তলোয়ারের নিরাসক্ত কোপে বাহুটা বিচ্ছিন্ন করে ফেলল সেথ, তার লাল মুঠোয় ধরা প্রত্যঙ্গ ফেলে এলিয়ে পড়লো ওসিরিস। পায়ের উপর দাঁড়াতে চাইছে সে, হাতের অবলম্বন না থাকায় পারছে না। থেকে থেকে ছুঁড়ছে পা জোড়া, মাথা নড়ছে এপাশ ওপাশ; চেঁচিয়ে চলেছে সে। ভয়ঙ্কর এই দৃশ্য থেকে চোখ সরিয়ে নিতে চাইলাম আমি, পারলাম না।
কবজি এবং কনুইয়ের কাছ থেকে তিন টুকরো করলো সে হাতটাকে। এক এক করে খণ্ডগুলো ছুঁড়ে ফেলল দর্শকসারিতে। বাতাসে ভেসে যেতে যেতে রক্তের ধারা ঝরাল ওগুলো। ফারাও-এর চিড়িয়াখানায় আটক, ক্ষিধেয় উন্মত্ত সিংহের মতো হাত বাড়ায় তারা দেবতার দেহবশেষের দখল নিতে কাড়াকাড়ি শুরু করে।
অদ্ভুত মনোযোগর সাথে কাজ করে চলে সেথ। গোড়ালি বরাবর খণ্ড-বিখণ্ড করে ফেলে ওসিরিসের পা জোড়া। এরপরে, হাঁটু বরাবর এবং সবশেষে, কোমরে এসে খণ্ড করে উরু। দেহাবশেষগুলো ছুঁড়ে ফেলে দেয় রক্ত-তৃষ্ণার্ত জনতার উদ্দেশ্যে। আরো দাবি করতে থাকে তারা।
সেথ এর উপহার! গর্জে উঠে একটা কণ্ঠ। আমাদেরকে সেথ এর উপহার দাও? এই আবেদন জোরালো রূপ নিল মুহূর্তেই। এ হলো সেথ্-এর তালিসমান। কিংবদন্তি অনুযায়ী, তালিসমান হলো সকল জাদুকরী ক্ষমতার মূল। যে ব্যক্তি তা পাবে, অন্ধকার জগতের শক্তিগুলো তার অধীন হবে। ওসিরিসের শরীরের চৌদ্দ খণ্ডাংশের মধ্যে কেবল একটি খণ্ড খুঁজে পায় নি আইসিস এবং তার বোন নেফথিস। পৃথিবীর বিভিন্ন অংশে সেগুলোকে ছড়িয়ে রেখেছিল সেথ। র্যাসফার আমার যে অঙ্গ কেটে ফেলেছে, সেটাই ছিলো সেথ-এর তালিসমান। আমার মনিব, ইনটেফের গলার হারে শোভা পাচ্ছে যা ।
সেথ্-এর তালিসমান দাও আমাদের! জনতার রোষ চরমে উঠে। লাল রক্তে ভিজে যাওয়া আচকান ধরে দেহকাণ্ডটা উঁচু করে সেথ। তখনও হাসছিল সে। নির্দয় সেই আওয়াজ কাঁপিয়ে দেয় আমাকে। করুণার সাথে উরুসন্ধির সেই আগুনে ক্ষত মনে পড়ে গেলো আমার, ইতিমধ্যেই শিকারের রক্তে ভিজে যাওয়া লোমশ হাতে দেহাকাণ্ড থেকে তলোয়ারের কোপে সেই অঙ্গ বিচ্ছিন্ন করে সে; উল্লাসে উন্মত্ত জনতাকে উঁচু করে দেখায়।
আবেদনে ফেটে পড়ে দর্শককুল। আমাদের দাও ওটা! ভিক্ষে চায় তারা। তালিসমান-এর ক্ষমতা দাও আমাদের! জংলী জানোয়ারে পরিণত হয়েছে তারা।
এই আবেদনে কান দেয় না সেথ। একটি উপহার! চিৎকার করে উঠে সে। একজন দেবতা শুধু আর একজন দেবতাকেই উপহার দিতে পারে! আমি, অন্ধকারের দেবতা, সেথ, এই তালিসমান উপহার দেব-দেবতা ফারাওকে, মহান মামোসকে! শক্তিশালী পায়ে সিঁড়ি বেয়ে মঞ্চ থেকে নেমে ফারাও-এর পায়ের কাছে ওটা রাখে সেথ।
অবিশ্বাসের সাথে দেখলাম, নিচু হয়ে সেটা কুড়িয়ে নিলেন ফারাও। তার প্রসাধন চর্চিত মুখাবয়বে বিস্ময়ের চিহ্ন ফুটে উঠে, এ যেনো সত্যিই কোনো দেবতার দেহাবশেষ । আমি নিশ্চিত, সেই মুহূর্তে এটাই ভাবছিলেন তিনি। সবার সম্মুখে ডান হাতে ধরলেন তালিসমান।
তার উপহার গৃহীত হতে ছুটে মঞ্চে ফিরে এলো সেথ, কাজ শেষ করতে। হতভাগ্য সেই ওসিরিস তখনও সজাগ, প্রতিটি ব্যথার ঢেউ বোধ করতে পারছে। জানি, আমার দেওয়া ওষুধ এ নিদারুন কষ্টে কোনো উপকারেই আসছে না। নিজের রক্তের পুকুরে শুয়ে শরীরের একমাত্র সঞ্চালনক্ষম অংশ, মাথা নাড়ছিলো সে এপাশ-ওপাশ। দৃষ্টিতে অনন্যসাধারণ কষ্ট।
চুলের গোছা ধরে যখন মাথাটা আলাদা করে ফেলল সে, দারুন স্বস্তিবোধ করলাম আমি । এরপরেও, জীবনের শেষ পলক পর্যন্ত কোটরের ভেতরে অস্থির নড়াচড়া করে গেলো চোখের মণিদুটো। শেষমেষ ঘোলাটে হয়ে এলো সেই দৃষ্টি, ধীরে নিভে গেলো উজ্জ্বলতা। জনতার উদ্দেশ্যে মাথাটা ছুঁড়ে দিলো সেথ।
আর এভাবেই, মন্দিরের পাথুরে স্তম্ভের ভিত্তিমূল কাঁপিয়ে দেওয়া হর্ষধ্বনির মধ্য দিয়ে শেষ হলো আমাদের কাব্যনাট্যের প্রথম অঙ্ক।
*
দাস বালকেরা মঞ্চ থেকে বীভৎস হত্যাকাণ্ডের নিদর্শনগুলো সরিয়ে নিয়ে গেলো দৃশ্য-বিরতিতে। আমি বিশেষ চিন্তিত ছিলাম। লসট্রিসকে নিয়ে, সে যেনো টের না পায় ঠিক কী ঘটে গেছে কিছুক্ষণ আগে। মনে আশা, হয়তো ও ভাবছে সবকিছু অনুশীলনের মতোই হয়েছে। ওকে তাঁবুতেই রেখে, ট্যানাসের একজন লোককে পাহারায় রেখেছিলাম; আরো নজর রেখেছি কুশ দেশীয় দাসী মেয়েগুলো যেনো উঁকি মেরে কী ঘটছে দেখে আবার লসট্রিসকে গিয়ে বলতে না পারে। বিলক্ষণ জানি, কী ঘটেছে টের পেলে আর অভিনয়ে রাজী করানো যাবে না তাকে। বালতি ভর্তি পানি দিয়ে মঞ্চের বীভৎস দাগ মুছে ফেলল বালকেরা, ছুটে আমার মিসট্রেসের তাঁবুতে পৌঁছুলাম ওকে সাহস দিতে।
ওহ টাইটা, আমি লোকের চিৎকার শুনেছি, আনন্দে উদ্বেল লসট্রিস স্বাগত জানায়। আমাকে। সবাই পছন্দ করেছে তোমার নাটক । তোমার জন্যে কী যে খুশি লাগছে। এটা তোমার প্রাপ্য ছিলো। ষড়যন্ত্রির মতো মুচকি হাসলো ও, শুনে মনে হলো, ওরা বুঝি ভেবেছে ওসিরিসের মৃত্যু সত্যি ঘটেছে; যাঁড়ের রক্ত দেখে মনে করেছে আসলে টড-এর রক্ত ওগুলো!
তা-ই, মিসট্রেস, আমাদের চালাকি ওরা বুঝতে পারে নি। সম্মত হলাম আমি। মাত্রই দেখা নির্মম দৃশ্যাবলি এখনও আচ্ছন্ন করে রেখেছে আমাকে।
কিছুই টের পায় নি লসট্রিস। মঞ্চে পৌঁছে দিলাম ওকে, মেঝের দাগগুলোর দিকে ফিরেও তাকালো না সে। উদ্বোধনী দৃশ্যের জন্যে ওকে দাঁড় করিয়ে দিলাম জায়গামতো, মশালের আলো ঠিক করে নিলাম। যদিও তার সৌন্দর্য্যে আমি অভ্যস্ত, কিন্তু এই মুহূর্তে যেনো গলায় জমে যাচ্ছে শব্দ ওর রূপের ছটায়।
