টানো! পোর্টের দিকের দাড়ীরা প্রাণপণে টানতে লাগল, পিঠ বাঁকা হয়ে গেছে তাদের।
পেছনে টানো! স্টারবোর্ড দিকের দাঁড়ীদের উদ্দেশ্যে মুষ্টিবদ্ধ হাত নাচায় ট্যানাস, দাঁড়ের চোখা মাথা দিয়ে টানতে থাকে তারা। রেইলের কাছে ছুটে গিয়ে হোরাসের প্রশ্বাসের নাবিকদের যুগপৎ নির্দেশ দেয় সে। এখনও তীরের পাথুরে ঘাটের দিকে চলছে রাজকীয় জলযান, সামান্য একটু ফাঁকা জল আছে জাহাজ এবং তীরের মাঝে।
কিন্তু, এবারে, ধীরে-ধীরে সাড়া দেয় ওটা। গ্যালির টানে ধীরে স্রোতের দিকে ফিরতে থাকে রঙ-চঙ গলুই। আবারো হর্ষধ্বনি কেটে গিয়ে আশঙ্কার আওয়াজ বেরোয় আমাদের মুখ থেকে, শেষপর্যন্ত কী পাশাপাশি তীরে আছড়ে পরে চুরমার হবে রাজকীয় জাহাজ? তেমনটি হলে ট্যানাসের ভাগ্যে কী ঘটবে, বলার অপেক্ষা রাখে না। বুড়ো নেমবেটের কাছ থেকে কর্তৃত্ব ছিনিয়ে নিয়েছে সে, তার যে কোনো ভুলের মাশুল এখন ট্যানাসকেই দিতে হবে। যখন সংঘর্ষের প্রাবল্যে সিংহাসন থেকে ছিটকে পড়বেন ফারাও, তাঁর মর্যাদার প্রতীক দ্বৈত-মুকুট লুটাবে পাটাতনে; আর রাজকীয় জলযান পানিতে তলিয়ে গেলে যখন সমস্ত মিশরের সম্মুখে ভেজা কুকুরছানার মতো পানি থেকে উদ্ধার করা হবে তাকে; তখন নৌবাহিনী প্রধান নেমবেট এবং আমার মনিব, ইনটেফ দুজনের মন্ত্রণায় ফারাও-এর আক্রোশ এই টগবগে যোদ্ধার উপরে পড়তে বাধ্য।
অসহায় অবস্থায় তীরে দাঁড়িয়ে বন্ধুর জন্যে কাঁপছিলাম আমি, প্রার্থনা করে চলেছি একটা অসম্ভবের। দ্রুত ধাবমান পাথুরে ঘাটের মতো কাছাকাছি এখন জাহাজ, ট্যানাসের স্বর পরিষ্কার শুনতে পেলাম আমি। মহান হোরাস, সাহায্য কর! চেঁচিয়ে বললো সে।
মানবের ঘটনাচক্রে কখনও কখনও হস্তক্ষেপ করেন দেবতারা, এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই আমার মনে। ট্যানাস হলো হোরাসের উপাসক, আর হোরাস বায়ুর দেবতা।
দক্ষিণে, সাহারা মরুর নির্জন বুক হতে তিন দিন, তিন রাত ধরে বয়ে চলেছে বাতাস। তীব্রতা নিয়ে ছুটেছে তা এই কদিন, কিন্তু এখন ধরে এলো সেটা। কমে গেলো না, একেবারে বন্ধ হয়ে গেলো। নদীর বুকে নৃত্যরত ছোটো ছোটো ঢেউগুলো সমান হয়ে আসে, তীরের পাম গাছগুলোর পাতা থেমে যায়। যেনো হঠাৎ বরফে পরিণত হয়েছে।
বাতাসের ধাবা থেকে মুক্তি পেতেই সোজা হয়ে, হোরাসের প্রশ্বাসের টানে সমর্থন জানায় রাজকীয় জাহাজ। বিশালাকায় গলুই স্রোতের টানে পরে পার্থরে ঘাটের সমান্তরালে চলে আসে; পাশটা আলতো ঘষা খায় সজ্জিত পাথরে, ঠিক সেই মুহূর্তে নীলের জল সামনের শান্ত পানিতে ঠেলে দেয় তাকে।
শেষ একটা নির্দেশ দেয় ট্যানাস, জাহাজ পেছনের দিকে যাওয়ার আগেই নোঙরের দড়ি দ্রুত বেঁধে ফেলা হলো পাথুরে স্তম্ভের সাথে। হালকা পালকের হাঁসের মতোই পানিতে ভাসতে থাকে জাহাজ; রাজকীয় জলযান নিরাপদে ভীড়ে তার ঘাটে, সিংহাসনে আসীন ফারাও কিংবা তাঁর মস্তকে শোভাবর্ধনকারী দীর্ঘ মুকুট কোনোটিই একচুল স্থানান্তরিত হয় না।
আমরা, যারা তীরে দাঁড়িয়ে অবলোকন করছিলাম, প্রশংসার গর্জনে ফেটে পড়ি; ফারাও নয়, আমাদের ঠোঁটে ছিলো ট্যানাসের নাম। বিনয়ের সাথে, কিন্তু যথেষ্ট বিচক্ষণতার পরিচয় দিয়ে আমাদের প্রশংসা ধ্বনি গ্রহণ করার কোনোরকম চেষ্টা চালাল
ট্যানাস। রাজাকে অভ্যর্থনা জানাতে সমাগত জনতার মনোযোগ এমন করে কেড়ে নেওয়াটা মারাত্মক হতে পারে, আজকে যতটুকু রাজকীয় আনুকূল্য সে অর্জন করেছে, তাতে করে সেটা তিরোহিত হওয়ার আশঙ্কা ছিলো। নিজের রাজকীয় মর্যাদার। ভাগাভাগিতে ফারাও খুবই ঈর্ষান্বিত হতে পারেন। বদলে, নিরবে হোরাসের প্রশ্বাসকে কাছাকাছি আনার সংকেত দিলো ট্যানাস। জাহাজের বিশাল কাঠামোর আড়ালে হোরাসের প্রশ্বাস হারিয়ে যেতে ওটার পাটাতনে লাফিয়ে নেমে যায় সে, তারই জন্যে প্রস্তুত মঞ্চ দান করে যায় মহান ফারাওকে।
যা হোক, নেমবেটের চেহারায় ক্রোধ এবং অসন্তুষ্টির ছায়া ঠিকই দেখতে পেয়েছি আমি। মিশরের সাহসী সিংহ, প্রাজ্ঞ নৌ-প্রধান যখন মহান ফারাও-এর পিছুপিছু তীরে নেমে এলেন; আমি নিশ্চয় করে বুঝতে পারলাম আরো একজন প্রভাবশালী শত্রু তৈরি করেছে ট্যানাস।
২. প্রতিজ্ঞা পালন
সেই সন্ধাতেই লসট্রিসকে করা আমার প্রতিজ্ঞা পালন করতে সক্ষম হলাম, আমার গীতিনাট্যের কুশীলবদের একত্র করে অনুশীলনের সময়। কাজ শুরু করার আগে কম করে হলেও এক ঘন্টা সময় একা পেয়েছিল প্রেমিক যুগল।
ওসিরিসের মন্দির প্রাঙ্গনে নির্ধারণ করা হয়েছে নাটকের মঞ্চ, প্রধান সকল চরিত্রের পোশাক পরিবর্তনের জন্যে বেশ কিছু তাবু ফেলা হয়েছে ওখানে, আমার নির্দেশে। ইচ্ছাকৃতভাবেই লসট্রিসের তাঁবুটা বাকি সবার চেয়ে একটু তফাতে তৈরি করার নির্দেশ দিয়েছিলাম আমি, মন্দিরের ছাদের অবলম্বন, ভারী একটা থামের আড়ালে। তাঁবুর প্রবেশমুখে পাহারায় রইলাম, অপরদিকের কাপড় সরিয়ে ভেতরে ঢুকল ট্যানাস।
পরস্পরকে দেখার মুহূর্তে ওদের আনন্দধ্বনি কিংবা ফিসফিসানি, চাপা হাসি বা ভালোবাসাবাসির মুহূর্তের কামনা-তপ্ত ছোট্ট গোঙানির আওয়াজে কান পাততে চাই নি আমি, কিন্তু শুনতে হলো। যদিও বর্তমান প্রেক্ষাপটে কোনো কিছুতেই বাধা দিতাম না, কিন্তু আমি নিশ্চিত, ভালোবাসার চূড়ান্ত পরিণতি, শারীরিক মিলনে যায় নি ওরা। এরও অনেক পরে, লসট্রিস এবং ট্যানাস দুই জনেই পৃথকভাবে আমার কাছে স্বীকার করেছিল এটা। নিজের বিয়ের দিনে কুমারীই ছিলো আমার মিসট্রেস। যদি আমাদের কারো জানা থাকতো, কত কাছাকাছি রয়েছে সে দিনটা; কী ভিন্নভাবেই আচরণ করতাম আমরা তখন।
