প্রতিস্থাপিত দেবী তার অবস্থানে যেতেই, মঞ্চের পেছনের মশালগুলো জ্বলে উঠল, যেনো পর্দায় তার ছায়া পড়ে। ইঙ্গিতপূর্ণ ভঙিতে কাপড় ছাড়তে লাগলো সে। আধো অন্ধকার, আধো ছায়ায় তার এই আন্দোলনে হর্ষধ্বনিতে মুখর হলো পুরুষেরা। এই উল্লাসের কারণেই কিনা কে জানে, আরো বেশি আবেদনময়ী হয়ে উঠলো মেয়েটার অভিনয়।
এবারে নাটকের এমন অংশে এসে পড়েছি আমরা, যা নিয়ে বেশ ভাবনা-চিন্তা করতে হয়েছে আমাকে। সন্তান জন্মের ঘটনা কেমন করে প্রদর্শন করতে পারি আমি? মাত্রই ওসিরিসকে অঙ্গ-হারা হতে দেখেছি আমরা। শেষ পর্যন্ত সেই পুরোনো মঞ্চ নাটকের সাহায্য নিতে হয়েছিলো আমাকে, দেব-দেবীদের অত্যাশ্চর্য ক্ষমতার দোহাই দিয়ে।
ভেতর থেকে কথা বলে উঠলো লসট্রিস; তার দেহের ছায়া পড়ল ওসিরিসের মমি করা দেহে, ইঙ্গিত করতে লাগলো সেটা। প্রিয় ভ্রাতা, আমাদের পিতামহ, আমন রার দেওয়া অত্যাশ্চর্য ক্ষমতার বলে তোমাকে আমি ফিরিয়ে দিচ্ছি সেই অংশ, যা থেকে নির্মম সেথ তোমাকে বঞ্চিত করেছিল।
মন্দিরের ছাদে সংযুক্ত একটা পুলির সাহায্যে লিনেনের সুতায় তুলে ধরা সম্ভব, এমন একটা বস্তু রেখেছিলাম ওসিরিসের দেহে। আইসিসের কথায়, স্বর্গীয় দেবতার জম্ম থেকে উঠে দাঁড়াল কাঠের জননাঙ্গ; প্রায় আমার হাতের সমান দীর্ঘ সেটা, সম্পূর্ণ উদ্ধত! মুগ্ধতায় গুঙ্গিয়ে উঠলো জনতা।
আইসিস আদর করতেই সুতার টানে নড়ালাম আমি ওটাকে। দর্শক আরো আনন্দ পেলো যখন দেবতার শায়িত শরীরে চড়ে বসল আইসিস। লসট্রিসের বদলী মেয়েটা অসধারণ কাজ দেখাল এবারে, শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে গেলো ব্যাপারটাকে। শিষ দিয়ে, হর্ষধ্বনির মাধ্যমে তাকে উৎসাহ যোগাল দর্শক। পরামর্শের বন্যা ধেয়ে যাচ্ছে তার দিকে।
পুলকের চরম শিখরে পৌঁছে গেছে আইসিস, ঠিক তখনই নিভে গেলো সমস্ত আলো । ঘুটঘুঁটে অন্ধকার এখন মন্দির জুড়ে। এই সুযোগে লসট্রিস চলে এলো মঞ্চে, আবার যখন জ্বলল মশাল, এক নবজাতককে কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেলো আইসিসকে। মাত্র কয়েকদিন আগেই প্রাসাদের একজন রাধুনি সন্তান জন্ম দিয়েছে, তার কাছ থেকে একে ধার নিয়েছি আমি।
আমি তোমাদের দিলাম ওসিরিসের নবজাতক সন্তান, অজানা রাজ্যের দেবতা যিনি; এবং আইসিস-এর সন্তান যিনি চন্দ্র-তারার দেবী। নবজাতক ছেলেকে উঁচু করে ধরলো লসট্রিস, সামনের জনসমুদ্র দেখেই কিনা কে জানে, ভীষণ কান্না জুড়ে দিলো বাচ্চাটা!
তার চিৎকার ছাপিয়ে বলে চললো লসট্রিস, তরুণ দেবতা হোরাসকে স্বাগত জানাও! যিনি আকাশ, বাতাস আর স্বর্গের বাজপাখির দেবতা! দর্শকদের মধ্যে অর্ধেকই হোরাসের উপাসক, তাঁর প্রতি তাদের আনুগত্য সীমাহীন। গর্জনে ফেটে পড়ে পায়ের উপর দাঁড়িয়ে গেলো তারা। আমাকে আনন্দের বন্যায় ভাসিয়ে, আর তরুণ দেবতার আতঙ্কের মধ্য দিয়ে শেষ হলো দ্বিতীয় অঙ্ক। পরে জানা গেছে, ভয়ে কাপড় ভিজিয়ে ফেলেছিলো বেচারা শিশু-হোরাস!
*
হোরাসের বাল্যকাল এবং যৌবনে পদার্পণের বর্ণনা আবৃত্তির মাধ্যমে শুরু হলে কাব্যনাট্যের শেষ অঙ্ক। তার উপরে অর্পিত পবিত্র দায়িত্বের কথা বললাম আমি নেপথ্যে, ঠিক তখনই পর্দা সরে যেতে মঞ্চে দেখা গেলো আইসিসকে।
দাসীদের সঙ্গী করে নীল নদে স্নান করছেন দেবী। ভেজা কাপড়টা সেঁটে আছে তার শরীরে, ত্বকের হলদেটে আভা ফুটে বেরুচ্ছে অবয়ব থেকে। কুমারী স্তনের সুডৌল আকৃতির কুঁড়োয় উদ্ধত গোলাপী বৃন্ত।
হোরাসরূপী ট্যানাস প্রবেশ করলো মঞ্চে। চকচকে বর্ম-সজ্জিত তার অবয়বে যোদ্ধার গর্ব, লসট্রিসের অসাধারণ সৌন্দর্য্যের যোগ্য সঙ্গী। জল যুদ্ধে তার অর্জিত বহু সম্মান এবং সাম্প্রতিক রাজকীয় জলযান উদ্ধারের ঘটনা দেশবাসীর মনোযোগের কেন্দ্রে নিয়ে গেছে তাকে। আজ, এই মুহূর্তে, ট্যানাস পুরো মিশরের প্রিয়তম ব্যক্তি। সে মুখ খোলার আগেই হর্ষধ্বনিতে মুখর হলো জনতা, এতো দীর্ঘ সময় ধরে চললো সেই উচ্ছ্বাস, অভিনয় থামিয়ে নীরবে অপেক্ষা করতে লাগলো কুশীলবেরা।
চারিদিকে যখন এই উল্লাস-উচ্ছ্বাস, দর্শক সারিতে উপবিষ্ট কিছু মুখের ভাবাবেগ দেখলাম মনোযাগ দিয়ে। মিশরের সাহসী সিংহ, নেমবেট তাঁর দাড়ির আড়ালে বিড়বিড় করে অভিশাপ দিচ্ছেন, কোনো চেষ্টা নেই ভাবাবেগ গোপন করার। স্মিত হেসে সামান্য মাথা ঝাঁকালেন ফারাও, তার পেছনে বসা সভাসদদের উৎসাহ তাতে বাধ্য হয়ে চড়ল। আমার মনিব, ইনটেফ, কখনই বাতাসের বিপরীতে যাওয়ার লোক নন, তার সবচেয়ে মসৃণ হাসি হাসলেন তিনি, ফারাও-এর অনুকরণে মাথা ঝাঁকালেন। কিন্তু তার চোখের খুনে দৃষ্টি আমার নজর এড়াল না।
কোলাহল কমে আসতে মুখ খুলল ট্যানাস, কিন্তু যতবারই বাক্যে বিরতি পড়ছিল, তুমুল হট্টগোলে ফেটে পড়ছিল জনতা। অবশেষে আইসিস তার সুমিষ্ট গলায় গাইতে শুরু করতে নীরবতা নেমে এলো মন্দির জুড়ে।
তোমার পিতার সুতীব্র যন্ত্রণা,
দুঃসহ যে কালো মেঘ ভেসে আছে আমাদের মস্তকের উপরে
এর সবই ফিরিয়ে দিতে হবে।
পদ্যে আইসিস সতর্ক করে দিচ্ছেন তার মহান পুত্রকে, হাত উঁচিয়ে নির্দেশ দিচ্ছেন–
সেথ্-এর অভিশাপ আমাদের ঘিরে আছে, শুধু তুমি পারো তা ভেঙে ফেলতে। খুঁজে বের করো ওই পাষণ্ডকে; তার ঔদ্ধত্য আর হিংস্রতায় তুমি চিনবে তাঁকে। তাকে জানো, আঘাত করো। শৃঙ্খলিত করো, বেঁধে ফেলো তোমার ইচ্ছাশক্তি দিয়ে; ওই বর্বরের হাত থেকে মুক্ত করো সকল দেবতা আর মানবকে।
