সরু পাহাড়ি পথে ঘোড়ার চোখ বেঁধে যখন নামছিলাম, ঘাড় ফিরিয়ে চাতালের উপর তাকিয়ে দেখলাম, ঠায় দাঁড়িয়ে রয়েছে মাসারা। মিশরীয় ভাষায় কথা বলে উঠলো ও। বাতাসের শব্দ ছাপিয়ে ওর কথাগুলো আমার কানে পৌঁছেছিলো।
ওকে বলো, ওর অপেক্ষায় আছি আমি। বলো, আমি সাহস হারাই নি। এরপর, নরম স্বরে যা বলেছিলো, আমি ভালোভাবে ঠাওর করতে পারলাম না। তবে মনে হয়, মাসারা বলেছিলো, বলো, আমি ভালোবাসি ওকে।
ঠাণ্ডা বাতাসে গালের উপর বরফের মতো মনে হলো চোখের পানি। আম্বা কামারার উপর দিয়ে ঘোড়া ছুটিয়ে দিলাম আমি।
*
যুদ্ধের আগের রাতে তার তাবুতে বহু রাত পর্যন্ত আমাকে বেসিয়ে রাখলো আরকুন। শেষমুহূর্তের নির্দেশ দিচ্ছিলো সেনাপতিদের, একই সঙ্গে নীল রঙের তলোয়ারে ফলায় ধার দিচিছলো সে। এরপর বিশুদ্ধ গরুর চর্বি দিয়ে ফলাটা ভালো করে মাখালো সে। সেই অদ্ভুত রুপালি-নীল তলোয়ারটার যত্ন নিতে হয়, না হয় লাল গুঁড়োর মতো কিছু একটা জন্মে ওটার গায়ে।
ঠিক ট্যানাসের মতোই আমিও দারুন পছন্দ করে ফেললাম তলোয়ারটা। মাঝে মধ্যে যখন খুব ভালো আচরণ করতো আরকুন, আমাকে তলোয়ারটা হাতে নিতে দিতো সে। ওটার ওজন, ফলার ধার সবকিছুই ছিলো অবিশ্বাস্য। ভাবছিলাম, ট্যানাসের মতো একজন তুখোড় তলোয়ারবাজের হাতে পড়লে কী জাদু দেখাবে ওটা। আবার আমাদের দেখা হলে নির্ঘাত এর সম্পর্কে জানতে চাইবে ট্যানাস, কাজেই আরকুনের কাছে। তলোয়ার সম্পর্কে বিভিন্ন কথা জিজ্ঞেস করতাম আমি । আরকুনেরও এই নিয়ে বলতে যেনো কোনো ক্লান্তি নেই।
সে আমাকে জানালো, ইথিওপিয়ার কোনো এক সূর্য দেবতা গলিত আগ্নেয়শিলা থেকে তৈরি করেছেন এই তলোয়ার। ডোম খেলায় জিতে সেই দেবতার কাছ থেকে এটা পেয়েছিলেন আরকুনের দাদার দাদা। বিশদিন বিশরাত ধরে চলেছিলো সেই খেলা। আমি ভাবলাম, আরকুনের দাদার দাদা যদি তার মতো মানের খেলোয়ার হয়ে থাকে, তাহলে সেই দেবতা নির্ঘাত অকাল-কুম্মাণ্ড।
পরদিন তার যুদ্ধের পরিকল্পনা সম্পর্কে আমার কাছে জানতে চাইলো আরকুন। তততদিনে সে জেনে গেছে, সামরিক কৌশল আমি বুঝি। আমি তাকে জানালাম, তার পরিকল্পনা অসাধারণ। ডোম খেলার মতোই সামরিক কৌশলে দারুন পিছিয়ে ছিলো ইথিওপিওরা। যে ভূ-খণ্ডে যুদ্ধ হচ্ছে, ঘোড়ার কোনো ভূমিকা নেই সেখানে। তাদের কোনো রথ নেই। বিশৃঙ্খল ভঙ্গিতে যুদ্ধ লড়ে অভ্যস্ত এরা।
তুমি হলে ইতিহাসের সেরা সমরনায়ক, আমি আরকুনকে বললাম। তোমার এই কীর্তিগাথা একটা স্লোলে লিখে রাখতে চাই আমি। চিন্তাটা মনে ধরলো আরকুনের। আদবার সেজেদ-এ ফিরে এর জন্যে যা যা প্রয়োজন, সব আমাকে জোগাড় করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলো সে।
যতোদূর বুঝলাম, রাজা প্রেসটার বেনি-জনও একই গোছের যুদ্ধবাজ। খাড়া ঢাল বিশিষ্ট চওড়া এক উপত্যকায় পরের দিন তার বাহিনীর সাথে দেখা হলো আমাদের। কয়েক মাস আগেই যুদ্ধের স্থান হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিলো এই স্থান। আমরা আসার আগেই নিজের বাহিনীর সামনে অবস্থান নিয়ে ফেলেছিলো রাজা প্রেসটার বেনি জন। নিরাপদ দূরত্বে থেকে, আগে বেড়ে আরকুনের উদ্দেশ্যে গাল-মন্দ বকতে লাগলো সে।
ভীষণ বিচ্ছিরি লোক এই প্রেসটার বেনি-জন। শুকনো, লম্বা-সাদা দাড়ি কোমড়ে এসে পড়েছে। দূর থেকে দেখে ভালো বুঝলাম না। কিন্তু মহিলারা আমাকে জানালো, যৌবনে ইথিওপিয়ার সুদর্শনতম পুরুষ ছিলো সেটার বেনি-জন; দুইশো স্ত্রী আছে তার। অনেক মেয়ে এর ভালোবাসা পাবার জন্যে আত্মাহুতি দিয়েছে। সম্ভবত, হারেমের ভেতরেই তার দক্ষতা বেশি, যুদ্ধের ময়দানে নয়।
প্ৰেসটার বেনি-জনের গাল-মন্দ শেষ হতে, এবারে আরকুন সামনে এগিয়ে প্রত্যুত্তর করলো। বেশ আগুনঝড়া, কাব্যিক হলো তার গাল-মন্দ, চারপাশের উঁচু পাহাড়ে ধাক্কা খেয়ে ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হতে লাগলো তার কণ্ঠস্বর।
আরকুনের শেষ হতে, যুদ্ধ শুরু অপেক্ষায় রইলাম আমি। কিন্তু না, দুই পক্ষেরই বেশ কয়েকজন সৈনিকের বলার পালা এবারে। উষ্ণ সূর্যের তলায়, পাথরে হেলান দিয়ে আরাম করে ঘুমিয়ে পড়লাম আমি ঠোঁটে হাসি নিয়ে। ট্যানাস আর নীল বাহিনী যে কী করবে এই আহাম্মক দলের সাথে ভেবে দারুন আনন্দ পেলাম।
সন্ধ্যার দিকে অস্ত্রের ঝনঝনানির শব্দে জেগে উঠলাম আমি। প্রথম আক্রমণে গিয়েছে আরকুন। হৈ হৈ আওয়াজ করে, বর্মে নিজেদের অস্ত্র পিটিয়ে এগিয়ে গেলো তারা। সামান্য সময় পড়ে, দারুন ভীত অবস্থায় আবার ফিরে এলো শত্রুর গায়ে একটা আঁচড়ও কাটে নি তাদের কারো অস্ত্র।
আবারো, গালি-গালাজের বিনিময় ঘটলো। এরপর নিজের বাহিনী ছোটালেন রাজা প্রেসটার বেনি-জন। ঠিক একই ফল ঘটলো এবারেও কোনো রকম সংঘর্ষ ঘটলো না দুই বাহিনীর মধ্যে। এভাবেই, দিন কেটে গেলো। অপমান আর গাল-মন্দ; ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া কিন্তু কোনো লড়াই নয়। রাত হতে, দুই দলই বিশ্রামে গেলো । উপত্যকার পাদদেশে ক্যাম্প ফেললাম আমরা, আমাকে ডেকে পাঠালো আরকুন।
কী যুদ্ধ! দারুন উৎসাহের সাথে বললো সে। বহুমাস লাগবে সেটার বেনি জনের, আবারো মাঠের দখল নিতে।
আর যুদ্ধ হবে না কাল? আমি জানতে চাইলাম।
আগামীকাল আমরা আবার সেজেদ-এ ফিরে যাবো। আরকুন জানালো। আমার বিজয়ের পুরো গল্প ফ্লোলে লিখবে তুমি। আমি নিশ্চিত, এমন শোচনীয় পরাজয়ের পর যুদ্ধবিরতি কামনা করবে সেটার বেনি-জন।
