আম্বার মধ্য দিয়ে পথ করে এগুতে লাগলাম আমরা। দলে দলে পিছু হটা গ্রামের অধিবাসীদের সাথে সাথে আমরাও আম্বার শেষমাথার খাড়া আদবার সেজেদ অভিমুখে চললাম। সরু, বিপদজনক সেই পথের কাছে জট পাকিয়ে আছে লোকজন। ভিড় ঠেলে এগুলো আমাদের ছোট্ট দলটা। পথের শেষমাথায় প্রহরী রয়েছে। তলোয়ার বাগিয়ে শরণার্থীদের ঠেকিয়ে রাখছে তারা। বাচ্চা কোলে ভেতরে প্রবেশ করার অনুমতি জানিয়ে কাঁদছে মহিলারা। কেউ কেউ পড়ে গিয়ে পিছনের লোকজনের পদতলে পিষ্ট হতে লাগলো।
যখন সরু পথের প্রবেশমুখে পৌঁছুলাম আমরা, বাধা দিলো প্রহরীরা।
আমরা রাজা আরকুনের সরাসরি নির্দেশে এসেছি! পথ ছাড়ো! গীজ ভাষায় চেঁচালাম আমি। সাথে সাথেই একজন প্রহরী জানতে চাইলো, গুপ্তবাক্য বলো? মানুষের ধাক্কা সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে সে। আমার উদ্দেশ্যে তলোয়ার বাগিয়ে ধরলো, গুপ্তসংকেত ছাড়া যেতে পারবে না।
বন্দী দিনগুলোতে হাজার বার আমার প্রকোষ্ঠ থেকে এই বাক্য আউড়াতে শুনেছি আমি সৈনিকদের। চেঁচিয়ে বললাম, পর্বত অনেক উঁচু!
ঠিক আছে, যাও! তলোয়ার সরিয়ে পথ করে দিলো প্রহরী। ধাক্কাধাক্কি করে এগিয়ে চললাম আমরা। মাসারার চিন্তায় এতোটাই বিভোর হয়ে ছিলাম সবাই, দুই পাশের অতল ধাদের কথা একবারো মাথায় এলো না কারো। আমার পিছু পিছু এগিয়ে চললো বাকিরা।
রাজা আরকুন কোথায়? দুর্গের প্রবেশমুখে দাঁড়ানো প্রহরীদের উদ্দেশ্যে বললাম আমি। তারা একটু ইতস্তত করতেই চেঁচালাম, পর্বত অনেক উঁচু! রাজার জন্যে জরুরি বার্তা নিয়ে এসেছি আমি! সরে দাঁড়াও! যেতে দাও আমাদের, বোকার হদ্দ! তারা কিছু করার আগেই আমরা বারোজন সিঁড়িকোঠা টপকে উপরের চাতালে চড়লাম।
মাসারার প্রকোষ্ঠের সামনে প্রহরায় ছিলো দু জন। তাদের চিনতে পেরে আনন্দে আত্মহারা হলাম আমি। ভেবেছিলাম, ওকে হয়তো দূরে কোথাও সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। কিন্তু প্রহরীদের উপস্থিতি তার অবস্থান নিশ্চিত করছে।
কে তুমি? চিৎকার করে, নিজের অস্ত্র বাগিয়ে ধরলো একজন। কার অনুমতি নিয়ে বাক্য সম্পন্ন করতে পারলো না সে। একপাশে সরে গিয়ে মেমনন এবং রেমরেমকে পথ করে দিলাম আমি। পরিচিত দক্ষতায় ঝাঁপিয়ে পড়লো ওরা দু জন। নিমিষে নিকেশ করলো দু জন প্রহরীকে।
মাসারার প্রকোষ্ঠের দরোজা ডিতর থেকে বন্ধ। ওপাশের দেয়াল থেকে শোনা যাচ্ছে নারীকণ্ঠের সম্মিলিত আর্তনাদ। তৃতীয় প্রচেষ্টায় দরোজা খুলে হুড়মুড় করে ভেতরে প্রবেশ করলাম আমি।
মাসারা! মাথা থেকে পরচুলা খুলে ফেলে ডাকলাম। সাথে সাথেই চিনলো ও আমাকে।
টাইটা! ওকে ধরে রাখা একজন মহিলার কবজিতে কামড়ে দিলো সে, দৌড়ে এসে আমার গলা জড়িয়ে ধরলো দু হাতে। কাঁধের উপর দিয়ে পিছনে চোখ পড়তে হাতের বাঁধন ঢিলে হয়ে এলো তার, বড়ো বড়ো চোখে আনন্দের ঝিলিক খেলে গেলো।
নিজের পরচুলা খুলে ফেলেছে মেমনন। একপাশে সরে গিয়ে মাসারাকে পথ করে দিলাম আমি। এক দৃষ্টে পরস্পরের দিকে চেয়ে থাকলো ওরা, কেউ কোনো কথা বলছে না। এক যুগ কেটে গেলো যেনো। এরপর, নরমস্বরে আধো মিশরীয় বুলিতে মাসারা বলে উঠলো, তাহলে এসেছো । তোমার প্রতিজ্ঞা পালন করবে–এ আমি জানতাম।
সেই প্রথম মেমননকে হারিয়ে যেতে দেখেছিলাম আমি। একটু মাথা নাড়লো সে। এরপর অবিস্মরণীয় একটা ব্যাপার ঘটলো। লজ্জায় রাঙা হলো মেমননের ফর্সা মুখ, ঘাড়। মিশরের রাজপুত্র, ফারাও-এর সন্তান, প্রথম রথ বহরের অধিনায়ক, দশ হাজারের সেরা উপাধিপ্রাপ্ত, বীরশ্রেষ্ঠ পদকে ভূষিত যুবরাজ নির্বাক বোকার মতো দাঁড়িয়ে রইলো।
আমার পেছনে, চমকে যাওয়া মুরগির মতো ঝটপটিয়ে উঠলো একজন স্ত্রীলোক। ওকে ধরার আগেই আমার হাতের নীচ দিয়ে মাথা নামিয়ে পালিয়ে গেলো সিঁড়িকোঠা ধরে। চারিদিকে প্রতিধ্বনিত হতে লাগলো তার চিৎকার, প্রহরী! পুব দিকে ঢুকে পড়েছে শত্রুরা! দ্রুত এসো, জলদি! সাথে সাথেই সিঁড়িপথে বেশ ক জোড়া পায়ের ধুপ ধাপ শব্দ পাওয়া গেলো।
নিমিষেই লাজুক প্রেমিক থেকে কঠোর যোদ্ধায় পরিণত হলো মেমনন। ওকে দেখো, টাটা। কোনো আঁচড় যেনো না লাগে! আমাকে বলে, নিজে এগিয়ে গেলো দরোজার দিকে।
ট্যানাসের শেখানো ধ্রুপদি আঘাতে প্রথম প্রহরীকে নিকেশ করলো সে, এরপর মৃতদেহটা ছুঁড়ে দিলো পিছনের লোকগুলোর উপর। উল্টে পাল্টে পরে গিয়ে সিঁড়িপথ উন্মুক্ত করে দিলো তারা।
আমার দিকে ফিরলো মেমনন এবারে। কী মনে হয়, বন্ধ করে ফেলার আগে দুর্গের প্রবেশদ্বারে পৌঁছুতে পারবো আমরা?
পারতেই হবে। উত্তরে বললাম আমি। বাইরের সিঁড়ি ধরে নামাটাই সঠিক হবে আমাদের জন্যে।
রেমরেম, সামনে থাকো। টাটা আর রাজকুমারী মাঝে। পিছনে আমি পাহাড়া দিচ্ছি। কর্কশ স্বরে বলে আগুয়ান আরো একজন বর্বরের চোখের ভেতর তলোয়ারের ফলা সেঁধিয়ে দেয় মেমনন। এবারে, চোখে আঙুল দিয়ে ঢেকে রাখা ইথিওপিওকে ধাক্কা মেরে ফেলে দিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো রাস্তা পরিষ্কার করে সে। রেমরেমের পিছনে যাও। আমাকে উদ্দেশ্যে করে চেঁচালো রাজপুত্র। ওখানে না দাঁড়িয়ে থেকে যতো জোরে পারো, ছোটো!
আমার পিছনে ছুটলো মাসারা । চাতালে নেমে আসতেই সূর্যরশ্মি যেনো অন্ধ করে দিলো আমাদের। পিটপিট করে চোখ পরিষ্কার কোরে নিচের সরু পথে, চ্যাপ্টা মাথা পর্বতের ধার পর্যন্ত দেখে নিলাম। ট্যানাসের শিলুকেরা আছে সেখানে। বর্ম উঁচু করে ধরে রেখে লড়ে চলেছে তারা।
