নিজের চিকিৎসায় খুব একটা আস্থা ছিলো না আমার; অবশ্য, আমার প্রস্তুত। প্রক্রিয়ায় রাঁধা হলে সঁড়ের শুক্রাশয় অত্যন্ত সুস্বাদু খাবার। ভেবেছিলাম, রূপসী কুমারীর খোঁজে পুরো সাম্রাজ্য চষে ফেলার ব্যাপারটা ফারাও-এর কাছে বেশ উপভোগ্য হবে। মূলত, একজন রাজা যদি ক্রমাগত তরুণী মেয়েদের শয্যাসঙ্গিনী করতে থাকেন, তাহলে কোনো একজনের গর্ভে পুত্রসন্তান জন্ম নেওয়া খুবই স্বাভাবিক।
আমি অবশ্য নিজেকে এই বলে সান্তনা দেই, অন্যান্য ব্যবস্থাপত্র দানকারীদের তুলনায় আমার চিকিৎসা অতটা ভয়ঙ্কর নয়, বিশেষত ওসিরিসের মন্দিরের পুরোহিতদের চেয়ে তো নয়ই। যদি কাজ নাও হয়, আমার ব্যবস্থায় কোনো ক্ষতির সম্ভাবনা ছিলো না। আমি তাই বিশ্বাস করতাম। যদি জানতাম, ভাগ্যের পরিহাসে কী বিপরীত ভূমিকা নেবে ফারাও-কে দেওয়া আমার উপদেশ, কাব্যনাট্যে টড-এর জায়গা আমিই নিতাম।
ফারাও আমার পরামর্শ মেনে তার রাজ্যের প্রশাসকদের নির্দেশ দিয়েছিলেন, সেই এলো আমারনা থেকে জলপ্রপাত পর্যন্ত দেশের সমস্ত তেজী ষাঁড়ের শুক্রাশয় সংগ্রহ করতে; তাদের প্রতি আরো নির্দেশ রয়েছে রূপসী কুমারীদের খবর জোগাড় করে আনার। এসব জেনে দারুন আপ্লুত হয়েছিলাম। রাজপ্রাসাদে আমার দূত মারফত খবর পেয়েছি, ইতিমধ্যেই রাজ্যের সবচেয়ে রূপসী কুমারী কন্যা হিসেবে অন্তত একশ জনের আবেদন বাতিল হয়ে গেছে।
আর এখন, আমার সামনে দিয়ে হেঁটে মন্দিরে প্রবেশ করলেন মহান ফারাও। হাঁটু গেড়ে বসা পুরোহিতরা অভ্যর্থনা জানাল তাঁকে। রাজ-উজির এবং তার সভাসদবর্গ অনুসরণ করলো, পেছনে অবিন্যস্ত, পরিমরি জনতার কাফেলা সবাই চাইছে ভালো একটা অবস্থান থেকে নাটক উপভোগ করতে। মন্দিরের ভেতরে স্থান খুবই অপ্রতুল; কেবল মাত্র প্রভাবশালী, মহান লোকজন এবং যারা পুরোহিতদের ঘুষ দিতে সমর্থ হয়েছে তারা জায়গা পেলেন ভেতরে। অন্যদের বাধ্য করা হলো, মন্দিরের প্রবেশদ্বারের বাইরে থেকে দেখতে। বেশিরভাগ লোকজন দারুন হতাশ হলো এই আচরণে, কাব্যনাট্যের ধারাবিবরণী শুনেই সন্তুষ্ট থাকতে হবে তাদের। এমনকি, নাটকের পরিচালক হয়েও আমাকে পর্যন্ত বেগ পেতে হলো জনতার ভীড় ঠেলে ভেতরে যেতে। তাও সম্ভব হলো ট্যানাসের কারণে, আমার দুর্দশা দেখে তার দুজন সৈনিককে পাঠিয়ে পথ করে দেয়ার ব্যবস্থা করলো সে।
কাব্যনাট্য শুরুর আগে অবিরাম শুভেচ্ছাবাণী শুনতে হবে আমাদের, প্রথমে স্থানীয় প্রশাসকদের তরফ থেকে, পরবর্তীতে স্বয়ং রাজ-উজিরের নিকট থেকে। এই শুভেচ্ছা বাণীর হিড়িক কাজে লাগালাম আমি, শেষ মুহূর্তের ঠিকঠাক সেরে নিলাম। তাবুতে তাঁবুতে ঘুরে সব অভিনেতার প্রসাধনী, পোশাক পরখ করে দেখলাম, শেষ মুহূর্তের অস্বস্তি দূর করার চেষ্টা চালালাম সাধ্যমত।
হতভাগা টড ভাবছে, তার অভিনয় ইনটেকে সম্ভষ্ট করতে পারবে কি না। ওকে আশ্বস্ত করে জানালাম, নিশ্চই সে সক্ষম হবে। শেষমেষ লাল শেপেনের পাতা থেকে তৈরি গুঁড়ো খেতে দিলাম, এতে করে সামান্য হলেও লাঘব হবে তার মৃত্যু-যন্ত্রণা।
র্যাসফারে তাবুতে এসে দেখি, প্রাসাদের দুই সঙ্গীকে নিয়ে মদ্যপান করছে সে, ছোটো ব্রোঞ্জের তলোয়ার পাশে রাখা। প্রসাধনীর মাধ্যমে আরো বিকট দেখানোর চেষ্টা করেছি তাকে, যদিও বেশ কষ্টকর কাজ ছিলো সেটা। কালো দাঁতে হেসে যখন আমার উদ্দেশ্যে মদ বাড়িয়ে দিলো সে, বুঝলাম, সফল হওয়া গেছে সেই কাজে।
পেছনটা এখন কেমন ব্যথা করে, ছোট্ট সোনা? এই নাও, পুরুষ মানুষের পানীয় খাও! হয়তো এতে করে আবার বিচি ফেরত পাবে! তার এ ধরনের নির্মম কৌতুকে অভ্যস্ত হয়ে গেছি আমি, পাত্তা দিলাম না। বললাম, আমার মনিব, প্রধান পুরোহিতের নির্দেশ বাতিল করেছেন, কাজেই আগের পরিকল্পনা মতো হবে প্রথম অঙ্ক।
মনিব ইনটেফের সঙ্গে কথা হয়েছে। তলোয়ার হাতে তুলে নেয় র্যাসফার। দ্যাখো, কত ধারালো এটা, ব্যাটা খোঁজা। কী মনে হয়? ওকে রেখে চলে এলাম আমি ।
দ্বিতীয় অঙ্কের আগে মঞ্চে আসবে না ট্যানাস, তবুও পোপাশাক পরে ফেলেছে সে। হেসে কাঁধ চাপড়ে দিলো আমার। কি হলো, বন্ধু, এই তো তোমার সুযোগ। আজকের সন্ধার পরে পুরো মিশরে নাট্যকার হিসেবে নাম ছড়িয়ে পড়বে তোমার।
ঠিক তোমার মতো। সবাই বলছে তোমার কথা। আরো বলতে চাইলাম আমি, কিন্তু বিনয়ের হাসি হেসে উড়িয়ে দেয় ট্যানাস। শেষের বক্তব্য তৈরি করেছ তো, ট্যানাস? জানতে চাই আমি, আমাকে এখন শোনাও ওটা।
ঐতিহ্যগতভাবে, হোরাসের ভূমিকায় অভিনয়কারী ব্যক্তি নাটক শেষে ফারাও-এর কাছে বার্তা দেয়, দেবতাদের পক্ষ থেকে। যদিও আসলে সেগুলো তারই বক্তব্য। অতীতে, যেসব ঘটনা সাধারণ সময়ে মহান ফারাও-এর কানে পৌঁছুতে ব্যর্থ হয়েছে, এই দিন হোরাসের রূপদানকারী অভিনেতার মাধ্যমে সেটাই করা হয়। তবে শেষ বংশধারার ফারাও-এর আমলে নিয়ম পরিবর্তন করা হয়েছে, এখন শেষ বক্তব্য দাঁড়িয়েছে মহান ফারাও-এর স্তব-স্তুতিতে।
গত কয়েক দিন থেকেই ট্যানাসকে তার বক্তব্য আমাকে শোনানোর জন্যে বলছি। প্রতিবারই এতো তুচ্ছ কারণ দেখিয়ে এড়িয়ে গেছে সে, এখন রীতিমত সন্দেহ হতে লাগলো আমার। এ-ই শেষ সুযোগ। বলো, জোর করলাম, কিন্তু ট্যানাস হাসে প্রত্যুত্তরে ।
