একশ বাদক নেতৃত্ব দিলো এই যাত্রায়, লিয়ার এবং হার্প বাজিয়ে চললো তারা; সিবেল এবং ঢাকের শব্দ তাল মেলালো তার সাথে, ছন্দোবদ্ধ আওয়াজে বেজে উঠলো সিস্ট্রাম; ওরিক্স হরিণ এবং বুনো ছাগলের বাঁকানো শিংয়ে ফুঁ দিয়ে একটানা সুর তুলতে লাগলো বাদকেরা। মহান ফারাও এবং দেবতা ওসিরিসের প্রশংসাসূচক বাণী গাইল মিশরের শ্রেষ্ঠ কণ্ঠশিল্পীরা। স্বাভাবিকভাবেই আমি নেতৃত্ব দিলাম তাঁদের। আমাদের পেছনে ট্যানাসের নেতৃত্বে নীল কুমীর বাহিনীর একটা দল সম্মান জানাল মহান ফারাওকে। বর্ম এবং যুদ্ধের সাজে সজ্জিত ট্যানাসকে দেখে কাপন জেগেছিল সেদিন কুমারী হৃদয়ে; দু চারজন হয়তো জ্ঞানও হারিয়েছিল। এমনই প্রিয় হয়ে উঠেছে সে।
নীল কুমীর বাহিনীর পরে এলেন রাজ্যের উজির, তার সভাসদদের সঙ্গে করে। এরপরে, মহৎ ব্যক্তিবর্গ, তাদের স্ত্রী, ছেলেমেয়ে; তারপর বাজপাখি বাহিনীর একটা দল; সবশেষে মহান ফারাও-এর অতিকায় শ্লেজ। উচ্চ রাজ্যের কয়েক হাজার সম্পদশালী এবং প্রভাবশালী লোক জড়ো হয়েছে উৎসবে।
ওসিরিসের মন্দিরের নিকটবর্তী হতে প্রধান পুরোহিত তাঁর সঙ্গী-সাথীদের সাথে নিয়ে ফারাও মামোসকে অভিবাদন জানাতে নেমে এলেন সিঁড়ি কোঠায়। নতুন করে রঙ করা হয়েছে মন্দির, সূর্যাস্তের সোনালি আভায় চকচক করতে লাগলো বাইরের দেওয়ালের তামার কারুকার্যগুলো। লম্বা স্তম্ভের মাথায় উড়ছে রঙ-বেরঙের তোরণ।
সিঁড়ি কোঠার সামনে নিজের স্লেজ থেকে নেমে পড়লেন মহান ফারাও; একশ ধাপের প্রথমটিতে পা রাখলেন। দুইপাশের সিঁড়িতে তার সঙ্গী হলো কণ্ঠশিল্পীর দল। পঞ্চাশতম ধাপে দাঁড়িয়ে আমাদের মহান ফারাওকে পর্যবেক্ষণ করলাম কিছু সময়।
তাঁকে অবশ্য আমি আগে থেকে জানি, তিনি আমার অন্যতম একজন রোগী ছিলেন, কিন্তু আজ মনে হলো আমি ভুলে গেছিলাম, তিনি কত ক্ষুদ্র অন্তত একজন দেবতার পক্ষে তো বটেই। এমনকি আমার কাধ পর্যন্তও লম্বা নন তিনি, অবশ্য উঁচু দ্বৈত মুকুটে অনেকটা ঢাকা পড়ে গেছে তার উচ্চতা। ভাবগাম্ভির্যের সাথে বুকে হাত বেঁধে রেখেছেন, তাতে শোভা পাচ্ছে মিশরের সাম্রাজ্যের প্রতীক-চিহ্ন। আগের মতোই এবারেও লক্ষ করলাম, তার হাতে কোনো লোম নেই; মসৃণ, মহিলাদের মতো কোমল ও দুটো। পা দুটোও বেশ ছোটো এবং পরিচ্ছন্ন। হাত এবং পায়ের আঙুলে আংটি পরেন মহান ফারাও, কবজিতে রয়েছে বাজুবন্ধ। বুকের বিশালাকায় বর্মে শোভা পাচ্ছে সত্যের পালক হাতে দেবতা তথ–এর বিভিন্ন রঙিন চিত্র; লাল সোনায় খচিত। প্রায় পাঁচশ বছরেরও পুরোনো ওটা, আমাদের মহান ফারাও-এর আগেও আরো সত্তরজন পরেছেন।
দ্বৈত মুকুটের নিচে তার মুখাবয়ব নিহতের মতো সাদা দেখায় প্রসাধনীর কারণে। চোখে ঘন কালো কাজল, ওষ্ঠে লাল রঙ করা। প্রসাধন-চর্চিত তার মুখ চিন্তাক্লিষ্ট, ঠোঁট দুটো বেঁকে আছে বিরক্তিতে। চোখে আত্মবিশ্বাসের ছিটে-ফোটও নেই ।
আদতে, আমাদের এই মহান জন্মভূমির ভিত্তিমূল ধ্বসে গেছে! সমগ্র রাজ্য আজ বিচ্ছিন্ন পাপাচারে টালমাটাল। আজ, এমনকি একজন দেবতার মুখও চিন্তাক্লিষ্ট। একটা সময়ে সুদূর সাগর পর্যন্ত বিস্তৃত ছিলো তার সাম্রাজ্য, ডেল্টার সাত মাথা পেরিয়ে, দক্ষিণে সেই আসূন আর প্রথম জলপ্রপাত পর্যন্ত তিনি ছিলেন জগতের শ্রেষ্ঠতম সম্রাট। কিন্তু তিনি বা তাঁর উত্তরাধিকারীরা সব নষ্ট করেছেন, আজ তারই সংকুচিত সীমারেখায় মাথা উঁচায় শত্রুরা; হায়েনা, শেয়াল আর শকুনের মতো আক্রমণ করে মিশরের শবদেহে।
দক্ষিণে আছে আফ্রিকার দস্যুর দল, উত্তরে, সাগরের ধার ঘেঁষে বাস করে জলদস্যুরা; আর নীল নদের নিচের প্রান্ত জুড়ে রাজত্ব করছে ভুয়া ফারাও। পশ্চিমে লিবিয়ার শয়তান বেদুঈনের ঘাটি, পুবে প্রতিদিন মাথাচাড়া দেয় নতুন দস্যু দল; পরাজিত, হতোদ্যম জাতির বুকে কাঁপন জাগায়। আসিরিয়রা এবং মেদেসীয়রা, ক্যাসাইটস্ এবং হারিয়রা, এবং হিটটিরা–এদের সংখ্যার কোনো শেষ নেই।
যদি বয়সের ভারে ন্যুজ আর দুর্বলই হয়ে পড়বে, তবে কি সুবিধা রইল এই প্রাচীন সভ্যতার? লোভ, ধ্বংস আর উন্নাসিকতায় মত্ত বর্বরদের কেমন করে ঠেকাবো আমরা? আমি নিশ্চিত, বর্তমান ফারাও বা তার সাম্প্রতিক পূর্বসুরিদের কারও ক্ষমতা নেই মিশরকে সেই আগের স্বর্ণযুগে ফিরিয়ে নেওয়ার। উনি এমনকি একটি পুত্রসন্তানও জন্ম দিতে সক্ষম হন নি।
রাজ্য হারানোর শঙ্কার বদলে ছেলে বংশধর জন্ম না দিতে পারার দুঃখ তাকে ভারাক্রান্ত করে। এই পর্যন্ত বিশজন পত্নী নিয়েছেন তিনি। কন্যাসন্তান হয়েছে তাদের, পুত্র নয়। এতো দ্রুত তবুও নিজের দোষের কথা মেনে নেবেন না আমাদের ফারাও। উচ্চ সাম্রাজ্যের সমস্ত চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়েছেন, গিয়েছেন সব মন্দির আর গুরুত্বপূর্ণ শ্রাইন-এ।
এ সবই আমার জানা, কেননা তাঁর ডেকে পাঠানো চিকিৎসকদের একজন ছিলাম আমি। স্বীকার করি, সেই সময়ে একজন দেবতাকে ব্যবস্থাপত্র দিয়েছি বলে খানিকটা আপুত ছিলাম, ভেবে অবাক হয়েছিলাম একজন দেবতার কেন প্রয়োজন পড়বে আমার মতো সামান্য মানবকে। যাই হোক, ষাঁড়ের অণ্ডকোষ খেতে উপদেশ দিয়েছি তাকে, মধুর সঙ্গে মিশিয়ে; পরামর্শ দিয়েছি মিশরের শ্রেষ্ঠতম রূপসী কুমারী মেয়েকে তার রজঃচক্রের প্রথম বছরেই ফুল-শয্যায় নিতে।
