লিনেন পর্দার ওপাশে আড়ালে থাকল লসট্রিস। দর্শকের সামনে এসে দাঁড়ালাম আমি। এবারে আর উন্নাসিক কোনো কণ্ঠস্বর ব্যঙ্গ করলো না। উপস্থিত প্রত্যেকে, মহান ফারাও থেকে শুরু করে সবচেয়ে নিচু বর্ণের লোকটি পর্যন্ত আচ্ছন্ন হয়ে আছে আমার কথার জাদুতে। ধীর লয়ের গদ্যে আমি বর্ণনা করতে লাগলাম ভাইয়ের মৃত্যুতে আইসিস এবং তার বোন নেফথিস-এর শোকের কথা।
আমার বলা শেষ হতে একপাশে সরিয়ে নেওয়া হলো পর্দা, শোকাবহ আইসিস এর অনিন্দ্য সৌন্দর্য্যে দম আঁকালো জনতা। প্রথম অঙ্কের রক্ত আর হত্যাদর্শনের পর এই তার এই উপস্থিতি আরো অসাধারণ হয়ে উঠল।
মৃত ভাইয়ের শোকে আচ্ছন্ন আইসিস গাইতে লাগল, মন্দিরের বিষণ্ণ দেওয়াল যেনো শিউরে উঠলো সে সুরে। তার নড়াচড়ার সাথে সাথে মশালের আলোয় সরে গিয়ে পড়ল সেই সুন্দর মুখশ্রীতে, মাথার চকচকে মুকুট যেনো সোনা ছড়াতে লাগল।
পুরোটা সময় ফারাও-কে লক্ষ্য করলাম আমি । একবারের জন্যে তার চোখ সরলো লসট্রিসের উপর থেকে, সহানুভূতিতে আর্দ্র-হৃদয়, আইসিসের সঙ্গে নিঃশব্দে গাইতে লাগলেন তিনি।
ব্যথাতুর বিবশতা আমাকে পীড়ণ করছে
আমার হৃদয় এক আহত হরিণী
দুঃখের হিংস্র থাবায় ক্ষত-বিক্ষত—
শোকে আচ্ছন্ন আইসিসের গানে সঙ্গী হলেন মহান ফারাও এবং তার সভাসদ।
মধু-রাজ্যে আর মিষ্টি নেই,
গন্ধ নেই কোনো মরুভূমির ফুলে।
আমার হৃদয় আজ শূন্য মন্দির এক,
ভালোবাসার দেবতা ছেড়ে গেছে যাকে।
সামনের সারিতে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো ফারাও-এর পত্নীদের কয়েকজন, কেউ লক্ষ্যও করলো না সেদিকে।
হাসি-মুখে মৃত্যুর চোখে চোখে তাকিয়েছি আমি।
তার পিছু পিছু যেতে কোনো দ্বিধা নেই আর,
যদি এমন করে পৌঁছে যাই তাঁর পানে–
এতক্ষণে কেবল রাজার পত্নীই নয়, সমস্ত মেয়েরা কাঁদতে লাগল, বহু পুরুষের চোখেও দেখলাম অশ্রু। লসট্রিসের কণ্ঠস্বর, তার রূপ হৃদয় ছুঁয়ে গেছে সবার। একজন দেবতার পক্ষে সাধারণ মানুষের মতো আবেগ প্রদর্শন করা অসম্ভব বলে মনে হতে পারে, কিন্তু আমাদের মহান ফারাও-এর প্রসাধন-চর্চিত গাল বেয়ে নামলো পানির ধারা; কাজল দেওয়া, পেঁচার মতো চোখে আমার মিসট্রেসের দিকে চেয়ে রইলেন তিনি।
নেফথিস তার বোনের সঙ্গে যোগ দিলো দ্বৈত-সংগীতে। হাতে হাত রেখে দুই দেবী মিলে খুঁজে ফিরতে লাগলো তাদের প্রাণপ্রিয় ভাইয়ের দেহাবশেষ।
অবশ্যই, টড-এর সত্যিকারের দেহখণ্ডগুলো মঞ্চে রাখি নি আমি। বিরতির সময়ে, আমার নির্দেশে হতভাগ্য টড-এর দেহাবশেষ নিয়ে যাওয়া হয়েছে শব-প্রস্তুতকারীদের কাছে। নিজের গাঁটের পয়সা খরচ করবো আমি ওর শেষকৃত্যে। তার হত্যায় আমার ভূমিকার এতে করে যদি কিছুও লাঘব হয়। যদিও ফারাও-এর হাতে রয়েছে শেষ দেহখণ্ডটি, আমার বিশ্বাস, অন্তত একবারের জন্যে হলেও নিজেদের নিয়মের অন্যথা করে অঙ্গবিহীন টড-এর আত্মাকে অজানা রাজ্যে যেতে দেবেন দেবতারা; হয়তো আমাকে অতটা খারাপ চোখে দেখবে না সে সেখানে। বন্ধু থাকা জরুরি, তা সে এখানে, এই পৃথিবীতে হোক বা অজানা রাজ্যে।
দেবতা ওসিরিসের দেহ হিসেবে নেক্রোপলিসের শিল্পীদের দিয়ে চমৎকার একটা নকল তৈরি করেছিলাম আমি। তেরোটি খণ্ডে কাটা হয়েছে সেই দেহ, ঠিক শিশুদের খেলনার মতো জোড়া লাগানো সম্ভব।
প্রতিটি খণ্ড কুড়িয়ে নেওয়ার সময় গেয়ে চললো দুই বোন। দুই হাত, দুই পা, তার দেহকাণ্ড, শেষমেষ তার পবিত্র মস্তক।
এ এমন চোখ, যেনো স্বর্গের মিটমিটে তারা,
চিরকাল জ্বলে যাবে।
মৃত্যুর শক্তি নেই একে ম্লান করে,
শবাধারের নেই স্থান
একে ধরে।
শেষপর্যন্ত দুই দেবী মিলে জড় করে ফেললো ওসিরিসের সম্পূর্ণ দেহ, কেবল সেই হারিয়ে যাওয়া তালিসমান ছাড়া। তারা আলোচনা করে চললো কিভাবে ফিরে পাবে সেটা।
যে কোনো মঞ্চ-নাটক জনপ্রিয় করে তোলার অনুষঙ্গ হিসেবে একটা সুযোগ ছিলো এটা আমার। আমাদের সবার ভেতরেই বাস করে অতৃপ্ত কামনা, কাব্য বা নাটক রচনার সময়ে এ কথাটা মাথায় থাকলে অমরত্ব পেতে পারেন একজন কবি বা নাট্যকার। সাধারণ জনতার মনে দাগ কাটতে হলে এর বিকল্প নেই।
একটি মাত্র উপায় আছে আমাদের প্রিয় ভ্রাতাকে জগতে ফিরিয়ে আনার। কথাকটা দেবী নেফথিস-এর মুখ দিয়ে বলিয়েছিলাম আমি। তার খণ্ড-বিখণ্ড দেহের সাথে আমাদের কাউকেই পালন করতে হবে সৃষ্টির খেলা, একমাত্র এতে করেই জীবন ফিরে পাবে সে।
এই পরামর্শে আগ্রহে সামনে ঝুঁকে বসে দর্শক। সবচেয়ে শিল্পরসবোধহীন যিনি, এমনকি শব-বলাকারী পর্যন্ত উদ্দিপ্ত হবে এমন অনুষঙ্গে।
কিংবদন্তির এই ওসিরিস-পুনরুত্থান কেমন করে দেখাবো–এই নিয়ে বহু বিন্দ্ৰি রজনী কেটেছে আমার। আমাকে অবাক করে দিয়ে লসট্রিস সম্মত হয়েছিলো পুরো অভিনয়টুকু করে দেখাতে। এমনকি, দুষ্ট হেসে এমনও বলেছিল, এতে করে মূল্যবান কিছু জিনিস শেখা হবে তার। আমি জানি না, সে কি মজা করছিল নাকি সত্যিই করতো কাজটা; কিন্তু এতো বড় ঝুঁকি তো আর নিতে পারি না! তার পারিবারিক মর্যাদা হেলাফেলা করার মতো কোনো ব্যাপার নয়।
তো, আমার ইশারায় পর্দা টানা হলো, তড়িৎ মঞ্চ ত্যাগ করলো লসট্রিস। বন্দরের কাছেই, এক মধুকুঞ্জের উঁচু দরের রূপোপজীবনী তার জায়গা নিল। বহু মেয়ের মধ্য থেকে বেছে তাকে নিয়েছি আমি, অসাধারণ একটা শরীর আছে এর–আমার মিসট্রেসের সঙ্গে বেশ মেলে। অবশ্যই, মুখশ্রীতে আমার মিসট্রেসের ধারে-কাছেও নয় সে, তবে ওর মতো সুন্দরী আর কে-ই বা আছে?
