আমি খুব ভালো করে চিনি আদবার সেজেদ, কিন্তু ওই দুর্গ দূর্ভেদ্য। প্রত্যুত্তরে বললো প্রেসটার বেনি-জন। ভীষণ শক্তিশালী বাহিনী আছে আরকুনের। বহু ভয়ঙ্কর যুদ্ধ লড়েছি আমরা তার সাথে। আমার লোকেরা সিংহের মতো সাহসী, তবুও কখনো হারাতে পারিনি তাকে। প্রেসটার বেনি-জন-এর সিংহবাহিনীকে দেখেছি আমি যুদ্ধের ময়দানে, তার চিন্তা-ভাবনা একেবারেই সঠিক। ওই রকম বাহিনী নিয়ে আবার সেজেদ আক্রমণ করে মাসারা কে ফিরে পাবার আশা বৃথা।
পরদিন ভিন্ন একটা প্রস্তাব নিয়ে গেলাম রাজার কাছে। আকসুম প্রদেশের শাসনকর্তা, রাজাদের রাজা, আপনি তো জানেন, আমি মিশরীয় নাগরিক। মিশরের শাসনকর্ত্রী, রানি লসট্রিস তার বাহিনী নিয়ে জোড়া নদীর মিলনস্থলে অপেক্ষা করছেন।
সায় দিলো প্রেসটার বেনি-জন। সত্যি কথা। মিশরীয়রা আমার এলাকায় অনুপ্রবেশ করেছে বটে। আমার উপত্যকায় খোঁড়াখুড়ি করছে তারা। শীঘিই তাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে সীমান্ত ছাড়া করবো আমি তাদের।
এবারে আমার অবাক হওয়ার পালা। ফারাও-এর সমাধির নির্মাণ কাজ সম্বন্ধে অবগত আছেন প্রেসটার বেনি-জন! আর আমার লোকেরা তার আক্রমণের হুমকির মধ্যে আছে। সাথে সাথেই কথার উদ্দেশ্য পরিবর্তন করে ফেললাম।
আমার লোকেরা যুদ্ধ আর আক্রমণ কৌশলে পারদর্শী। ব্যাখ্যা করে জানালাম তাকে। রানি লসট্রিসের সাথে ভালো সম্পর্ক আমার। আমাকে যদি নিরাপদে তার কাছে পৌঁছে দেন, আপনার সাথে তার বন্ধুত্বের সম্পর্ক গড়ে দেবো। মিশরীয় বাহিনী সদলবলে আদবার সেজেদ উড়িয়ে দিয়ে আপনার কন্যাকে উদ্ধার করে আনবে।
এই প্রস্তাবে ভেতরে ভেতরে দারুন আন্দোলিত হয়েছিলো সেটার বেনি-জন। বন্ধুত্বের বিনিময়ে তোমার কী কী চাইবে আমার কাছে? সতর্কভঙ্গিতে জানতে চাইলো সে।
বেশ ক দিন দরদাম করলাম আমরা। শেষপর্যন্ত চূড়ান্ত হলো দাবি। রানি লসট্রিসকে আপনার উপত্যকায় খোঁড়া-খুড়ি চালিয়ে দিতে হবে আপনাকে। ওই উপত্যকাকে আপনি নিষিদ্ধ এলাকা হিসেবে ঘোষণা করবেন। এমনকি মৃত্যুর হুমকি দিলেও আপনার লোকেরা কখনো সেই এলাকায় প্রবেশ করবে না। আমার স্ত্রীর জন্যে এটুকু করলাম, এতে করে ফারাও-এর সমাধি লজ্জিত হবে না।
ঠিক আছে, একমত হলো প্রেসটার বেনি-জন।
আপনার ঘোড়ার পাল থেকে আমার পছন্দ করা দুই হাজার ঘোড়া দিতে হবে রানি লসট্রিসকে, উপহার হিসেবে। এটা আমার জন্যে।
এক হাজার, রাজা বললো।
দুই হাজার, একটুও নমনীয় হলাম না আমি।
ঠিক আছে, শেষমেষ মেনে নিলো প্রেসটার বেনি-জন।
মুক্তি পাওয়ার পর তার পছন্দ মতো পুরুষকে বিয়ে করার অনুমতি দিতে হবে রাজকুমারী মাসারাকে। এ বিষয়ে আপনি কোনো রকম নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে পারবেন না। এটা মেমনন আর মাসারার জন্যে।
এ যে আমাদের আচার-অনুষ্ঠানের বাইরে, দীর্ঘশ্বাস ফেললো প্রেসটার বেনি জন। ঠিক আছে, তাও মেনে নিলাম।
যুদ্ধ শেষে আরকুন এবং তার আদবার সেজেদ দুর্গ আপনার হাতে তুলে দেবো আমরা। এবারে বেশ উৎফুল্ল দেখালো তাকে।
শেষ একটা কথা আরকুনের সমস্ত যুদ্ধাস্ত্র বিশেষত কিংবদন্তির সেই নীল তলোয়ার, ওগুলো আমরা, মিশরীয়রা পাবো। এটা ট্যানাসের জন্যে।
আমি একমত।
পঞ্চাশজন যোদ্ধার একটা প্রহরী বাহিনী দিলো প্রেসটার বেনি-জন; তারই উপহার দেওয়া চমৎকার একটা স্ট্যালিয়নের পিঠে চড়ে পরদিনই কেবুই-এর উদ্দেশ্যে ফিরে চললাম আমি।
*
তখনো কেবুই থেকে পাঁচদিন মতো দূরত্বে আমরা, এ সময় আকাশের গায়ে চলমান ধুলোর মেঘ দৃষ্টিগোচর হলো। এরপরই তাপ-মরীচিৎকার ভেতর নাচতে দেখলাম রথ বহরকে। আক্রমণের ভঙ্গিতে বিন্যস্ত হয়ে এগিয়ে চলেছে রথবহর, সমভূমির উপর দিয়ে। এতো চমৎকার ভাবে বিন্যস্ত সুদৃশ্য রথগুলোকে ওগুলোর নেতৃত্বে রয়েছে–ভাবলাম আমি।
চোখের উপর হাত দিয়ে আড়াল করে সামনে তাকালাম। সামনের রথের ঘোড়াদুটো দেখে লাফিয়ে উঠলো বুকের ভেতরটা। এ যে অজেয় আর শেকল আমার প্রিয় দুটো ছেলেমেয়ে। অবশ্য, রথের কাঠামোতে বসা অবয়বটাকে সহসা চিনতে পারি নি। তিন বছর আগে শেষ দেখেছিলাম মেমননকে। তেরো থেকে সতেরো বছরের ফারাক আসলে ছেলে থেকে পুরুষে রূপান্তরিত করেছে তাকে।
জিনের উপরে রাখা কাপড় আর পাদানীসহ ইথিওপিও ধাচে ঘোড়া দাবড়াতে শিখে গেছি আমি ততোদিনে। পাদানী উপর দাঁড়িয়ে হাত নাচালাম; বাঁক ঘুরিয়ে ফেলেছে রথ টের পেলাম। মেমনন আমাকে চিনেছে। দ্রুত ছুটে আসতে লাগলো সে।
মেম! চিৎকার করে উঠলাম আমি। মেম! বাতাসে ভেসে এলো মেমননের আনন্দচ্ছল কণ্ঠ।
টাটা! আইসিসের মিষ্টি বুকজোড়ার কসম! এ যে টাটা!
রথ থামিয়ে, নেমে এসে আমাকে টেনে ঘোড়া থেকে নামালো সে। প্রথমেই আলিঙ্গন করে, একহাত দূরত্বে থেকে পরস্পরকে পর্যবেক্ষণ করতে লাগলাম আমরা দু জন।
তুমি ফ্যাকাসে আর পাতলা হয়ে গেছে, টাটা। হাড় বেড়িয়ে গেছে শরীরের। মাথায় এগুলো কী ধূসর চুল দেখছি আমি? আমার চাদির চুলগুলো আলতো কোর টানলো সে।
আমার চেয়ে ততোদিনে লম্বা হয়ে গেছে মেমনন। হালকা-পাতলা, চওড়া কাঁধের অধিকারী সে। পালিশ করা তৈল-স্ফটিকের মতো স্বচ্ছ তার ত্বক, হাসির সময় ঘাড়ের পেশি শক্ত হয়ে উঠলো। স্বর্ণের বাজুবন্ধ হাতে; নগ্ন বুকে ঝুলছে বীরশ্রেষ্ঠ পদক। ক্ষীপ্র চিতার কথা মনে করিয়ে দিলো ও আমাকে।
