উন্মত্তের মতো দাঁড় টানতে লাগলো তারা, হালের চারপাশের পানি যেনো সাদা ফেনা; কিন্তু ছন্দোবদ্ধভাবে না টেনে বিচ্ছিন্নভাবে কাজটা করা হলো। ওদের গালি গালাজ আর অভিশাপের সাথে মিলেমিশে গেছে স্টার্নে দাঁড়ানো চালকের নিষ্ফলা নির্দেশ। ওদিকে, পুপ-ডেকে বসে অক্ষম আক্রোশে সাদা দাঁড়িতে হাত বোলাচ্ছেন রাজকীয় নৌবাহিনীর প্রধান নেমবেট।
এই জগাখিচুরীর উপরে বসে আমাদের মহান ফারাও, নিশ্চল, ঠিক যেনো মন্দিরের মূর্তিগুলোর মতোই; বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন। হায়, এ-ই হলো আমাদের মিশর।
এরপরে বন্ধ হয়ে জাহাজের ঘূর্ণন, বাতাস এবং স্রোতের বিপরীতমুখি টানে পরে সোজা তীরের দিকে ছুটতে লাগলো ওটা। চালক বা নাবিকেরা কেউই কিছু করতে পারছে না, না পারছে পুরো ঘুরে গিয়ে জাহাজটাকে স্রোতের মধ্যে ফেলতে, না পারছে গলুই উঁচু করতে যাতে করে প্রাসাদের পাথুরে ঘাটে তার মুখোমুখি সংঘর্ষ না ঘটে।
আসন্ন দুর্ঘটনার কথা টের পেয়ে গেছে নীল নদের তীরে দাঁড়ানো জনতা, হর্ষ ধ্বনি থেমে গেছে, অদ্ভুত নিরবতা বিরাজ করছে এই মুহূর্তে । মাঝি-মাল্লাদের চিৎকার, চালকের কঠোর নির্দেশ সবকিছু পরিষ্কার ভেসে এলো ফারাও-এর জল্যান থেকে।
এরপরে, হঠাৎই, জনতার চোখ সরে গেলো নদীর ভাটিতে; বাহিনীর কাছ থেকে সরে উজানে যেনো উড়ে আসছে হোরাসের প্রশ্বাস। অদ্ভুত ছন্দের সাথে উঠা-নামা করছে তার দাঁড়গুলো, পানিতে পড়ে, কেটে আবার একসাথে ভেসে উঠছে উপরে। তড়িৎগতিতে রাজকীয় জাহাজের গলুইয়ের সামনে দিয়ে বেরিয়ে গেলো হোরাসের প্রশ্বাস, জনতার দম আটকে যাওয়ার শব্দ পরিষ্কার ভেসে এলো প্যাপিরাসের ঝোঁপের উপর দিয়ে। সংঘর্ষ যেনো অবশ্যম্ভাবী, কিন্তু শেষ মুহূর্তে মাথার উপরে মুঠি-বদ্ধ হাত তুলে সংকেত দিলো ট্যানাস। সঙ্গে সঙ্গে পেছন দিকে দাঁড় টানতে লাগলো দাঁড়ীরা, চালক স্থির ধরে রেখেছে চাকা।
থেমে পরে, রাজকীয় জলযানের আওতার বাইরে রইল হোরাসের প্রশ্বাস। কুমারীর চুমোর মতো আলতো করে পরস্পরকে স্পর্শ করলো দুটো বাহন, এক মুহূর্তের জন্যে হোরাসের প্রশ্বাসের স্টার্ন টাওয়ার এক সমানে থাকল রাজকীয় জাহাজের প্রধান পাটাতনের।
সেই মুহূর্তেই, স্টার্ন টাওয়ারের কাঠামোতে নিজেকে শক্ত করে আঁটকালো ট্যানাস। ঢাল, স্যান্ডল, অস্ত্রশস্ত্র একপাশে সরিয়ে রেখেছে সে। কোমরের চারপাশে একটা দড়ি বাধা। দুই জলযানের মধ্যবর্তী দূরত্ব একলাফে অতিক্রম করলো, দড়ি উড়ছে পেছনে।
যেন ঘোর ভেঙে নড়েচড়ে বসে জনতা। তাদের মধ্যে একজনেরও যদি ট্যানাসের পরিচয় অজানা থাকে, তো আজ দিন শেষের আগে জানা হয়ে যাবে–এতে কোনো সন্দেহ নেই। অবশ্যই, নিম্ন রাজ্যের বিরুদ্ধে জল-যুদ্ধে ট্যানাসের বীরত্বের কথা ইতিমধ্যেই ছড়িয়ে পরেছে। কিন্তু কেবলমাত্র তার নিজস্ব বাহিনী দেখেছে সেটা। নিচের চোখে দেখা আর শোনাকথার ওজন তো আর এক নয়!
আর এখন, ফারাও-এর দৃষ্টির সামনে, রাজকীয় নৌবহর এবং কারনাকের সমস্ত জনতাকে প্রত্যক্ষদর্শী রেখে ক্ষিপ্র চিতার মতোই এক জাহাজের পাটাতন থেকে অপরটিতে ঝাঁপিয়ে পড়ল ট্যানাস।
ট্যানাস! আমি নিশ্চিত, প্রথম চিৎকারটা দিয়েছিল আমার মিসট্রেস, লসট্রিসই। কিন্তু তারপরেই আমি ডেকে উঠলাম।
ট্যানাস! হাহাকার করে উঠলাম আমি, এরপরে প্রবল চিৎকারে আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে দেয় জনতা। ট্যানাস! ট্যানাস! ট্যানাস! যেনো কোনো নতুন দেবতার স্তুতি করছে তারা।
রাজকীয় জলযানের পাটাতনে পড়তেই ঘুরে দাঁড়িয়ে গলুইয়ের উদ্দেশ্যে ছুটল ট্যানাস, দুই হাতে শক্ত করে ধরে রেখেছে দড়ির প্রান্ত । ওটার অপর প্রান্তে জাহাজ নোঙরের শক্ত, মোটা দড়ি ধরে রেখেছিল ট্যানাসের নাবিকেরা, এবারে ওটা হস্তান্তর করলো তারা ট্যানাসের কাছে। কাধ এবং পিঠের পেশি ঘামে চকচক করছে, ওটাকে টেনে নিয়ে চললো সে।
এতক্ষণে, রাজকীয় জাহাজের নাবিকেরা বুঝতে পেরেছে কী ঘটতে চলেছে, ট্যানাসের সাহায্যে এগিয়ে আসে তারা। তার নির্দেশে গলুইয়ে তিনবার পেঁচিয়ে বাঁধল তারা মোটা দড়িটা। বাধা শেষ হতেই নিজের গ্যালিকে সংকেত দেয় ট্যানাস।
স্রোতে ভেসে পরে হোরাসের প্রশ্বাস, দ্রুত গতিতে চলতে শুরু করে। দড়ি টানটান হয়ে যেতেই বিশালাকায় রাজকীয় জলযানের টানে থেমে, পানিতে চেপে বসে তার খোল। একটা ভয়ঙ্কর মুহূর্তের জন্যে আমার মনে হলো এই বুঝি তলিয়ে গেলো ওটা; কিন্তু আগেই বুঝতে পেরে নাবিকদের পিছন দিকে দাঁড় টানার সংকেত দেয় ট্যানাস, প্রচণ্ড টান প্রশমিত হলো খানিকটা।
এত নিচুতে নেমে গেছে হোরাসের প্রশ্বাসের খোল, নীল নদের সাবজেটে পানি উঠতে লাগলো তার উপর, কেঁপে কেঁপে, ভেসে-ডুবে শেষ পর্যন্ত দড়ি ধরে রাজকীয় জলযানকে টেনে রাখলো ওটা। বেশ লম্বা মুহূর্ত ধরে কিছুই ঘটল না। বিশাল জাহাজের উপর গ্যালির সামান্য ওজন কোনো প্রভাবই রাখতে পারছে না। কুমীরের চোয়ালের ফাঁকে আটকে ধরা বুড়ো ষাড়ের মতো এক হয়ে রইল দুটো জলযান। এবারে রাজকীয় জলযানের অবিন্যস্ত নাবিকদের মুখোমুখি হয় ট্যানাস। তার দায়িত্বপূর্ণ ভাবভঙ্গিতে বেশ একটা পরিবর্তন আসে তাদের মধ্যে। ওর নির্দেশের অপেক্ষায় এখন তারা।
ফারাও বাহিনীর সকল নৌবহরের প্রধান হলেন নেমবেট, মিশরের সাহসী সিংহ তাঁর উপাধি। অনেক কাল আগে শক্তিশালী একজন মানুষ ছিলেন তিনি, কিন্তু এখন বুড়ো, দুর্বল। ঠিক নদীর স্রোত কিংবা বাতাসের মতোই তার কতৃত্ব সহজে নিজের হাতে নিয়ে নিল ট্যানাস, আর নৌবহরের নাবিকেরাও নির্দ্বিধায় মেনে নিল সেটা।
