তোমার জন্যে একটা উপদেশ, আমার মুখের সামনে এসে ফিসফিস করে বললেন ইনটেফ, আজ রাতে আবারো একটা স্বপ্ন দেখবে তুমি। ঠিক যে দেবতা শেষবার দেখা দিয়েছিল, সে আবার এসে অন্য কথা বলবে; যাতে করে আমার আয়োজনে কোনো বাধা না থাকে। তা না ঘটলে, র্যাসফারের জন্যে একটা কাজ বরাদ্দ করতে হবে আমাকে এটা তোমার কাছে আমার প্রতিজ্ঞা। ঘুরে দাঁড়িয়ে ছুটে চলে গেলেন ইনটেফ, আনন্দ আর হতাশার মিশ্র অনুভূতি খেলে গেলে আমার মনে।
যা হোক, ইনটেফ চলে যেতে আমাদের অনুশীলন দারুন হলো। ট্যানাসের সাথে সাক্ষাতের পর আনন্দে ঝলমল করছিল লসট্রিস, ওর রূপ যেনো স্বর্গীয়, আর শৌর্য বীর্যে উদ্ধত ট্যানাস যেনো সত্যিকারের হোরাস।
আমার কাব্যনাট্যে ওসিরিসের প্রবেশ নিয়ে দারুন শঙ্কায় আছি, এখন তো জানা হয়ে গেছে কী ঘটতে যাচ্ছে হতভাগ্য অভিনেতার ভাগ্যে। সুদর্শন, মধ্য-বয়স্ক একজন জামিন-প্রাপ্ত আসামী, টড অভিনয় করছে দেবতার ভূমিকায়।
রাজকীয় বিচারকার্য শেষে মৃত্যুর দিন গুনছিল সে, আমার মনিব কাব্যনাট্যে অভিনয়ের জন্যে জেল থেকে মুক্তি দিয়েছেন তাকে। সন্তোষজনকভাবে অভিনয়ে সফল হলে তার শাস্তি মওকুফ করা হবে বলে ঘোষণা করেছেন ইনটেফ। হতভাগা টড বিশ্বাস করেছে সেই কথা, দারুন মনোযোগের সাথে অনুশীলন করেছে সে; মনে আশা-ভালো কাজ দেখালে ক্ষমা পাবে। সে জানে না, এরই মধ্যে গোপনে তার মৃত্যু পরোয়ানায় সই করে দিয়েছেন আমার মনিব, স্ক্রোলটা তুলে দিয়েছেন ব্যাসফারের হাতে। রাসফার শুধু প্রধান জল্লাদই নয়, আমার কাব্যনাট্যে সেথ-এর ভূমিকায়ও সে-ই অভিনয় করছে। মহান ফারাও-এর সম্মুখে একই সঙ্গে দুইটি কাজ সমাধা করার অভিপ্রায় আমার মনিবের । সেথ্-এর চরিত্রের জন্যে র্যাসফার অত্যন্ত যথাযথ, কিন্তু এখন, এই মুহূর্তে, টড-এর সঙ্গে তাকে অনুশীলন করতে দেখে আতঙ্কে শিউড়ে উঠলাম কী পৃথকই না হবে আসল দিনের অভিনয় আজকের অনুশীলন থেকে।
অনুশীলন শেষ হতে আমার মিসট্রেসকে হারেমে ফিরিয়ে দিয়ে এলাম। কিছুতেই আমাকে ছাড়বে না সে, আজকের দিনের অসাধারণ ঘটনাবলিতে ট্যানাসের ভূমিকার কথা বারবার শুনতে হলো।
দেখেছ, টাইটা, ও কেমন করে হোরাসকে ডাকলো, আর কেমন করে দেবতা তার সাহায্য করলো, দেখেছ? আমাদের কোনো ক্ষতি হোরাস হতে দেবেন না, তাই টাইটা?
বিচ্ছেদ, আত্মহত্যা–এগুলোর কথা ভুলে গেছে আমার মিসট্রেস; ওর মন জুড়ে এখন কেবল কল্পলোকের রঙিন দৃশ্যাবলি। তরুণ প্রেমের হাওয়া কত দ্রুতই না। পাল্টায়।
আজ ট্যানাস যা দেখাল, যেমন করে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাল রাজকীয় জলযানকে, নিশ্চই মহান ফারাও-এর আনুকূল্য পেয়ে গেছে সে; তুমি কি বলো, টাইটা? দেবতা আর ফারাও-এর কৃপাদৃষ্টি পেলে আমার বাবা কিছুতেই তাকে নির্বাসনে পাঠাতে পারবে না, পারবে, বলো টাইটা?
ওর মনের সমস্ত আনন্দের কথায় আমাকে সমর্থন জানাতেই হলো। হারেম ছাড়ার আগে কম করে হলেও এক ডজন সংখ্যক বার বিভিন্নভাবে ওর ভালোবাসার বার্তা ট্যানাসের কাছে ব্যক্তিগতভাবে পৌঁছানোর জন্যে প্রতিজ্ঞা করতে হলো।
শেষমেষ, ক্লান্ত হয়ে যখন পৌঁছুলাম আমার ব্যক্তিগত প্রকোষ্ঠে, সেখানেও স্বস্তি নেই। আনন্দে উন্মুখ হয়ে আছে প্রায় সব দাস বালক, আমার মিসট্রেসের মতোই অপেক্ষায় বসে ছিলো আমার জন্যে। দিনের ঘটনাবলির উপর আমার মতামত তাদেরও শোনা চাই, ট্যানাসের বীরত্বের ফলাফল কী হতে পারে–এইসব। নদীর উপরে, চাতালে বসে আমার পোষ্যদের খাবার দেয়ার ফাঁকে শুনলাম ওদের সবার কথা ।
বড় ভাই, এটা কি সত্যি, ট্যানাস দেবতাকে ডেকেছে আর হোরাস সাথে সাথে তার সাহায্যে এগিয়ে এসেছিল? আপনি এটা দেখেছেন? অনেকে বলে, দেবতা নাকি তার শকুনের ছদ্মবেশে এসেছিলেন, ডানা ছড়িয়ে রেখে ছায়া দিয়েছেন ট্যানাসকে? এগুলো সত্যি?
এটা কি সত্যি, জ্ঞানের দেবতা, তথ, ট্যানাসের জন্যে ভবিষ্যতবাণী করেছেন, সে নাকি মিশরের ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ যোদ্ধা হবে, আর একদিন ফারাও তাঁকে সবচেয়ে বেশি সম্মান দেবেন? আজ যখন এই কথাগুলো মনে করি, অবাক লাগে, কেমন করে অদ্ভুত সেই সত্য লুকিয়ে ছিলো ওদের বাক্যে। কিন্তু তখন অবশ্য বাচ্চাদের কথার মতো অবজ্ঞায় উড়িয়ে দিয়েছিলাম ওদের কথাগুলো।
ঘুমোনোর আগে ভাবলাম, লুক্সর এবং কারনাকের সমস্ত জনতার হৃদয় জয় করে নিয়েছে ট্যানাস; কিন্তু এই মর্যাদা ওর জন্যে বোঝাস্বরূপ। যশ এবং খ্যাতি উচ্চপর্যায়ে হিংসার আগুন জ্বালাবে, আর কে না জানে, জনতার পূজা অর্চনা ক্ষণস্থায়ী। ঠিক যেমন করে মর্যাদার আসনে কাউকে সমাসীন করে তারা, ততোধিক আনন্দে তাকে ছুঁড়ে ফেলে।
বরঞ্চ, পর্দার অন্তরালে থেকে যাওয়া অনেক বেশি নিরাপদ, চিরকাল যেখানে থাকবার চেষ্টা করে এসেছি আমি।
*
উৎসবের ষষ্ঠ দিনে, কারনাক এবং ক্সরের মাঝামাঝিতে অবস্থিত নিজের রাজকীয় ভিলা ছেড়ে পাথুরে সিংহের মূর্তি-সজ্জিত চওড়া আভেন্যু ধরে নীল নদের তীরে, ওসিরিসের মন্দিরে এলেন মহান ফারাও, রাজকীয় ভাবগাম্ভির্য্য তার অবয়বে।
যে বিশাল স্লেজে চড়ে গেলেন তিনি, সেটা এতোটাই উঁচু, আভেন্যুর দুই ধারে সমবেত জনতা ঘার বাঁকা করে তাকাল স্বর্ণ-মণ্ডিত তাঁর সিংহাসনের দিকে। মাথার শিংয়ে ফুল সাজানো, বিরাট-পেশিবহুল বিশটি ষাড় টেনে নিয়ে চললো স্লেজটা। পায়ে হাঁটা পাথুরে পথে দাগ ফেলে দিলো তার বাহন।
