেকে ধেয়ে আসা বাতাসের নাচনে অপার্থিব মনে হতে লাগলো সেটা। দ্বৈত-যুদ্ধের সেই শব্দ যেনো মন্দিরের শূন্য, বিষণ্ণ ছাতে ঝটপট ডানা ঝাঁপটানো পাখির আওয়াজ, কিন্তু যখন মিলিত হলো তাদের তলোয়ার সেটা প্রচণ্ড, যেনো হাতুরি পিটছে কেউ।
দর্শকের কাছে যেটা মনে হচ্ছে সত্যিকারের মরণপণ যুদ্ধ, সেটা আসলে সতর্কভাবে অনুশীলন করা একটা নাটক বৈ আর কিছু নয়। দুজনেই জানে, ঠিক কিভাবে কতটুকু আঘাত করতে হবে তাদেরকে। অসাধারণ দুইজন যোদ্ধার এক জীবনের পারদর্শিতার কারণেই হয়তো, দারুন সহজ মনে হতে লাগলো তাদের আক্রমণ-প্রতি আক্রমণ।
যখন সেথ তলোয়ার চালাল, ঠিক শেষ মুহূর্তে সরে গেলো ট্যানাস, তার বর্মে দাগ কেটে গেলো তলোয়ারের ফলা। আর যখন হোরাস আক্রমণ শানালো, তার তলোয়ারের মতো নিচু দিয়ে উড়ে গেলো যে ক গাছি চুল হারালো সেথ্ তার মাথা থেকে। মন্দিরের নাচিয়েদের মতোই জটিল এবং অভিজাত তাদের পায়ের কাজ, বাজপাখির মতো ক্ষিপ্র, শিকারী চিতার মতো খুনে।
দর্শকের মতো আমিও বিভোর হয়ে গিয়েছিলাম সেই লড়াইয়ে। এরপরেই, সম্ভবত কোনো গভীর অতিন্দ্রিয় আমাকে সতর্ক করে দিল, হতে পারে, কোনো দেবতারই কাজ সেটা; কে বলতে পারে? যাই হোক, কেননা যেনো যুদ্ধ থেকে দৃষ্টি সরিয়ে সামনের সারিতে উপবিষ্ট ইনটেফের দিকে চাইলাম আমি।
এবারেও, জানি না এটা কি অতিন্দ্রিক কোনো ক্রিয়া নাকি ইনটে সম্বন্ধে আমার গভীর জ্ঞানের কারণে, নাকি ট্যানাসকে রক্ষাকারী দেবতার ইশারায়, চিন্তাটা ঢুকে গেলো আমার মাথায়। হয়তো তিনটি ব্যপার মিলে যাওয়ার কারণেই, সাথে সাথেই পুরো ঘটনা দিবালোকের মতো পরিষ্কার হয়ে গেলো আমার কাছে। ইনটেকের ওই নেকড়ে-হাসির একটা মাত্র অর্থ আছে।
এখন আমি জানি, কেন সেথ্-এর চরিত্রে র্যাসফারকে নিয়েছেন তিনি। এখন আমি জানি, কেন হোরাসের ভূমিকা থেকে ট্যানাসকে সরিয়ে দেওয়ার কোনো চেষ্টা তিনি করেন নি। যখন তিনি জানতেন লসট্রিসের সাথে ওর সম্পর্কের কথা। বুঝলাম, কেননা সত্যিকারের অস্ত্র ব্যবহারে তিনি উৎসাহ দিয়েছেন। জানি, কেন এই মুহূর্তে হাসছেন ইনটেফ। আজকের সন্ধার সত্যিকারের নাটক এখনও শেষ হয় নি। আরো ঘটবে। এই অঙ্ক শেষ হওয়ার আগেই কাজ সমাধা করে ফেলবে র্যাসফার।
