আরকুন বরদাস্ত করবে না। এক দিন ভেবে-চিন্তে শেষমেষ অনুমতি দিলো সে।
প্রথম দিকে প্রহরী থাকতো আমাদের সাথে। পরবর্তীতে একা আমরা দুজন আদর সেজেদের প্রাচীরঘেরা স্থানে ঘুরে বেড়াতাম প্রতি সকাল। কথার যেনো শেষ হবে না মাসারার। মেমননের সমস্ত কথা, গল্প শুনতে চাইলো সে। স্মরন করে করে মেমননের বহু কীর্তি শুনিয়েছিলাম তাকে। বারবার সেগুলো শুনে মুখস্ত হয়ে গেলো মাসারার। পরের বার বলতে গেলে বরং ও-ই আমাকে শুদ্ধ করে দিতে ভুল-ভাল কিছু বলে ফেললে। বিশেষত, কীভাবে ট্যানাস আর আমাকে উন্মত্ত হাতির কবল থেকে বাঁচিয়েছিলো মেমনন–এটা মাসারার ভীষণ প্রিয়। কেমন করে সাহসী বীরের উপাধি পেলো সে, এ-ও বারবার শুনতে সে।
ওর মা-রানি সম্পর্কে বলো আমাকে। এরপর, মিশর সম্বন্ধে বলো। তোমাদের দেব-দেবী, যখন মেমনন ছোটো ছিলো তখনকার কথা বলো না। ঘুরে-ফিরে সেই মেমননে ফিরে যেতো তার কথাবার্তা। আমিও অফুরন্ত বলে পরিবারের কাছ থেকে দূরে থাকার দুঃখ ভুলতাম ।
একদিন সকালে মাসারা বললো, গতকাল এক ভয়ঙ্কর স্বপ্ন দেখেছি আমি। স্বপ্নে দেখলাম, মেমনন এসেছে আমার কাছে; কিন্তু সে কী বোলছে কিছুই বুঝছি না আমি। অবশ্যই আমাকে মিশরীয় ভাষা শেখাবে তুমি, টাইটা। আজ থেকে শুরু।
বুদ্ধিমতী মেয়ে মাসারা। খুব দ্রুতই নিজেদের মধ্যে মিশরীয় বলতে শুরু করলাম আমরা। এখান থেকে পালানোর ব্যাপারে মাঝে-মধ্যেই কথা বোলতাম দু জন।
যদিও বা এই দুর্গ থেকে পালিয়ে যেতে পারো, সাহায্য ছাড়া পর্বতের ভেতর দিয়ে কখনো যেতে পারবে না, আমাকে সতর্ক করে দিয়ে বললো মাসারা। এতো সরু-প্যাচানো পথ। তুমি হারিয়ে যাবে। প্রত্যেক গোত্র নিজেদের মধ্যে যুদ্ধ করছে ওখানে। গুপ্তচর ভেবে তোমার গলা কাটবে এরা।
তাহলে, আমাদের কী করা উচিত?
যদি এখান থেকে পালিয়ে যেতে পারো, আমার বাবার কাছে যাবে। উনি তোমাকে প্রহরী দিয়ে তোমার পরিবারের কাছে পাঠিয়ে দিতে পারবেন। তুমি মেমননকে বোলবে কোথায় আছি আমি। সে নিশ্চই আমাকে উদ্ধার করতে আসবে। এমন আত্মবিশ্বাসের সুরে কথা কটা বলেছিলো মাসারা, আমি ওর চোখে চোখে তাকাতে পারলাম না।
বুঝলাম, নিজের মনের গভীরে মেমননের এমন এক ছবি এঁকেছে সে, যা বাস্তবতার সাথে মেলে না। একজন দেবতার প্রেমে পড়েছে সে–তার মতোই অল্প বয়স্ক, উদ্যমী কোনো তরুণের নয়। আমিই দায়ী এজন্যে। রাজপুত্রের এতো সব গল্প ওকে না বললেই হতো। এই মুহূর্তে বাস্তবতার কথা বলে ওর মন ভাঙতে পারবো না আমি।
যদি তোমার বাবা, প্রেসটার বেনি-জনের কাছে পৌঁছুতে পারি, তিনি ভাববেন আমি হয়তো আরকুনের গুপ্তচর। আমারা মাথা কাটবেন সাথে সাথে, দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার চিন্তায় কথাটা বললাম আমি।
তাকে কী বলতে হবে আমি শিখিয়ে দেবো তোমাকে। ওই কথা শুধু তিনি আর আমি জানি। এতে প্রমাণ হবে তুমি আমার কাছে থেকেই এসেছো।
আর কিছু বলার নেই এখানে। অন্যভাবে চেষ্টা চালালাম আমি।
তোমার বাবার দুর্গে কেমন করে পৌঁছুবো? তুমিই তো বললে, ওই রাস্তা এতো । সোজা নয়।
আমি শিখিয়ে দেবো। তোমার অনেক বুদ্ধি সহজেই মনে রাখতে পারবে।
তততদিনে আমার ছোট্ট রাজকুমারীদের মতো ওকেই ভালোবাসতে শুরু করেছিলাম আমি। ওর মনে আঘাত লাগে–এমন কিছু করা সম্ভব নয় আমার পক্ষে। মাসারা আমাকে এই বয়সের মিসট্রেসকে মনে করিয়ে দেয়।
ঠিক আছে, এখন বলো তাহলে, কেমন করে তোমার বাবার কাছে পৌঁছুবো। এভাবেই, পালানোর পরিকল্পনা শুরু করলাম আমরা। আমার জন্যে মূলত এ ছিলো একটা খেলা, সবসময় মাসারার সাহস বজায় রাখতে সচেষ্ট ছিলাম আমি। সত্যিই এই দূর্গম দুর্গ থেকে পালিয়ে যাওয়া সম্ভব বলে আমার মনে হয়না।
একটা লম্বা দড়ি তৈরি করে, ওটা বেয়ে নিচে নেমে যাওয়ার কথা বললাম আমরা। মাদুরের নিচে লুকিয়ে রাখা কাপড় থেকে উল সংগ্রহ করে দড়ি বানাতে লাগলো মাসারা, চুপিচুপি। আমি ওকে বলি নি, আমাদের ওজন সইতে পারে, এমন দড়ি তৈরি সম্ভব নয় ওটা থেকে।
দীর্ঘ দুই বছর আদবার সেজেদের উচ্চতায় পরিকল্পনা করে চললাম আমরা। পালিয়ে যাওয়ার একটা মাত্র উপায়ও খুঁজে বের করতে পারি নি। কিন্তু কখনো বিশ্বাস ভাঙে নি মাসারার। প্রতিদিন সে আমার কাছে জানতে চাইতো, মেমনন আমার সম্পর্কে কী বলেছিলো? আবার বলো, কি প্রতিজ্ঞা করেছিলো সে?
ও বলেছিলো, আমি তোমার জন্যে ফিরে আসবো। সাহস রেখো।
ঠিক। বলল, আমি সাহসী নই, টাইটা?
আমার দেখা সবচেয়ে সাহসী মেয়ে তুমি।
বাবার সাথে দেখা হলে কী বলবে, বলোতো দেখি।
আমি ওর নির্দেশ মতো কথাগুলো উচ্চারণ করতাম। আর পালনের পরবর্তী পরিকল্পনা নিয়ে উৎসাহভরে বলতো ও।
ছোট্ট চড়ুই পাখিগুলো, যেগুলো চাতালে আমার হাত থেকে খুঁটে খায়, ওগুলোর একটাকে ধরবো আমি। আমার বাবাকে একটা চিঠি লিখবে তুমি, কোথায় আছি জানিয়ে । চড়ুইয়ের পায়ে বেঁধে ওটাকে ছেড়ে দেবো আমরা।
ওটা আরকুনের কাছে উড়ে যাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। আমাদের আর দেখা করতে দেবে না সে। কোনো লাভ হবে না।
শেষপর্যন্ত অবশ্য দারুন এক ঘোড়ার পিঠে চড়ে আদবার সেজেদ থেকে বের হয়েছিলাম আমি। রাজা প্রেসটার বেনি-জনের সাথে আরো একটি যুদ্ধে নেমেছিলো আরকুন। ব্যক্তিগত চিকিত্সক এবং ভোম খেলোয়ার হিসেবে তার সাথে থাকার নির্দেশ ছিলো আমার উপর।
