পরদিন রাত নামবার আগেই পিছনে ফেলে আসা একটা অগভীর নদীবক্ষে পৌঁছুলাম আমরা। মাসারার দেওয়া বর্ণনা থেকে এটা চিনলাম আমি। পর্বত থেকে নেমে আসা মাতা নীলের অসংখ্য শাখা-প্রশাখার একটি এই নদী। গত কয়েক দিনের বৃষ্টিপাতে পানির স্তর বেশ উঁচু হয়ে গেছে। নদী অতিক্রমের জন্যে পানিতে নেমে এলাম আমরা। কিন্তু স্রোতের গতি আর পানির উচ্চতা ভুল বুঝেছিলাম আমি। দারুন শক্তিশালী স্রোত এখানে। টলোমলো শুরু করলো ঘোড়াগুলো। টেনে নিয়ে গেলো গভীর পানিতে। কিছুক্ষণ পরেই দেখি, পানিতে হাবুডুবু খাচ্ছি আমি এবং আমার ঘোড়াটা। স্রোতের টানে নদীর ভাটিতে ভেসে চললাম আমরা। জীবন বাঁচানোর তাগিদে প্রাণপণ সাঁতরে চললাম আমি। কোনো রকম চিৎ হয়ে পায়ে দিয়ে পানির তলার পাথরের ভঁজে আটকে নিলাম। প্রচণ্ড স্রোত স্থির হতে দিচ্ছে না। কিছু সময় পর্যন্ত আরকুনের সৈনিকেরা নদীর পার ধরে আমার সঙ্গে সঙ্গে দৌড়ে চললো। কিন্তু অল্পক্ষণ পরেই নদী বাঁক ঘুরতে, সামনের পাথুরে প্রতিবন্ধকের কারণে আর এগুনো সম্ভবপর হলো না তাদের পক্ষে । একা ভেসে চললাম আমি আর ঘোড়াটা।
বাকের পরে এসে ধীরে কমে এলো স্রোতের গতিবেগ । সাঁতরে এগিয়ে, এক হাত দিয়ে ঘোড়ার গলা জড়িয়ে ধরলাম আমি। এই মুহূর্তের জন্যে আমি নিরাপদ। তখনই, প্রথমবারের মতে পালানোর কথা মাথায় এলো আমার বুঝলাম, দেবতারা একটা সুযোগ করে দিয়েছেন আমাকে। বিড়বিড় করে প্রার্থনা আউড়ালাম দেবতার প্রতি, আরো ভালো করে ঘোড়াটাকে জড়িয়ে ধরে থাকলাম।
বেশ ক মাইল ভাটিতে নিয়ে এলো নদী আমাদের। এরপর, চারিদিকে যখন আঁধার ঘনিয়েছে, তীরে উঠে এলাম ঘোড়াসমেত। আমি নিশ্চিত, সকাল হওয়ার আগে আমাকে খুঁজতে বেরুবে না আরুকুনের লোকেরা। শীতে ঠকঠক করে কাঁপতে লাগলো সর্বাঙ্গ।
বাতাসের আড়ালে, একটা পাথুরে খোড়লে ঘোড়াটাকে এনে, ওর গায়ে গা ঠেকিয়ে শুয়ে রইলাম। চাঁদের আলোয় চকচক করছে জটার মখমলের মতো ত্বক। ধীরে, ঘোড়ার গায়ের তাপ এসে লাগলো শরীরে, কমে এলো কাঁপুনি। একটু গরম হয়ে নিতে, বালুময় তীর থেকে ভাঙা ডাল কুড়িয়ে নিয়ে আসলাম। শিলুকদের শেখানো কৌশলে, বহু কণ্ঠে একটা ছোট্ট আগুন ধরাতে সমর্থ হলাম। আগুনের ধারে ভেজা জামা শুকোতে দিয়ে সারারাত কুঁজো হয়ে পড়ে থাকলাম।
সকালের আলো ফুটে উঠতেই, কাপড় গায়ে দিয়ে চড়ে বসলাম ঘোড়ার পিঠে। নদী থেকে যথাসম্ভব সরে থাকতে হবে আমাকে। আরকুন ওখানেই খুঁজবে।
দুইদিন পর, মাসারার দেওয়া পথচিহ্ন অনুসরণ করে প্রেসটার বেনি- জনের এলাকায়, চাষ-বাস করা হয়, এমন একটা চ্যাপ্টা পাহাড়ে উঠে এলাম আমি। গ্রামের সর্দার কিছু মাত্র দেরি না করে আমার গলা কেটে, ঘোড়া হাতিয়ে নেয়ার অভিপ্রায় ব্যক্ত করলো। প্রাণপণ চেষ্টায় তাকে বোঝাতে সক্ষম হলাম আমি, ঘোড়াটা রেখে আমাকে যেনো প্রেসটার বেনি-জনের কাছে যেতে দেওয়া হয়। শেষমেষ, আমাকে তার দুর্গে নিয়ে যেতে সম্মত হলো সর্দার।
*
যে প্রহরীরা আমাকে প্রেসটার বেনি-জনের কাছে নিয়ে চলছিলো, তাদের কথাবার্তা থেকে টের পেলাম, দারুন শ্রদ্ধা করে তারা রাজাকে। যে সমস্ত গ্রাম পেরিয়ে এলাম, তাদের অধিবাসীরা অন্তত আরকুনের লোকেদের চেয়ে পরিচ্ছন্ন। ভালো স্বাস্থ্যের লোকজন নিজেদের এলাকায় চাষবাস করছে। তাদের ঘোড়াগুলো চমৎকার। এতো সুন্দর চোখে প্রায় জল চলে এলো আমার।
অবশেষে, ভীষণ উঁচু এক আমবার উপরে দুর্গ দৃষ্টিগোচর হলো। আরকুনের চেয়ে এ ঢের ভাললা, কোনো বিভৎস দেহ ঝুলে নেই দেয়ালে।
কাছ থেকে অবশ্য রাজা প্রেসটার বেনি-জন অত্যন্ত সুপুরুষ। রুপালি চুল আর দাড়ি ভিন্ন এক আভিজাত্য এনে দিয়েছে তাকে। গায়ের রঙ ফর্সা; গভীর কালো চোখে বুদ্ধির ঝিলিক। প্রথমে আমার গল্পের কাহিনীতে সন্দেহ পোষণ করলো সে, কিন্তু মাসারার সাথে আমার বিভিন্ন কথা-বার্তার খবরে একটু একটু করে তার আচরণ পরিবর্তন ঘটতে লাগলো।
মেয়ের বার্তা পেয়ে আবেগে আপ্লুত হলো প্রেসটার বেনি-জন। তার স্বাস্থ্যের খবরাখবর জানতে উদগ্রিব হয়ে আমাকে প্রশ্নের পর প্রশ্ন করে চললো। এরপর, তার নির্দেশে ভালো একটা কক্ষে নিয়ে গিয়ে খাবার আর গরম উলের কাপড় দেওয়া হলো আমাকে। খাবার আর বিশ্রাম শেষ হতে, ভৃত্যরা এসে রাজার সভাকক্ষে নিয়ে চললো আমাকে।
সম্মানিত রাজা, গত দু বছর ধরেই আরকুনের দুর্গে বন্দী জীবন যাপন করছে। মাসারা। কথা বলার সুযোগ পেয়েই বললাম। তরুণী একজন মেয়ে সে। বহুকষ্টে, বিচ্ছিরি পরিবেশে কোনোক্রমে টিকে আছে। এরপর তার অবস্থার কথা খুলে বললাম যথাসম্ভব।
আরকুনের দাবি করা মুক্তিপণ জোগাড় করার চেষ্টা করছি আমি। নিজেকেই যেনো সান্ত্বনা দিতে চাইলো প্রেসটার বেনি-জন। কিন্তু ওই বদমাশের লোভ পূরণের জন্যে যে পরিমাণ রুপোর প্রয়োজন, তা এতো দ্রুত জোগাড় করা সম্ভব নয়। এ ছাড়াও, বহু জমি এবং আমার সেরা কিছু গ্রাম দাবি করেছে সে। এতে করে আমার সম্পূর্ণ রাজত্ব, লোকবল তার হয়ে যাবে।
আপনার বাহিনীকে, আদর সেজেদ-এ, আরকুনের দুর্গে নিয়ে যেতে পারি আমি। সেখানে পৌঁছুতে পারলে, তাকে কজা করে মারা কে ফিরে পেতে পারেন।
এমন প্রস্তাবে হকচকিয়ে গেলো প্রেসটার বেনি-জন। এ ভাবে লড়তে অভ্যস্ত নয় ইথিওপিয় রা ।
