আর কখনো আমাদের ফেলে রেখে চলে যেও না, টাইটা।
*
আরকুনের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লসট্রিসকে রাজী করাতে বেগ পেতে হলো না। দ্রুত প্রশিক্ষণ শুরু করলাম আমরা। পাহাড়ের গভীরে রথ নিয়ে আক্রমণে যাওয়ার উপায় নেই, কাজেই শিলুকদের পদাতিক বাহিনী আমাদের ভরসা।
ফারাও-এর সমাধি উপত্যকায় আমাদের ওয়াগন আর রথ ফেলে রেখে পর্বত বেয়ে উঠতে লাগলাম আমরা। প্রেসটার বেনি জন একদল প্রহরী পাঠিয়ে দিয়েছে আমাদের পথ দেখানোর জন্যে। একশ জন সেরা লোক তারা।
বন্য, রক্তপিপাসু শিলুকদের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত পুরো এক বাহিনী নিয়ে এসেছে ট্যানাস। ধরা পরা সমস্ত গবাদিপশু তারা পাবে–এই মর্মে প্রতিজ্ঞা করেছে সে। সাহায্যের জন্যে দুই বাহিনী মিশরীয় তীরন্দাজ নিয়েছি আমরা সাথে, কাতাসের নেতৃত্বে। আমাদের ধনুকের পাল্লা ইথিওপিও ধনুকের দ্বিগুণ বেশি। যুদ্ধের জন্যে মুখিয়ে আছে পুরো বাহিনী।
আমাদের মধ্য থেকে সেরা ক জন তলোয়ারবাজ যযাদ্ধা নিয়েছে মেমনন। রেমরেম, লর্ড আকের আর আসতেস তাদের মধ্যে অন্যতম। পথপ্রদর্শক হিসেবে রইলাম আমি, আদবার সেজেদ-এ কেবল আমিই গিয়েছি এর আগে। হুই-কে সাথে নিয়েছি প্রেসটার বেনি-জনের উপহার দেওয়া ঘোড়গুলোকে দেখভালের জন্যে।
ট্যানাস আর রাজপুত্রকে বোঝালাম, দ্রুত এগিয়ে যাওয়াই আমাদের সাফল্যের চাবিকাঠি। অল্প কিছুদিনের মধ্যেই বৃষ্টি নেমে আসবে। আবার সেজেদ-এ থাকতে, পাহাড়ি এলাকার আবহাওয়া সম্পর্কে একটা ধারণা হয়ে গেছে আমার। একবার বৃষ্টি নেমে এলে এর চেয়ে বড়ো শত্রু আর কিছু হবে না।
এক মাসেরও কম সময়ে আম্বা কামারায় পায়ে হেঁটে চলে এলাম আমরা। লম্বা, ভীষণ এক কোব্রার মতোই পাহাড়ি রাস্তায় এঁকে-বেঁকে এগুলো আমাদের সারি সারি সৈন্য। শিলুকদের বর্শা পাহাড়ি সূর্যালোকে ঝকমক করছিলো। কেউ আমাদের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ালো না। আমাদের ফেলে আসা গ্রামগুলো সব পরিত্যক্ত। পালিয়ে গেছে অধিবাসীরা। মাঝে-মধ্যে যদিও কালো করে এলো আকাশ, কিন্তু বৃষ্টি ঝরালো না মেঘের দল।
যাত্রা শুরুর পঁচিশ দিনের মাথায় আম্বা কামারার নিচের উপত্যকায় পৌঁছুলাম আমরা। আমাদের উপরে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে আবার সেজেদ পর্বতমালা।
আমার অভিজ্ঞতা থেকে পথের উপরে আরকুনের রাখা প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার কথা জানি। পাথর-ধ্বস আর পাথরের দেয়াল তার মধ্যে অন্যতম। হাত তুলে ট্যানাসকে দেখালাম ওগুলো। আড়ালে লুকিয়ে থাকা জংলী শিরস্ত্রাণ ঠিকই চোখে পড়লো তার।
পাথর-ধসের একটা দুর্বলতা হলো কেবল একবারই ফেলা যায় ওগুলো। আমার শিলুক যোদ্ধারা অত্যন্ত দ্রুত, উদ্ধত মোষকে পর্যন্ত ফাঁকি দিতে পারে এরা, চিন্তান্বিত স্বরে ট্যানাস বললো।
ছোটো ছোটো দলে ভাগ করে তাদের উপরে পাঠালো সে। পাথর-ধস নেমে আসতেই তড়িৎ গতিতে ডানে-বাঁয়ে সরে সেগুলোকে পাহাড়ি ছাগলের মতোই এড়িয়ে গেলো তারা। একবার পাথর-ধস থামতেই, বন্যহুঙ্কার দিয়ে সামনে ছুটে চললো শিলুকের দল। তাদের হিংস্র উন্মত্ত চিল্কারে ঘাড়ের চুল দাঁড়িয়ে গেলো আমার।
পাথরের দেয়ালের আড়ালে মোতায়েন আরকুনের তীরন্দাজেরা অবশ্য আটকে দিতে সমর্থ হলো আমাদের। ক্ৰাতাস এবারে তার বাহিনী নিয়ে সামনে এগুলো। দূরবর্তী পাল্লার ধনুকের সাহায্যে মিশরীয় তীরন্দাজেরা বহুদূর থেকে তীরের বৃষ্টি বর্ষণ করতে লাগলো উপরে ।
চমৎকার ভঙ্গিতে আকাশ পানে খাড়া ছুটে যেতে লাগলো তীরের ঝক। উন্নতির শিখড়ে পৌঁছে সা সা করে নেমে যেতে লাগলো পাথরের আড়ালে স্থান নেওয়া লোকগুলোর আশ্রয়ে। উপায়ান্তর না দেখে নিজেদের গোপন আশ্রয় ছেড়ে বেরিয়ে এলো তারা। সাথে সাথেই রণ-হুঙ্কার দিয়ে ছুটলো শিলুক পদাতিক বাহিনী। কাজান! কাজান! মারো! মারো!
মেমননের সাথে থাকতে রীতিমতো কষ্ট হচ্ছিলো আমার। বয়স কাউকে ক্ষমা করে না।
লম্বা, উলের ইথিওপিও আচকান পরেছি আমরা; হাতে আমাদের শত্রুদের মতোই গোলাকার বর্ম। অবশ্য ঘোড়াগুলোকে পরচুলা পরাই নি।
অবশেষে যখন আম্বার চ্যাপ্টা মাথা পর্বতের উপরে উঠে এলাম, এক পলক তাকিয়ে দেখি ট্যানাস তার বাহিনীকে পুর্নবিন্যাস করছে। শিলুকদের একটা দুর্বলতা হলো, রক্তের গন্ধ পেলে উন্মাদ হয়ে যায় তারা। হিতাহিত জ্ঞান থাকে না। চাবুক হাতে সমানে চেঁচিয়ে চলছিলো ট্যানাস। আবারো, সংঘবদ্ধ হয়ে সামনের গ্রামের দিকে এগিয়ে গেলো শিলুক পদাতিক বাহিনী। ওখানে গ্রামের ভেতরে অপেক্ষা করছে শত্রুরা। বৃষ্টির মতোই তীর ছুটে আসতে লাগলো আমাদের দিকে, কিন্তু বর্ম তুলে ধরে নিজেদের রক্ষা করলো শিলুকেরা।
তারপর যখন পাল্টা আক্রমণে গেলো তারা, হকচকিয়ে গেলো ইথিওপিওরা। এ ধরনের মারো অথবা মরো লড়াইয়ে অভ্যস্ত নয় তারা।
ভীষণ লড়াইয়ে যখন মত্ত মিশরীয় বাহিনী, চিৎকার করে মেমনন আর তার ছোট্ট তলোয়ারবাজের দলের দৃষ্টি আকর্ষণ করলাম আমি। পরচুলাগুলো! সাথে সাথেই নিজেদের লম্বা পরচুলাগুলো মাথায় জড়িয়ে নেয় যোদ্ধারা। ঘোড়ার চুল থেকে নিজে ওগুলো তৈরি করেছি আমি। ইথিওপিও ডোরাকাটা পোশাকে, লম্বা চুলের আমাদের দেখে এখন আরকুনের লোক বলে ভুল করাই স্বাভাবিক।
এইদিকে! আমার পিছনে! জোরে ইথিওপিও রণ-হুঙ্কার দিয়ে পথ দেখালাম আমি। যুদ্ধরত গ্রাম ফেলে শষ্য ক্ষেতের উপর দিয়ে ছুটে চললাম আমরা। শেষমেষ আরকুন যখন বুঝবে, হারতে যাচ্ছে সে, তখন মাসারার পাশে থাকতে হবে আমাদের। সুযোগ পেলেই ওকে মেরে ফেলবে আরকুন, যখন বুঝবে আর কোনো ফায়দা লোটা যাবে না মাসারাকে দিয়ে। নির্ঘাত নীল তলোয়ার দিয়ে মেরে নিচের খাদে ফেলে দেবে সে তাকে।
