একদম শিশুর মতো হয়ে গেছে দর্শক। অবাক, আনন্দিত, থেকে থেকে হাতের মুঠোয় ধরে ফেলছে প্রজাপতি, আবার ছেড়ে দিতেই মন্দিরের উঁচু খিলানের ফাঁকে উড়তে থাকল ওগুলো। সাদা, সিনামন আর কালো রঙের ডোরাকাটা অসাধারন একটা হুপো পাখি এসে বসল ফারাও-এর মুকুটে, নির্ভয়ে ।
খুশিতে আন্দোলিত হয় জনতা। একটা ইশারা! চেঁচায় তারা। রাজার জন্যে আশীর্বাদ। তিনি চিরজীবী হোন! হেসে উঠলেন মহান ফারাও।
ব্যাপারটা অবশ্য একটু চালাকি হয়ে গেছে, পরবর্তীতে আমার মনিব, ইনটেফের কাছে বলেছি, পাখিটাকে প্রশিক্ষণ দিয়ে ফারাও এর মুকুটে বসিয়েছি আমি। মজার ব্যাপার, এই অসম্ভব কথাটা বিশ্বাস করেছেন তিনি। পশুপাখির সাথে আমার যোগাযোগ নিয়ে এমন কথাও লোকে বিশ্বাস করে।
মঞ্চে, নিজের তৈরি স্বর্গে ঘুরে ফিরছেন ওসিরিস। নাটকীয় মুহূর্তের জন্যে সম্পূর্ণ তৈরি আবহাওয়া। রক্ত হীম করা চিৎকারের সাথে মঞ্চে প্রবেশ করলো সেথ। সবাই তার আগমনের অপেক্ষায় ছিলো, এরপরেও তার কর্কশ উপস্থিতি চমকে দিলো দর্শকদের। চিৎকার করে মুখ ঢেকে ফেলে, কাঁপা-কাঁপা আঙুলের ফাঁকে দিয়ে দেখতে লাগলো মহিলারা।
একি করলে, ভাই? হিংসায় হুঙ্কার দিয়ে উঠে সেথ। আমিও কি দেবতা নই? সব সৃষ্টি যদি তোমার হবে, আমি তোমার ভাই হয়েও কিছু পাবো না?
শান্তস্বরে উত্তর দেয় ওসিরিস, তার মর্যাদাপূর্ণ কণ্ঠস্বর দূরাগত শোনাল ওষুধের প্রভাবে। আমাদের পিতা, আমন রা এ সবই দিয়েছেন আমাদের দু জনকে। অবশ্য তিনি আমাদেরকে পছন্দ করার স্বাধীনতা দিয়েছেন মন্দ বা ভালো যে কাজে ব্যবহার করি, দেবতার মুখে আমারই রচিত বাক্য প্রতিধ্বনি তোলে মন্দিরের ভেতরে। আমার লেখা সবচেয়ে উকৃষ্ট গদ্য এটা, যেনো গিলতে থাকে জনতা। কেবল আমি জানি, কী ঘটতে যাচ্ছে কিছুক্ষণের মধ্যে; তিক্ততায় বিষিয়ে গেলো মন।
কথার শেষে পৌঁছে গেছে ওসিরিস। এটা আমার সৃষ্টি দুনিয়া। যদি শান্তি এবং ভালোবাসায় উপভোগ করতে চাও, তোমাকে স্বাগতম। কিন্তু যদি যুদ্ধের মতো উন্মত্ত আচরণ কর, যদি ঘৃণা আর নষ্ট তোমার হৃদয় অধিকার করে রাখে, তবে এখান থেকে চলে যাও। সাদা লিনেনে মোড়া হাত তুলে স্বর্গোদ্যান ত্যাগের নির্দেশ দেয় ওসিরিস।
ঠিক ষাঁড়ের মতোই ভীষণ লোমশ কাঁধ ঝাঁকায় সেথ, প্রচণ্ড হুঙ্কারে কেঁপে উঠে মন্দির। ব্রোঞ্জের তলোয়ারটা মাথার উপরে ঘুরিয়ে ভাইয়ের উদ্দেশ্যে ঝাঁপিয়ে পড়ে সে। কখনই অনুশীলন করা হয় নি এটা, একদম বোকা বনে গেলো ওসিরিস। ডান হাত প্রসারিত রেখে হতবুদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল সে, বাতাস কেটে প্রচণ্ড আঘাতে নেমে এলো তলোয়ারের ফলা। আমার চাতালের লতাগুল্ম যেমন করে ছিঁড়ে আনি কাণ্ড থেকে, ঠিক তেমনি সহজে কেটে গেলো হাতটা কবজি থেকে। ওসিরিসের পায়ের কাছেই পড়ল সেটা, থেকে থেকে লাফাচ্ছে আঙুলগুলো।
ঘটনার আকস্মিকতায়, তলোয়ারের প্রচণ্ড ধারের কারণেই হয়তো, কয়েক মুহূর্ত নড়ল না ওসিরিস, কেবল পা কেঁপে উঠলো তার। দর্শকরা ভাবল, এ-ও কোনো ধরনের মঞ্চ খেলা, কেটে যাওয়া হাতটা হয়তো নকল। সাথে সাথে রক্তপাত না হওয়ায় তাদের চিন্তা আরো জোরালো হলো। সতর্ক নয়, আরো মনোযোগী হলো তারা; কিন্তু হঠাৎই কাটা হাত আঁকড়ে ধরে কেঁদে উঠলো ওসিরিস। পড়ে গেলো। ফিনকি দিয়ে রক্ত ছুটছে আঘাত থেকে, ভিজিয়ে লাল করে ফেলছে সাদা আচকান। হাত আঁকড়ে ধরে টলোমলো পায়ে দাঁড়াল ওসিরিস, মঞ্চের উপরে তীব্র চিৎকারে আবেদন করে চললো । তীব্র, তীক্ষ্ণ সেই চিৎকার এতো মর্মস্পর্শী, ঘোর ভাঙল জনতার। প্রথমবারের মতো তারা বুঝতে পারল, এটা নাটক নয়; আতঙ্কে নিচুপ হয়ে গেলো সবাই।
মঞ্চের প্রান্তসীমায় পৌঁছুবার আগেই দ্রুত পায়ে দৌড়ে ওসিরিসকে ধরে ফেলল সেথ। কাটা হাত ধরে টেনে মঞ্চের মাঝখানে নিয়ে এলো তাকে, ছুঁড়ে ফেলল পাথরের মেঝেতে। মাথার মুকুট খুলে যেতে দীর্ঘ কালো চুল বেরিয়ে পড়ল ওসিরিসের, নিজের রক্তের পুকুরে পড়ে রইল সে।
দয়া কর, ক্ষমা কর আমাকে! আবেদন জানাল ওসিরিস, তার পায়ের কাছে দাঁড়িয়ে হো হো হাসিতে ফেটে পড়ল সেথ। গভীর, নিঘাদ আনন্দ প্রকাশ পেলো তার হাসিতে। রাসফার এখন সেথ হয়ে গেছে, দারুন ভাবে উপভোগ করছে প্রতিটি মুহূর্ত। সেথ এর বন্য হাসিতে চমক পুরো ভাঙে জনতার। তাদের কেউই এখন বিশ্বাস করে না, নাটক চলছে এখানে; চরমধর্মী এই কর্মকাণ্ড এখন তাদের কাছে উপভোগ্য বাস্তব। তাদেরই দেবতার হত্যাদৃশ্য দেখে শিউরে উঠে মেয়েরা, পুরুষেরা গর্জন করে রাগের আতিশায্যে।
ছেড়ে দাও তাকে! মহান দেবতা, ওসিরিসকে ছেড়ে দাও! তারা চিৎকার করে, কিন্তু একজনও নিজের আসন ছেড়ে মঞ্চে এসে ভয়ঙ্কর এই ট্রাজেডি থামাবার কোনো চেষ্টাও করে না। দেবতাদের আবেগ আর বিরাগ তো তাদের হস্তক্ষেপের বাইরে, তাই না?
অবশিষ্ট এক হাতে সেথ এর পা আঁকড়ে ধরে ওসিরিস। তখনও হাসছিল সেথ, টেনে লম্বা করে দেখল সে হাতটাকে ঠিক যেমন জবাই করার আগে জম্ভগুলোকে পরখ করে কসাই।
কেটে ফেল! রক্তের নেশায় পাগল কোনো কন্ঠ বলে উঠে জনতার ভেতর থেকে। পাল্টে গেছে তাদের ভাবাবেগ।
মেরে ফেল তাকে! চেঁচিয়ে বলে আরেকটি কণ্ঠ। রক্ত-দর্শন আর হত্যা এমনকি সবচেয়ে শান্ত মানুষটিকেও কেমন করে ক্ষেপিয়ে তোলে, ব্যাপারটা সব সময়ই ভাবিয়েছে আমাকে। চরম এই দৃশ্যে আমি পর্যন্ত নড়ে গেছি, অসুস্থ এবং আতঙ্কিত বোধ হচ্ছে সত্যি; কিন্তু ভেতরে ভেতরে উত্তেজনা দানা বাঁধছে আমারও।
