পুরোটা সময় সতর্ক ছিলাম আমি, জানতাম ওদের দুজনকে একত্রে তাঁবুতে কেউ দেখে ফেলার পরিণতি কী হতে পারে; কিন্তু এরপরেও আলাদা করতে মন সায় দিচ্ছিল না। যদিও আমার পিঠে এখনও আছে র্যাসফারের চাবুকের দগদগে ঘা, যদিও আমার মনের গহিন কোণে–যেখানে সমস্ত অযাচিত অনুভূতিগুলো লুকিয়ে রাখি আমি ঈর্ষার আগুনে পুড়ছিলাম, তবুও যতোটা উচিত ছিলো, তার চেয়ে বেশি সময় ওদের একা থাকতে দিলাম ।
আমার মনিব, ইনটেফের আগমন টের পাই নি। খুবই নরম চামড়ার স্যান্ডল পরেন তিনি, ভূতের মতোই নিঃশব্দ তাঁর চলাচল। প্রাসাদের ভেতরে বেফাঁস কথা বলে বহু সভাসদ এবং দাস আমার মনিবের ফাঁসি-কাষ্ঠ বা রাসফারের চাবুকের শিকার হয়েছে। কিন্তু বিগত বছরগুলোতে ছায়ার ভেতর থেকে আমার মনিবের আগমনের আগেই ইন্দ্রিয়বলে সেটা অনুভব করার ক্ষমতা অর্জন করেছি আমি। সাধারণত এই অনুভূতি আমার সাথে প্রতারণা করে না, কিন্তু সেই সন্ধায় আমাকে চমকে দিলেন ইনটে। ঘুরে দাঁড়াতেই প্রায় টক্কর লেগে গেলো তাঁর সাথে; মন্দিরের উঁচু খিলানের মতো লম্বা, পাতলা বিষাক্ত কোব্রার মতো ফনা ভোলা ।
হুজুর, ইনটেফ! জোরে চেঁচিয়ে উঠলাম। আমাদের অনুশীলন দেখতে এসেছেন, কী সম্মানের কথা! আপনার কোনো মতামত, হুজুর–নিজের ভেতরের দ্বিধা আড়াল করে প্রেমিক যুগলকে সতর্ক করতে চাইলাম।
উভয় ক্ষেত্রেই বেশ সফল হলাম, বলা যায় । পেছনের তাঁবুতে হঠাৎ খসখস শব্দ করে বিচ্ছিন্ন হলো ওরা, এরপরেই তাঁবুর পেছনের কাপড় তুলে ট্যানাসের প্রস্থানের শব্দ পেলাম।
অন্য কোনো সময় হলে এতো সহজে ফাঁকি দেওয়া যেত না আমার মনিব, ইনটেফকে। মন্দিরের দেয়ালে লেখা হায়ারোগ্লিফিক্স যেমন সহজে পড়ি আমি, কিংবা আমার প্যাপিরাস স্ক্রোলের বর্ণমালা; ঠিক ততটা সহজে আমার মুখের অপরাধবোধ পড়ে ফেলতেন তিনি। কিন্তু নিজের ক্রোধ আর আক্রোশে অন্ধ হয়ে ছিলেন ইনটেফ । রাগে উন্মত্ত হয়ে চিৎকার করার মানুষ নন তিনি। নম্র-স্বর আর মসৃণ হাসি তাঁর সবচেয়ে বিষাক্ত অবস্থার পরিচয় দেয়।
প্রিয় টাইটা, প্রায় ফিসফিস স্বরে বললেন, আমি শুনেছি, আমার হুকুম সত্ত্বেও নাটকের প্রথম অঙ্কে পরিবর্তন করেছ তুমি। ভাবতে পারি না, কেমন করে এতটা সাহসী হলে। এই গরমে এতদূর পথ এসেছি শুধু সত্যিটা জানতে।
জানি, ভান করে বা উপেক্ষা করে কোনো লাভ নেই, তাই যন্ত্রণাক্লিষ্ট চেহারায় মাথা কেঁকালাম তার সম্মুখে। হুজুর, পরিবর্তন আমি করি নি, ওটা করেছেন ওসিরিসের মন্দিরের প্রধান পুরোহিত ।
অধৈর্য্যের মতো বাধা দিলেন ইনটেফ, হ্যাঁ, অবশ্যই সে করেছে, কিন্তু কেবলমাত্র তোমার প্ররোচনায় । তোমার কী ধারণা তোমাকে বা ওই বুড়োভামকে আমি চিনিনা? কোনোদিনও ওর মাথায় একক চিন্তা ছিলো না তোমার মতো।
হুজুর! বলে উঠলাম আমি ।
কোন চতুর চাল এটা তোমার, টাইটা? ওই যে, মাঝে-মধ্যে দেবতারা তোমার কাছে যে দৈব বাণী পাঠায় সেরকম কিছু? জানতে চাইলেন ইনটেফ। তার স্বর পাথরের মেঝের উপর দিয়ে চলার সময় মন্দিরের পবিত্র কোব্রার সৃষ্ট শব্দের মতো নরম।
হুজুর! এহেন অভিযোগে বজ্রাহত হওয়ার মতো ভঙি করলাম, যদিও আদতে আমিই মন্দিরের বুড়ো পুরোহিতকে বর্ণনা করেছি, কেমন করে কালো কাকের ছদ্মবেশে ওসিরিস আমার স্বপ্নে এসেছিল; মন্দিরে রক্তপাতে তাঁর আপত্তি জানিয়েছিল।
এর আগ পর্যন্ত ফারাও-এর মনোরঞ্জনের জন্যে আমার মনিবের করা রক্তপাতের আয়োজনে কোনো আপত্তি করেন নি পুরোহিত। তাকে বাধা দেয়ার সকল প্রচেষ্টা ব্যর্থ হতেই কেবল স্বপ্নের সাহায্য নিয়েছি আমি। নাটকের প্রথম অঙ্কে আমার মনিবের আয়োজন করা ব্যবস্থা ঘৃণ্য মনে হয়েছে আমার কাছে। আমার জানা আছে, পুবের কোনো কোনো দেশে দেব-দেবীদের প্রার্থনায় বলি দেওয়া হয়। শুনেছি, সেই ক্যাসাইটসে, ইউফ্রেতিস এবং টাইগ্রিস নদীর ওপারে নব জাতকদের অগ্নি-কুণ্ডে নিক্ষেপ করা হয়। সুদূর থেকে আসা ক্যারাভান মালিকদের কাছে জেনেছি ফসল ভালো হওয়ার অভিপ্রায়ে কুমারী মেয়ে বলি দেওয়া হয়, এমনকি যুদ্ধবন্দীদের জবাই করা হয় মৃতীর সম্মুখে।
যা হোক, আমরা মিশরীয়রা সভ্য মানুষ, জ্ঞানী এবং সদয় দেব-দেবীর পূজো করি, রক্ত-পিপাসু দানবের নয়। আমার মনিবকে এটাই বোঝাবার বহু চেষ্টা করেছি। এর আগে কেবল মাত্র একজন ফারাও নরহত্যা করেছিলেন; সেথ্-এর মন্দিরে সাত দস্যু রাজকুমারের গলা কেটেছিলেন রাজা মেনোটেপ, শবদেহগুলো মমি করে পাঠিয়েছিলেন বিভিন্ন রাজ্যে সতর্ক করে দেয়ার জন্যে। বিতৃষ্ণার সাথে সেই কথা স্মরণ করা হয় আজও। রক্তপিপাসু রাজা বলে দুর্নাম আছে মেনোটেপ-এর ।
এটা নরবলি নয়, আমার মনিব বলেছিলেন। কেবল একটা যৌক্তিক শাস্তি, মহৎ আয়োজনে করা হবে এই যা। তুমি নিশ্চই এটা বলতে চাইছ না, প্রিয় টাইটা, যে মৃত্যুদণ্ড আমাদের বিচারকাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে না? টড একটা চোর। রাজকীয় কফিন থেকে চুরি করেছে সে, মরাই উচিত তার। অন্যদের জন্যে ভালো একটা উদাহরণ হবে।
বেশ যুক্তিপূর্ণ কথা, কিন্তু আমি জানি বিচারে নয়, তাঁর উৎসাহ নিজের ধন-সম্পত্তি আগলে রেখে ফারাও-কে মুগ্ধ করার দিকে, নাটক দারুন ভালবাসেন তিনি। তো, স্বপ্ন দেখা ছাড়া আর কোনো উপায় ছিলো না আমার। আর এখন, হাসির ভঙিতে ঠোঁট বেঁকে গেছে ইনটেফের, তার সুগঠিত ঝকঝকে সাদা দাঁত আমার রক্ত যেনো ঠাণ্ডা করে দেয়। ঘারের পেছনের চুলগুলো দাঁড়িয়ে গেলো।
