এর তিনদিন পর আবারো বোর্ড বিছিয়ে আমাকে বিপরীতে বসার আমন্ত্রণ জানিয়েছিলো আরকুন। বেচারা বুঝতেও পারে নি, কী অপেক্ষা করছে তার জন্যে।
*
প্রতিদিন গীজ ভাষায় আমার দক্ষতা বাড়তে লাগলো। শেষপর্যন্ত আমাকে আটকে রাখা দলের পরিচয় এবং উপত্যকা আর খাদ পেরিয়ে তাদের অবিরত ভ্রমণের কারণ বুঝতে পারলাম।
আরকুনকে ছোটো করে দেখেছিলাম আমি। সে মোটেও গোত্রপ্রধান নয়–স্বয়ং একজন রাজা। তার পুরো নাম আরকুন গানুচি মারিয়াম সে ছিলো নেসা নাগাস্ত, অর্থাৎ রাজাদের রাজা, ইথিওপিয়ার আকসুম প্রদেশের শাসনকর্তা। পরে জেনেছিলাম, যে কোনো পর্বত-দর কাছে একশ ঘোড়া এবং পঞ্চাশজন পত্নী থাকলে নিজেকে একজন রাজা হিসেবে ঘোষণা করা যায় এখানে।
আরকুনের সবচেয়ে নিকটস্থ প্রতিবেশি রাজা হলো প্রেসটার বেনি-জন। সে-ও নিজেকে রাজার রাজা ঘোষণা করে ইথিওপিয়ার আকসুম প্রদেশের শাসনকর্তা বলে দাবি করে। এদের দুজনের মধ্যে চিরকালীন কোনো শত্রুতা বা লড়াই আছে বলে আমার ধারণা। ইতিমধ্যেই বহু যুদ্ধ সংঘটিত হয়ে গেছে এই দুই গোত্রের মধ্যে।
মাসারা ছিলো প্রেসটার বেনি-জনের সবচেয়ে আদরের কন্যা। আরো একজন গোত্রপ্রধান যে এখনো নিজেকে রাজা বলে ঘোষণা করে নি তার হাতে অপহৃত হয়েছিলো মাসারা। এক ঘোড়া রুপার খণ্ডে বিনিময়ে আরকুনের কাছে মেয়েটাকে বিক্রি করে দিয়েছে সেই গোত্রপ্রধান। এখন আরকুন চাইছে চিরশত্রুর মেয়েকে পণ রেখে রাজনৈতিক সুবিধা অর্জন করতে।
কারো উপর ভরসা রাখতে না পেরে রাজকুমারী মাসারাকে নিজের জিম্মায় রেখেছে আরকুন। আমাদের ক্যারাভান এখন তার শক্তিশালী ঘাঁটিতে ফিরিয়ে নিয়ে চলেছে। আমার খাবার নিয়ে আসা দাসী মহিলাগুলোর কথাবার্তা থেকে এগুলো শুনেছি আমি। যতোদিনে আম্বা কামারায়, পর্বতের উপরে রাজা আরকুন গানুচি মারিয়ামের দুর্গে পৌঁছুলাম; আকসুম প্রদেশের ঘোলাটে রাজনীতির অনেকটাই বোঝা হয়ে গেছে আমার ।
যাত্রার শেষে চলে আসতে ক্যারাভানের ভেতরে নতুন এক উত্তেজনা টের পেলাম। অবশেষে, সংকীর্ণ বাঁক নেওয়া পাহাড়ি পথে একটি আমবায় উঠে এলাম আমরা। এই আম্বা গুলো মূলত কয়েকটি পর্বত অঞ্চলের সমষ্টি, কেন্দ্রিয় ইথিওপিয়ার ভূ-খণ্ড। চ্যাপ্টা মাথা পর্বতের পাশে থেকে খাড়া নিচের উপত্যকায় নেমে গেছে পাথুরে দেয়াল আর একটি পর্বত থেকে আলাদা করেছে নিজেকে।
এক একটি আম্বা প্রাকৃতিক দুর্গ বিশেষ। এর দখল নিতে পারলে কেউ নিজেকে রাজা দাবি করতেই পারে।
আমার পাশে দাঁড়িয়ে দক্ষিণ দিগন্তের পর্বতশ্রেণীর দিকে দিকে দেখালো আরকুন। ওই হলো ঘোড়াচোর, বদমাশ প্রেসটার বেনি-জনের এলাকা। ভয়ঙ্কর ধূর্ত এই শয়তান।
আমি ততোদিনে জেনে ফেলেছি, কেবল অসম্ভব হিংস্রই নয়, দারুন ধূর্ত মানুষ আরকুন স্বয়ং। যদি সে নিজে এই প্রেসটার বেনি-জনকে ধূর্ত উপাধি দিয়ে থাকে, তবে মাসারার বাবা নিঃসন্দেহে মারাত্মক কেউ ।
আম্বা কামারার সমতল অংশ পেরিয়ে এগিয়ে চললাম আমরা, পাথুরে দেয়ালের কিছু বাড়ি-ঘর সমেত ছোটো ছোটো গ্রাম চোখে পড়লো। ধূরা শস্যের মাঠও দেখতে পেলাম। ক্ষেতে কাজ করতে থাকা কৃষকেরা আমাদের ক্যারাভানের লোকেদের মতোই লম্বা অবয়বের বর্বর।
আমবার দূর প্রান্তের পথ বেয়ে আমার দেখা সবচেয়ে নিখুঁত প্রাকৃতিক সুরক্ষার স্থানে উঠে এলো ক্যারাভান। পর্বতের চ্যাপ্টা অংশ থেকে খাদের উপর বেরিয়ে এসেছে সরু একটা প্রলম্বিত অংশ-তলা-নেই এমন গভীর সেই গিরিখাদের উপর দিয়ে চলে গেছে।
হাজার ফুট নিচে ফেনা তুলে বয়ে চলেছে প্রমত্তা নদী। এমন বিপদজনক পথে চড়তে চাইলো না ঘোড়াগুলো, অবশেষে চোখ বেঁধে নিতে হলো জানোয়ারগুলোর । অর্ধেক পথ পেরিয়েই মাথা ঘুরতে আরম্ভ করলো আমার নিচের শূন্যতার দিকে তাকানোর সাহস করে উঠতে পারলাম না। অবশেষে মনের সমস্ত জোর একত্র করে হেঁটে পেরিয়েছিলাম সেই ভয়ঙ্কর বিপদজনক পথ।
সরু প্রাকৃতিক সেতুর ওপারে পাথরের তৈরির কদাকার চেহারার দুর্গ আছে। চামড়ার আচ্ছাদন দিয়ে ঢেকে রাখা হয়েছে সবকটা জানালা। বিশ্রী দুর্গন্ধে পেট উল্টে আসে।
দুর্গের দেয়ালে কারুকাজের মতো করে সাজানো রয়েছে নর-নারীর মৃতদেহ। কোনো কোনোটি এতো আগে ঝোলানো, কঙ্কাল শুকিয়ে সাদা হাড় দেখা যায়। কাকের দল উড়ে বেড়ায় খাদের উপরের আকাশে। গোড়ালি ঝোলানো কিছু কিছু দেহ অবশ্য সামান্য নড়তে দেখলাম। কিন্তু বেশিরভাগ দেহ পঁচে গেছে, চারিদিকের বাতাসে ভারী দুর্গন্ধ।
রাজা আরকুন কাকে বলে তার মুরগির বাচ্চা। কখনো কখনো নিজ হাতে খাবার ছুঁড়ে দেয় সে ওই কদাকার পাখিগুলোকে। হঠাৎই দুর্গের দেয়াল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে নিচের অসীম খাদে পড়ে গেলো একটা দেহ তার চিৎকার প্রতিধ্বনি তুলতে লাগলো পর্বত থেকে পর্বতে। আবার সেজেদ-এ, বাতাস যেখানে গান গায়–এই ধরনের মরণ-চিৎকার ছিলো আমার সবসময়ের সঙ্গী ।
এই নৃশংস মৃত্যু আর প্রতিদিন শাস্তি হিসেবে হাত বা পায়ের কর্তন; নয়তো গরম-লাল লোহা দিয়ে জীভ টেনে বের করা ডোম খেলা বাদে এ-ই ছিলো আরকুনের বিনোদন। নিমর্ম অত্যাচারে আনন্দ পেতে সে হা হা করে অট্টহাসিতে ফেটে পড়তো।
আদবার সেজেদ-এর মূল প্রাঙ্গনে আমাদের ক্যারাভান প্রবেশ করতেই, মহিলা রক্ষিরা টেনে-হিঁচড়ে পাথুরে গলিপথ ধরে বন্দী-প্রকোষ্ঠে নিয়ে গেলো মাসারাকে। আরকুনের কক্ষের কাছের প্রকোষ্ঠে স্থান হলো আমার।
