পায়ে চলার মতো সুস্থ হয়ে উঠতেই ক্যাম্পে চলাফেরা করার অনুমতি দেওয়া হলো আমাকে। কিন্তু, কখনোই চোখের আড়াল হতে দেওয়া হলো না। একজন শসস্ত্র প্রহরী সবসময় আশে পাশে থাকতো। এমনকি একান্ত ব্যাক্তিগত কর্ম-সম্পাদনের সময়ও আমাকে একা থাকতে দেওয়া হতো না।
মাসারার কাছ থেকে দূরে সরিয়ে রাখা হয়েছিলো আমাকে। প্রতিদিনের যাত্রার শুরুতে এবং রাতে ক্যাম্প ফেলার সময় দূর থেকে দেখতে পেতাম তাকে। যাত্রাপথে তার সাথে দেখা হওয়ার কোনো সুযোগই এরা রাখে নি। সব সময় মহিলা প্রহরী নয়তো অস্ত্রধারী জওয়ান মোতায়েন থাকতো ওর ক্যারাভানের পাশে।
যখনই দেখা হতো, তা যতো অল্প সময়ের জন্যেই হোক; খুব কাতর চোখে আমার দিকে চেয়ে থাকে মাসারা, যেনো কিছু করবার আছে আমার, ওর জন্যে। এতে কোনো সন্দেহ নেই, খুব মূল্যবান একজন বন্দী সে। এতো অবিশ্বাস্য সৌন্দর্য ছিলো তার, মাঝে-মধ্যেই আমার চিন্তার জগত দখল করে নিতো মেয়েটা। আমি সিদ্ধান্তে পৌঁছেছিলাম, হয় সে একজন নিরুৎসাহী স্ত্রী জোর করে যাকে বিয়ে দেওয়া হচ্ছে; না হয় কোনো রকম রাজনৈতিক সুবিধা হাসিলের ঘুটি।
এদের ভাষা না জেনে কী ঘটছে, তা বোঝা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। কাজেই ইথিওপিয়ার ভাষা, গীজ শিখতে উঠে-পড়ে লাগলাম।
এমনিতেও জাত সুরকারের কান আমার, একটু বুদ্ধি ঘটালাম তার উপর। আমার চারপাশের কথাবার্তা খুব মনোযোগ দিয়ে শুনতাম, এরপর কথার তাল এবং লয় ধরে ফেললাম। প্রথম দিকে কেবল তাদের সর্দারের নাম উদ্ধার করেছিলাম আমি ব্যাটার নাম ছিলো আরকুন। একদিন সকালে যখন ক্যারাভান যাত্রা শুরু হবে, আরকুন তার ঢাক বাদকদের নির্দেশ দিচ্ছিলো। যতক্ষণ পর্যন্ত না তার কথা শেষ হয়, মনোযোগ দিয়ে শুনলাম, তারপর ঠিক একই ভঙ্গিতে নকল করে শোনালাম কথাগুলো।
বজ্রাহতের মতো আমার কথা শুনলো তারা। তারপর ফেটে পড়লো অট্টহাসিতে। হাসতে হাসতে একেকজন গড়াগড়ি খেলো, চোখে পানি চলে এলো হাসির প্রাবল্যে।
কী বলেছিলাম নিজেও জানি না, তবে নির্ঘাত সঠিক বলেছিলাম।
আমার বলা কথার অংশবিশেষ পরস্পরকে শুনিয়ে দারুন হাসলো তারা। শেষমেষ, শেরাগোল থামতে আমাকে দোষী সাব্যস্ত করেছিলো আরকুন। তার প্রশ্নের উত্তরে ঠিক একই কথা প্রত্যুত্তর করলাম আমি একটা বর্ণও না বুঝলেও ঠিক আরকুনের প্রশ্নটাই উচ্চারণ করেছিলাম আবার।
এবারে যে তুমুল হৈ-হট্টগোল শুরু হলো, তা থামবার নয়। সস্তা রসবোধের অধিকারী বর্বরগুলো হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়লো মাটিতে। একজন তো আগুনে পড়ে গিয়ে হাত পর্যন্ত পুড়িয়ে ফেললো। এমনকি আরকুনও হেসে আমার পিঠ চাপড়ে দিলো। এর পর থেকে ক্যাম্পের প্রতিটি নারী-পুরুষ আমার ভাষা-শিক্ষক হয়ে উঠলো। যে কোনো গীজ শব্দের অর্থ আমাকে বোঝাতে ব্যাকুল ছিলো তারা। ধীরে বিভিন্ন শব্দ এক করে যখন বাক্য তৈরি করার চেষ্টা করতাম, আমাকে শুধরে দিতো তারা।
বেশ ক দিন সময় লেগেছিলো তাদের ব্যাকরণ শিখতে। যা-ই হোক, দশদিনের মাথায় বুদ্ধিদীপ্ত গীজ বলতে শিখে গেলাম আমি। এমনকি, বিশেষ কিছু গালি এবং অভিশাপ দিতেও শিখেছিলাম।
ভাষা শিক্ষার সময় তাদের সংস্কৃতির দিকে তীক্ষ্ণ নজর রাখলাম। একটা ব্যাপার আগেই বুঝেছিলাম, এরা জন্ম-জুয়াড়ি; ভীষণ আগ্রহ নিয়ে বাও-এর মতো একটা খেলা খেলে তারা। তাদের ভাষায় সেই খেলার নাম ডোম–তবে মূলত সেটা ছিলো বাও খেলারই সাধারণ এবং প্রাচীন রূপ। নিয়ম-নীতি প্রায় একই, সামান্য কিছু ঘুটির অদল বদল আছে।
আরকুন নিজে ছিলো সেই খেলার সেরা খেলোয়ার। ভালো করে তার খেলা পর্যবেক্ষণ করে বুঝলাম, সাত ঘুটির ধ্রুপদি ধারাই জানা নেই তার। চার গোলার নিয়মও তার অজানা। এসব নিয়ম না জেনে কোনো বাও খেলোয়ারই তৃতীয় শ্রেণীর মর্যাদাও পায় না। আমি বুঝলাম, আরকুনের উপরে টেক্কা দেওয়ার ক্ষেত্রে এই একমাত্র উপায় আমার কাছে।
পরেবার যখন বোর্ড বিছিয়ে গোঁফে তা দিয়ে নতুন কোনো প্রতিদ্বন্দ্বীর অপেক্ষায় বসেছিলো সে, সামনে এগিয়ে একজনকে কনুইয়ের ধাক্কায় সরিয়ে আরকুনের সামনে আসন-পিঁড়ি হয়ে বসে পড়লাম।
বাজি ধরার মতো কোনো রুপা নেই আমার, আধো গীজ বুলিতে তাকে বললাম আমি। আমি এ খেলা কেবল আনন্দ পাওয়ার জন্যে খেলি।
ভীষণ ভঙ্গিতে মাথা নাড়ে আরকুন। এই খেলায় আসক্ত কারো জন্যে রীতিমতো অপমানসূচক কথা বলেছি আমি। আরকুনের সাথে আমার খেলার খবর রটে যেতে পুরো ক্যাম্প এসে ভীড় করলো বোর্ডের পাশে।
যখন পুব দিকের দুর্গে আরকুনকে তিনটি ঘুটি নিতে দিলাম আমি, এক অপরকে ধাক্কা দিয়ে মুচকি হাসলো তারা। মনে দুরাশা–এতো তাড়াতাড়ি হেরে যাবো আমি। পুবে আর একটি মাত্র ঘুটি গেলে আমার হার নিশ্চিত। দক্ষিণে আমার তৈরি রাখা চারটি হাতির কারণ তারা বুঝতেও পারে নি। ওগুলোকে চালু করে দিতেই দ্রুত খেলার দখল পেতে শুরু করলাম আমি। সহায়হীণ ঘুটিগুলোকে পুরে দুর্গ থেকে আলাদা করে দিলাম এভাবে। ঠেকানোর কোনো উপায় রইলো না আরকুনের হাতে। চারচালে খেলা জিতে নিলাম আমি।
বেশকিছু সময় নীরবে বসে রইলো পাহাড়িরা। আমার ধারণা, নিজের চরম পরাজয়ের পুরো ব্যাপারটা আরকুন তখনো অনুধাবন করে নি। যখন অবশেষে বোধগম্য হলো, হেরে গেছে; ভয়ঙ্কর নীল তলোয়ার হাতে উঠে দাঁড়ালো সে। আমি ভেবেছিলাম, কল্লা পড়তে যাচ্ছে বুছি; পরে দেখি রাগে অস্থির হয়ে খেলার বোর্ডটাকে টুকরো টুকরো করে ফেললো সে। দিগ্বিদিক ছুঁড়ে ফেললো ঘুটিগুলো। এরপর নিজের দাড়ি ছিঁড়তে ছিঁড়তে আমার উদ্দেশ্যে মৃত্যুর হুমকি জানালো জোরে জোরে। উঁচু পাথুরে দেয়ালে লেগে প্রতিধ্বনিত হতে লাগলো তার চিৎকার।
