ফারাও-এর কাছে যেমন মনে হবে, তোমার কাছেও ঠিক একই রকম চমক হিসেবে থাক ওটা। দুজনেই মজা পাবে সেক্ষেত্রে। আর কোনো কিছু বলে লাভ নেই। এক একটা সময় আমার দেখা সবচেয়ে একরোখা বর্বর বলে মনে হয় ট্যানাসকে। ঝড়ো গতিতে ওর ভঁবু ছাড়লাম।
লসট্রিসের তাবুর প্রবেশমুখ ঠেলে ভেতরে ঢুকে চমকে গেলাম। যদিও ওর পরনের পোশাকটা আমারই নকশা করা, ওর প্রসাধনীর কথাও আমি বলে দিয়েছিলাম দাসী মেয়েদের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা স্বর্গীয় অবয়বের জন্যে ঠিক প্রস্তুত ছিলাম না। এক মুহূর্তের জন্যে বিশ্বাস করতে ইচ্ছে হলো, দেবী সত্যিই মর্ত্যে নেমে এসেছেন, অশরীরী কোনো দুনিয়ার মায়া ত্যাগ করে। শ্বাস আটকে আসতে চাইল, নিজের অজান্তেই নতজানু হলাম; আমার মিসট্রেসের খিলখিল হাসি চমক ভাঙ্গালো।
কী মজা, তাই না টাইটা? পুরোদস্তুর পোশাকে ট্যানাসকে দেখার জন্যে তর সইছে না। ওকে নির্ঘাত দেবতাদের মতোই লাগছে। ধীরে ঘুরে দাঁড়িয়ে ওর পোশাক দেখার সুযোগ তরে দিলো লসট্রিস, হাসলো কাঁধের উপর দিয়ে তাকিয়ে।
তোমার চেয়ে বেশি স্বর্গীয় কিছু হতে পারে না, মাই লেডি, বিড়বিড় করে বললাম আমি।
কথন শুরু হবে নাটক? অধৈর্যের মতো বলে উঠে লসট্রিস। আর বসে থাকতে ইচ্ছা হয় না।
তাঁবুর দেওয়াল কান পেতে প্রধান কামরার বক্তৃতায় মনোযোগ দেওয়ার প্রয়াস পেলাম। শেষ হয়ে এসেছে প্রায়, যে কোনো মুহূর্তে আমার মনিব, ইনটেফ অভিনেতাদের নাটক শুরু করার নির্দেশ দেবেন।
লসট্রিসের হাতে নিজের হাতে তুলে নিলাম আমি। আলতো করে চাপ দিলাম। বেশ বিরতি দিয়ে কথা বলা আর অভিজাত ভঙির কথা মনে থাকবে তো? মনে করিয়ে দিতে চাইলাম ওকে। হালকা করে আমার কাঁধে ঘুষি মারে সে।
আরে, থামো তো! যত বকবক! দেখো, দারুন হবে সবকিছু। ঠিক সেই মুহূর্তে শুনলাম, ইনটেফ তার স্বর উঁচালেন।
পবিত্র দেবতা, ফারাও মামোস, মিশরের মহান স্রষ্টা, সাম্রাজ্যের অধিকারী, ন্যায় বিচারক, মহান যিনি সবকিছু দেখেন এবং জানেন, দয়ার আধার অভিধা এবং স্তুতি চলতেই থাকল; ওদিকে লসট্রিসের তাঁবু থেকে তড়িঘড়ি করে বেরিয়ে কেন্দ্রীয় খিলানের নিচে, আমার নিজের জায়গায় অবস্থান নিলাম। খিলানের চারদিকে উঁকি মেরে দেখি, মন্দিরের ভেতরের স্থান লোকে-লোকারণ্য হয়ে গেছে। ফারাও এবং তার বয়োজ্যেষ্ঠ পত্নীরা বসেছেন সামনের সারির নিচু সিডার কাঠের কেদারায়, থেকে থেকে চুমুক দিয়ে চলেছেন ঠাণ্ডা শরবত; নয়ত মিষ্টান্ন দ্রব্যে।
বেদীর নিচে, উঁচু একটা জায়গায় দাঁড়িয়ে তাদের উদ্দেশ্যে বলছেন আমার মালিক, ইনটেফ; ওটাই আমাদের মঞ্চ। লিনেনের পর্দা দিয়ে আড়াল করে রাখা হয়েছে মূল মঞ্চ। শেষবারের মতো ওটা একবার দেখে নিলাম, অবশ্য এখন আর কোনো কিছু পরিবর্তনের সুযোগ নেই।
পর্দার আড়ালে; দৃশ্যপট প্রস্তুত করা হয়েছে পাম এবং একাশিয়া গাছে সাজিয়ে, প্রাসাদের মালীরা আমারই নির্দেশে ওগুলো স্থাপন করেছে। পাথুরে শিল্পীদের ফারাও এর সমাধি নির্মাণ কাজ থেকে সরিয়ে নিয়ে তৈরি করা হয়েছে বিশেষ প্রকোষ্ঠ। মন্দিরের পেছনের সেই প্রকোষ্ঠ থেকে পানি প্রবাহিত করা যাবে মঞ্চে, নীল নদের প্রতীক হিসেবে।
মঞ্চের পেছনে, ছাত থেকে মেঝে পর্যন্ত টানটান লিনেনের পর্দায় অসাধারণ ছবি এঁকেছেন নেক্রোপলিসের শিল্পীরা। সূর্যাস্তের ক্রমক্ষয়িষ্ণু আলো আর মশালের শিখার কাঁপন অদ্ভুত আবহ তৈরি করেছে তাতে, যেনো এক লহমায় অতীতের কোনো সময়ে নিয়ে যাবে সবাইকে।
ফারাও-এর মনোরঞ্জনের জন্যে আরো কিছু ব্যবস্থা রেখেছি আমি। খাঁচার পশু পাখি আর প্রজাপতি ছেড়ে দেওয়া হবে বিশেষ সময়ে, দেবতা আমন রার সৃষ্টি পৃথিবীকে ফুটিয়ে তোলার জন্যে। মশালের শিখা জ্বলবে লাল এবং সবুজ রঙে; বিশেষ রাসায়নিক পদার্থ দিয়ে সেই ব্যবস্থা করা হয়েছে। আর রয়েছে বন্যা, সঙ্গে অদ্ভুতুরে ধোয়ার মতো মেঘ ঠিক অন্ধকার জগতের মতো, যেখানে বসবাস করেন দেব দেবীরা।
মামোস, রার পুত্র, আপনি চিরজীবী হোন! আমরা, আপনার প্রতিপালিত থিবেস নগরীর অধিবাসীরা আপনার মনোযোগ কামনা করছি এই নগণ্য কাব্যনাট্যে। এ আপনার উদ্দেশ্যে হে সকল সম্মানের মালিক।
আমার মনিব, ইনটেফ তাঁর স্বাগত বক্তব্য শেষে নিজের আসনে বসে পড়লেন। সুরের ধ্বনির সাথে মঞ্চে প্রবেশ করে, খিলানের আড়াল থেকে বেরিয়ে দর্শকদের মুখোমুখি দাঁড়ালাম আমি। শক্ত পাথরের মেঝেতে বসে থেকে বক্তব্য শুনে বিরক্ত হয়ে গেছে বেশিরভাগ লোকজন, উপভোগের জন্যে মুখিয়ে আছে এখন। দারুন হর্ষধ্বনির সাথে আমাকে স্বাগত জানায় জনতা। এমনকি মহান ফারাও-এর ঠোঁটেও স্মিত হাসি ফুটে উঠেছে।
হাত উঁচু করে নিরবতা কামনা করলাম। সম্পূর্ণ শান্ত হয়ে আসে জনতা, সূচনা বাণী শুরু করলাম আমি।
নীলের তীরে নলখাগড়ার উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া বাতাসের শব্দ শুনে শুনে বড় হয়েছি আমি, তারুণ্যের উচ্ছ্বাস ছিলো আমার অবয়বে। তখন বুঝি নি সেই আওয়াজের মর্ম, কিন্তু কোনো ভয় ছিলো না মনে। মাত্রই পৌরুষত্ব অর্জন করেছিলাম তখন।
সেই সুর ছিলো বয়ে যাওয়া এক সৌন্দৰ্য্য। বাদকতে খুঁজতে বেরিয়েছিলাম আমি, জানতাম না, সে ছিলো মৃত্যু স্বয়ং, সুরে সুরে প্রলুব্ধ করতে চাইছিল আমাকে। আমরা, মিশরীয়রা মৃত্যু দ্বারা আবেগ তাড়িত হই, সঙ্গে সঙ্গেই উপস্থিত দর্শকের মনোযোগ গম্ভীর হলো। দীর্ঘশ্বাস ফেলে কেঁপে উঠে তারা।
