আমাকে কোলে তুলে নিয়ে রথের পাদানীতে দাঁড় করিয়ে দিলো মেমনন। লাগাম হাতে নাও, নির্দেশের সুরে বললো সে। দেখতে চাই, আগের কৌশল সব ভুলে গেছো কি না!
কোন্ দিকে? জানতে চাইলাম।
পশ্চিমে কেবুই-এ। আর কোথায়? মা যদি শুনে তোমাকে সরাসরি তার কাছে নিয়ে যাইনি, মেরেই ফেলকে আমাকে।
সেই রাতে, অন্যান্যদের থেকে একটু আলাদা স্থানে ক্যাম্প ফেললাম আমরা দু জন। আলোকোজ্জ্বল নক্ষত্ররাজীর দিকে চেয়ে থেকে নীরব রইলাম কিছুক্ষণ। এরপর মেমনন বললো, যখনই ভাবতাম, তোমাকে হারিয়েছি, মনে হতো নিজেরই একটা অংশ যেনো নেই আমার। আমার সবচেয়ে পুরোনো স্মৃতিতেও তুমি আছো।
আমি, যার কাজই হলো শব্দের মালা গাঁথা, যথোপযুক্ত কোনো শব্দ খুঁজে পেলাম ওর কথার উত্তরে। আবারো নীরবতা নেমে এলো আমাদের মাঝে। শেষমেষ মেমনন এক হাত রাখলো আমার কাঁধে।
ওই মেয়েটাকে আর কখনো দেখেছিলে? ধীর, সহজ ভঙ্গিতে জানতে চাইলো সে, যেনো এতে কিছুই আসে যায় না। কিন্তু আমার কাঁধে রাখা হাত শক্ত হয়ে উঠলো তার।
কোন্ মেয়ে? ইচ্ছে করেই বললাম আমি।
নদীর ধারের সেই মেয়েটা যেদিন আমরা আলাদা হলাম, সেদিন দেখা হয়েছিলো?
কোনো মেয়ে ছিলো নাকি সেখানে? ভ্রু কুঁচকে মনে করার চেষ্ট করলাম যেনো। দেখতে কেমন, মনে আছে?
ওর মুখ যেন গাঢ় পদ্মফুল, বন্য-মধু রঙা গা। ওরা তাকে মাসারা বলে ডাকছিলো। ওর কথা ভেবে অনেক রাত ঘুম হয় নি আমার।
ওর নাম মাসারা বেনি-জন, আমি জানালাম রাজপুত্রকে। আবার সেজেদ পর্বতে দীর্ঘ দুই বছর ওর সঙ্গেই বন্দী জীবন কাটিয়েছি আমি। ওখানে ওকে ভালোবাসতে শুরু করেছি, শুধু চেহারায় নয়, মনেও অত্যন্ত সুন্দর ও।
দুই হাতে আমাকে নির্মমভাবে ঝাঁকুনি দিতে লাগলো যুবরাজ। ওর কথা বলো আমাকে, টাটা! সবকিছু বলো!
কাজেই, সারারাত আগুনের ধারে বসে মাসারার কথা বললাম আমরা দু জন। আমি তাকে জানালাম, নিজের গরজেই মিশরীয় ভাষা শিখে নিয়েছে মাসারা। জানালাম, মেমননের শপথ তাকে অন্ধকার দিনগুলোতে বাঁচিয়ে রেখেছে। সবশেষে জানালাম মাসারার পাঠানো বার্তার কথা, যেদিন আবার সেজেদ ছেড়ে চলে আসলাম, সেদিন বলেছিলো ও।
ওকে বলো, আমি সাহস হারাই নি। বলল, আমি ভালোবাসি ওকে।
আগুনের দিকে এক দৃষ্টে তাকিয়ে থাকলো মেমনন কিছু সময়। এরপর নরম স্বরে জানতে চাইলো, কেমন করে ও ভালোবাসবে আমাকে? আমাকে তো চেনেই না।
তুমি কী তাকে ভালো করে জানো, ও তোমাকে যেমন জানে, তার চাইতে ভালো করে? আমার প্রশ্নের উত্তরে মাথা নাড়ে রাজকুমার।
ভালোবাসো ওকে?
হ্যাঁ, দ্বিধাহীন কণ্ঠে বললো মেমনন।
তবে সেও তোমাকে একই রকম ভালোবাসে।
ওর কাছে শপথ করেছি আমি। ওই শপথ পূর্ণ করতে আমাকে সাহায্য করবে তো টাটা?
*
কেবুই-এ ফিরে, হোরাসের প্রশ্বাসে চড়ার পর আমার আনন্দ যেনো বাধ মানতে চাইলো না।
আগেই বার্তাবাহক পাঠিয়ে আমাদের আগমনের কথা জানিয়ে রেখেছিলো মেমনন, কাজেই খোলা পাটাতনে আমাকে অভ্যর্থনা জানানোর জন্যে দাঁড়িয়ে ছিলো পুরো মিশর।
সেথ্-এর পাছার ভাজে লুকোনো ময়লার দুর্গন্ধের কসম! চিৎকার করে বললো ক্ৰাতাস। আমি তো ভেবেছিলাম, তোমার হাত থেকে চিরদিনের মতো নিস্তার মিলেছে, টাইটা! ব্যাটা বুড়ো জংলী! বুকের সাথে যেনো পিষে ফেলবে ও আমাকে।
একটানে নিজের দিকে আমাকে ঘুরিয়ে চোখে চোখে কিছুক্ষণ চেয়ে থেকে হাসলো ট্যানাস। তোমার জন্যে আর একটু হলে জংলী ইথিওপিও ব্যাটা ধরে ফেলেছিলো আমাকে! তোমার কারণেই বেঁচে গেছি। ধন্যবাদ, বুড়ো বন্ধু। দেখলাম, কতোটা বুড়িয়ে গেছে ট্যানাস। আমার মতোই ওর চুলও ধূসর হতে শুরু করেছে, মুখটা গ্রানাইটের খণ্ডের মতো ঝড়-অত্যাচারের চিহ্ন বইছে।
আমার ছোট্ট রাজকুমারীরা আর ছোট্টটি নেই অনেক বড়ো হয়ে গেছে ওরা। আমার কাছে আসতে একটু লজ্জা পেলো, আগের কথা খুব একটা মনে থাকার কথা নয় ওদের। সামনে গিয়ে কুর্নিশ করতে, বড়ো বড়ো চোখে চেয়ে থাকলো। বেকাথার চুলের রঙ গাঢ় তামাটে হয়ে গেছে ততোদিনে।
শেষমেষ, তেহুতি চিনতে পারলো আমাকে। টাটা! বললো সে। কী উপহার এনেছো আমার জন্যে?
হ্যাঁ, সম্মানিত রাজকুমারী, আমি বললাম উত্তরে । এনেছি তো। আমার হৃদয়!
পাটাতন ধরে যখন আমার কর্ত্রীর উদ্দেশ্যে হেঁটে গেলাম, হাসছিলো ও। হালকা নেমেস মুকুট মাথায়, কপালে কোব্রার স্বর্ণমণ্ডিত মাথা । কোমড়ের দিকে ভারী হয়ে গেছে লসট্রিস। দীর্ঘ বছরগুলোর শাসনভার কপালে আর চোখের কোণে কুঞ্চন ফেলে দিয়েছে। আমার কাছে অবশ্য সে তখনো পৃথিবীর সেরা সুন্দরী।
ঝুঁকে মাথা নত করতে সিংহাসন ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো ও। এ হলো সর্বোচ্চ সম্মানের ব্যাপার। আমার নিচু করে রাখা মাথায় হাত রাখলো মিশরের রানি।
বহুদিন আমাদের থেকে দূরে সরে ছিলে তুমি, টাইটা, এতো নরমস্বরে বললো ও, অনেক কষ্টে শুনতে পেলাম। আজ রাতে, আবার আমার বিছানার পায়ের কাছে ঘুমাবে তুমি, ঠিক আগের মতো।
সেই রাতে, আমার তৈরি করা লতা-গুল্মের মিশ্রণ পান শেষে যখন শুলো ও; পশমের কম্বল দিয়ে গা ঢেকে দিলাম আমি। চোখ বন্ধ রেখেই বিড়বিড় করলো লসট্রিস, ঘুমে থাকবো যখন, আমাকে আবার চুমো দেবে না তো?
না, মহারানি, উত্তরে বললাম আমি। তারপর ওর উপর ঝুঁকে এলাম, পরস্পরকে স্পর্শ করলো আমাদের ঠোঁট । হাসলো লসট্রিস।
