মৃত্যু আমাকে ছিনিয়ে নিল, তাঁর কঙ্কালসার হাতে নিয়ে চললো সূর্যের দেবতা আমন রার কাছে। তার সাদা আলোর অধিকারে চলে গেলাম আমি। দূর থেকে শুনি, আমার প্রিয়তমা কাঁদছে; কিন্তু তাকে দেখতে পাই না। আমার দিনগুলো শূন্য মনে হয়। জনতার সম্মুখে এই প্রথম উচ্চারিত হচ্ছে আমার গদ্য, সাথে সাথেই বুঝতে পারলাম, তাদের মনোযোগ পেয়েছি; সবার মুখাবয়বে সাগ্রহ উত্তেজনা। পিন-পতন নিরবতা সমগ্র মন্দির জুড়ে।
এরপর, উঁচু একটা স্থানে আমাকে নিয়ে গেলো মৃত্যু, যেখান থেকে আমার পৃথিবীকে দেখতে পেলাম। দুনিয়ায় বেঁচে থাকা সব মানুষ আর পশু-পাখিদের দেখতে পেলাম। শক্তিশালী নদীর মতো আমার সামনে উল্টো বয়ে যেতে থাকে সময়। হাজার বছর ধরে আমি দেখতে থাকি তাদের যন্ত্রণা, মৃত্যু। মৃত্যু থেকে শুরু করে নিজেদের শিশুকাল আর জন্মকালে ফিরে যেতে দেখি তাদের। আরো পেছনে যেতে থাকে সময়, আমি দেখতে পাই প্রথম নারী এবং পুরুষকে। তাদের জনুক্ষণ, তারও অতীতের সময়ে ফিরে চললাম। যখন কোনো মানুষ নয়, বাস করতো শুধু দেবতারা।
কিন্তু, দেবতাদের সময় ছাড়িয়ে আরো পেছনে যেতে থাকে কাল, সেই নাদের সময়ে-অন্ধকার আর প্রাগৈতিহাসিক বিশৃঙ্খলায়। আর পেছনে যেতে পারে না সময়ের নদী, পথ ঘুরিয়ে নেয় সে। আবার সামনে প্রবাহিত হতে থাকে, যেমনটা আমি জানি, জীবনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত; দেবতাদের আবেগে আলোড়িত হই। আমাদের সাম্রাজ্যের ধর্ম-ইতিহাসে দারুন দখল আছে জনতার, কিন্তু রহস্যের অবগুণ্ঠন খোলার এমন আধুনিক প্রক্রিয়ার কথা তাদের জানা ছিলো না। নিচুপ, বিমুগ্ধ জনতা এক চুল নড়ে না।
নানযুগের বিশৃঙ্খলা আর অন্ধকারের ভেতর থেকে জন্ম নিলেন আমন রা, যিনি নিজেই নিজের স্রষ্টা। আমি দেখলাম, নিজের জননেন্দ্রীয়তে আলোড়ন তুলছেন তিনি, স্বমেহন করছেন; ছড়িয়ে দিচ্ছেন তার ঔরস কালো আকাশের বুকে, যাকে আমরা আকাশগঙ্গা বলে জানি। সেই বীজ থেকেই জন্ম নিল জেব এবং নাট, স্বর্গ এবং পৃথিবী।
বাক্-হার! একটি একাকী কণ্ঠ ভেঙে ফেলে মন্দিরের অসাধারণ নিরবতা। বাক হার! আমেন! নিজেকে ধরে রাখতে পারেন নি প্রধান পুরোহিত, আমার সৃষ্টি রহস্যের বর্ণনায় আন্দোলিত হয়েছেন। তার এহেন আচরণে এতো অবাক হলাম, আর একটু হলেই ভুলে গিয়েছিলাম পরবর্তী বাক্যগুলো। তখন পর্যন্ত তিনিই ছিলেন আমার কঠোরতম সমালোচক। তার হৃদয় জয় করে নিয়েছি আমি, আনন্দে আরো প্রবল হয়ে উঠলো আমার কণ্ঠস্বর।
জেব এবং নাট মিলিত হলো সঙ্গমে, ঠিক মানব-মানবীর মতোই। সেই অসাধারণ মিলন থেকে জন্ম নিল দেবতা ওসিরিস এবং সেথ্ আর দেবী আইসিস এবং নেফথিস।
আমার ইশারায় ধীরে সরে গেলো লিনেনের পর্দা, উন্মোচিত হলো আশ্চর্য এক জগত। সমগ্র মিশরে এরকম কোনো কিছু আর দেখে নি কেউ আগে, বিস্ময়ে শ্বাস আঁকালো জনতা। পরিকল্পিত মাপা পদক্ষেপে পিছু হটলাম আমি, মঞ্চে আমার জায়গা নিল দেবতা ওসিরিস। মাথায় লম্বা, বোতলের মতো পাগড়ি, বুকের উপরে হাত দুটো বাধা সাথে সাথেই তাকে চিনতে পারল দর্শক। প্রায় সব পরিবারই ওসিরিসের মূর্তি রাখে নিজেদের প্রার্থনার ঘরে।
প্রত্যেকের গলা দিয়ে উঠে আসে অবিশ্বাসের ধ্বনি। টডকে যে সম্মোহনি ওষুধ দিয়েছি, কাজ করছে সেটা; সত্যিই তার চোখে ফুটে উঠেছে এক অদ্ভুত, চকচকে দৃষ্টি । পরাবাস্তব জগতের দেবতার মতো দেখাচ্ছে। হাতের প্রতীক চিহ্ন হাতে রহস্যময় ইঙ্গিত দেয় ওসিরিস, বজ্র কঠিন কণ্ঠস্বরে আদেশ করে, জাগো, হে নদী!
আবারো হর্ষধ্বনিতে ফেটে পড়ে জনতা, নীল নদের আগমনী বার্তা টের পেয়েছে তারা। নীল নদই হলো মিশর, পৃথিবীর কেন্দ্রস্থল।
বাক্-হার! বলে উঠে আরও একটি কণ্ঠস্বর, খিলানের আড়ালে আমার লুকানো জায়গা থেকে কে বলেছে টের পেয়ে আনন্দে, বিস্ময়ে আপ্লুত হলাম। স্বয়ং ফারাও। আমার কাব্যনাট্যে বাস্তব এবং পরাবাস্তব দু ধরনের উপাদানই রেখেছি, এখন আমি নিশ্চিত, আজ থেকে আমার সংস্করণটিই অভিনীত হবে। এক হাজার বছরেরও বেশি পুরোনো আগের নাটক আজ থেকে বাতিল হবে। অমরত্ব অর্জন করেছি আমি, শতকে শতকে স্মরণ করা হবে আমাকে।
আনন্দের সাথে প্রকোষ্ঠের দিকে ইঙ্গিত করলাম, ওখান থেকে মঞ্চে আসতে লাগলো জলের প্রবাহ। প্রথমটায় ব্যাপারটা অনুধাবন করতে পারল না দর্শক। ধীরে ধীরে তারা বুঝতে পারল, মহান নীল নদের জন্ম দেখছে তারা; হাজার কণ্ঠের গর্জন কাঁপিয়ে দেয় বাতাস, বাক্-হার! বাক্-হার!
পানি, তুমি জেগে উঠো! আহ্বান জানাল ওসিরিসি। বাধ্যগতের মতো বন্যার জলে ফুলে-ফেঁপে উঠে নদী।
পানি নেমে যাক! এবারে ঘোষণা করেন দেবতা, তার আদেশে নেমে যায় পানির স্তর। আবারো জাগো!
মন্দিরের পেছনে, প্রকোষ্ঠের ভেতর থেকে পানি প্রবাহিত হওয়ার আগে রঙ মেশানোর ব্যবস্থা করেছিলাম আমি। প্রথমে সবুজ রঙ, খরা মৌসুমের কম পানি চিত্রিত করার জন্যে; কিন্তু পরে আবারো যখন জেগে উঠলো পানির স্তর, বন্যার পলিমিশ্রিত গাঢ় রঙের পানি প্রবাহিত হতে থাকল।
এখন, জাগো, কীটপতঙ্গ আর পাখিরা! এসো, পৃথিবীর বুকে! আদেশ দিলেন ওসিরিস, মন্দিরের পেছনের খাঁচার দরোজা খুলে যেতে কিচিরমিচির করতে করতে বুনো পাখির মেঘ এবং বর্ণিল প্রজাপতি ভরে ফেলল মন্দির।
