পাথুরে একটা প্রকোষ্ঠ, অন্ধকার, শুকনো। খোলা অগ্নিকুরে ধোয়া দেয়াল কালো করে ফেলেছে, সামান্যই তাপ পাওয়া যাচ্ছে ওটা থেকে। গরম উলের কাপড় পরেও কোনোদিন শীতের হাত থেকে রক্ষা পাই নি আমি আদবার সেজেদ-এর সংকীর্ণ প্রকোষ্ঠে। নীলের সূর্যালোক আর প্রাণপ্রিয় মিশরের উজ্জ্বল মরুদ্যানের স্বপ্নে বিভোর থাকতাম সবসময়। ট্যানাস, মেমনন, আমার ছোট্ট রাজকুমারীদের কথা ভেবে রাতে চোখ ভিজে আসতো।
মাঝে-মধ্যে আমাকে ছেড়ে দেয়ার জন্যে অনুরোধ করতাম আরকুনকে।
কেননা এখান থেকে চলে যেতে চাইছে, টাইটা?
আমার পরিবার আছে, তাদের কাছে ফিরতে চাই।
আমিই তোমার পরিবার এখন, হাসতো আরকুন। আমিই তোমার পিতা।
তার সাথে শর্ত ছিলো, একটানা একশ দান ডোম খেলায় যদি জিততে পারি আমি, নীলের সমতলে প্রহরা দিয়ে আমাকে পাঠানোর ব্যবস্থা করবে। শততম খেলায় যেদিন জিতলাম, মুচকি হেসে আরকুন বললো, একশ বলেছিলাম নাকি? মনে হয় না। নির্ঘাত এক হাজার হবে, তাই না? পাশের প্রহরীর উদ্দেশ্যে জানতে চাইতো সে, এক হাজারের কথা ছিলো না?
এক হাজার! এক বাক্যে স্বীকার গেলো সে। এক হাজারের কথাই ছিলো হুজুর।
দারুন কৌতুক মনে করেছিলো তারা ব্যাপারটাকে। খেলতে অস্বীকৃতি জানালে নগ্ন করে ঝুলিয়ে রাখতো দুর্গের বাইরের দেয়ালে, যতক্ষণ পর্যন্ত না আবারো খেলতে বসতে রাজী হই।
আমার নগ্ন দেহ দেখে অট্টহাসতো আরকুন। হতে পারে, ডোম খেলায় তোমার জুড়ি নেই, কিন্তু মনে হয় নিজের আসল ঘুটি হারিয়ে ফেলেছো তুমি, ওহে মিশরীয়! ধরা পড়ার পর সেই প্রথম আমার অঙ্গহানীর কথা প্রকাশ হয়ে পড়লো। আবারো, লোকে নপুংসক বলতে লাগলো আমাকে।
অবশ্য, এর ফলে লাভই হলো আখেরে। যদি একজন সত্যিকারের পুরুষ হোতাম, কখনোই মাসারার প্রকোষ্ঠে আমাকে যেতে দিতো না তারা।
*
একরাতে আমাকে ঘুম থেকে জাগিয়ে আসার প্রকোষ্ঠে নিয়ে গেলো প্রহরীরা। খড়ের তৈরি একটা মাদুরের উপর শুয়ে ব্যথায় পেটে চেপে ধরে গোঙাচ্ছিলো তরুণী। বমি করে ভাসিয়ে ফেলেছে। প্রচণ্ড ব্যথায় থেকে থেকে মুচড়ে উঠছে।
দ্রুত নিচু হয়ে তাকে পরীক্ষা করে দেখলাম আমি। ভেবেছিলাম পাথরের মতো শক্ত হয়ে আছে তার পেট, কিন্তু তা নরম; উষ্ণ। আমার প্রাথমিক ধারণা ভুল, পেটের নাড়ি ফুলে যায়নি এর। যদিও গোঙানি চালিয়ে গেলো মাসারা, আমি নিশ্চিত হলাম এ তার অভিনয়। এরপর, মাসারার চোখের ইঙ্গিতে নিশ্চিত হলাম তার উদ্দেশ্য সম্পর্কে।
যা ভেবেছিলাম, তার চেয়ে খারাপ অবস্থা, গীজ ভাষায় সঙ্গে আসা দুজন মহিলাকে বললাম আমি। ওকে বাঁচাতে হলে আমার ওষুধের বাক্স প্রয়োজন। যাও, এক্ষণ নিয়ে আসো ওটা।
ওরা দরোজার দিয়ে বেরিয়ে যেতে, মাথা নামিয়ে ফিসফিসালাম, দারুন চালাক মেয়ে তুমি। ভালো অভিনেত্রীও বটে। পাখির পালক গলায় ঢুকিয়ে বমি করেছো, তাই না?
আমার উদ্দেশ্যে হেসে প্রতুত্তর করলো মাসারা, আর কোনো উপায় ছিলো না তোমার সাথে দেখা করার। যখন ওই মেয়েলোকগুলোর কাছে শুনলাম, তুমি গীজ বলতে পারো, সাথে সাথেই বুঝেছি আমরা পরস্পরকে সাহায্য করতে পারবো।
তাই যেনো হয়।
বহুদিন একা আছি আমি। কেউ একজনের সাথে কথা বলতে পারলেও ভালো লাগবে। ওর সরলতায় মুগ্ধ হলাম। হয়তো, দুজনে মিলে এখান থেকে পালিয়ে যাওয়ার একটা উপায় খুঁজে বের করতে পারি।
এমন সময় গলিপথ ধরে আসতে থাকা মেয়েলোকগুলোর আওয়াজ পাওয়া গেলো। আমার হাত টেনে ধরলো মাসারা।
বলো, তুমি আমার বন্ধু নও? আসবে না আবার এখানে?
ঠিক আছে। আসবো।
আচ্ছা, তাড়াতাড়ি বলে একটা কথা। কী নাম ছিলো ওর?
কার?
নদীর ধারে প্রথমদিন যে ছিলো তোমার সাথে। তরুণ-দেবতার মতো দেখতে?
ওর নাম মেমনন।
মেমনন! অদ্ভুত ভঙ্গিতে নামটা উচ্চারণ করলো মেয়েটা। কী সুন্দর নাম। তার মতোই।
প্রকোষ্ঠে প্রবেশ করলো মহিলা দু জন। সাথে সাথে সুস্থ পেট চেপে ধরে মরণ চিৎকার দিতে শুরু করলো মাসারা। সহানুভূতির শব্দ করে লতাগুল্মের একটা মিশ্রন খাইয়ে দিলাম আমি ওকে। সকালে আবার দেখে যাওয়ার কথা বলে বেরিয়ে এলাম প্রকোষ্ঠ ছেড়ে।
সকালে উন্নতি ঘটলো মাসারার অবস্থার। বেশ কিছু সময় তার সাথে থাকার সৌভাগ্য হলো। একজন মাত্র মহিলা কিছুক্ষণ থেকে বিরক্ত হয়ে দূরে সরে গেলো। নিচু স্বরে কথা বলে চললাম আমরা দুজন।
মেমনন কিছু একটা বলেছিলো আমাকে। কী, আমি বুঝি নি। কী বলেছিলো সে?
ও বলেছিলো, আমি তোমার জন্যে ফিরে আসবো। সাহস রেখো। আমি ফিরে আসবো তোমার জন্যে।
এটা কেমন করে বোলবে সে। সে তো চেনে না আমাকে, দেখেছেও কয়েক মুহূর্তের জন্যে। মাথা নাড়লো মাসারা। চোখ ভর্তি জল তার। মিথ্যে বলছো, টাইটা? দুঃখে বুকের ভেতরটা ভেঙে যেতে চাইলো আমার।
ও মিশরের যুবরাজ। সম্মানিত ব্যক্তি। কথাগুলো এমনিতে বলে নি মেমনন।
পরদিন যখন আবার দেখতে গেলাম মাসারাকে, প্রথম আমাকে যেটা জিজ্ঞেস করলো সে, তা হলো, আবার বলো, মেমনন কী বলেছিলো আমাকে? কাজেই, মেমননের বলা কথার পুনরাবৃত্তি করতে হলো আমাকে।
আরকুনকে জানালাম, মাসারার অবস্থার উন্নতি ঘটেছে। কিন্তু প্রতিদিন একবার করে বাইরে হাঁটতে দিতে হবে তাকে। এছাড়া তার স্বাস্থ্যের অবস্থা ভালো হবে না । মাসারা ছিলো দারুন মূল্যবান এক বন্দী। তার কোনো রকম ক্ষতি হোক–এটা
