পরস্পরের সাথে সংঘর্ষ ঘটলো দুই তলোয়ারের ফলার। কিন্তু কোনো আওয়াজ হলো না। নীল তলোয়ারের ফলা সহজেই ভেদ করে গেলো ট্যানাসের হলদেটে-তামার তলোয়ার–যেনো ওটা কোনো নরম চারাগাছের কাণ্ড। কেবল তলোয়ারের হাতল ধরা অবস্থায় এক আঙুলের সমান অবশিষ্ট ফলা সমেত হতবুদ্ধ অবস্থায় দাঁড়িয়ে রইলো ট্যানাস। অল্পের জন্যে ইথিওপিয়ানের পরবর্তী আঘাত থেকে বেঁচে যেতে পারলো সে, কিন্তু বুকের খোলা তুকে আঁচড় কেটে দিয়েছে নীল তলোয়ার। সাথে সাথে রক্ত বেরুতে শুরু করলো ফিনকি দিয়ে।
পালাও, ট্যানাস! চেঁচালাম আমি। না হয় আমরা দুজনেই মারা পড়বো।
আমার কাছেই লড়ছিলো ওরা। কিছুমাত্র না ভেবে দুই হাতে ইথিওপিয়ার সর্দারের পা আঁকড়ে ধরে মাটিতে ফেলে দিলাম আমি।
জড়াজড়ি অবস্থায় ঢালুপথে গড়াতে থাকলাম আমরা দু জন। গড়িয়ে পথ থেকে পরে যাওয়ার আগের মুহূর্তে এক ঝলক দেখলাম ট্যানাসকে; উঁকি মেরে দেখছে ঘাড় ফিরিয়ে। দৌড়াও! মেমননকে দেখো রেখো!
ঝপাৎ করে ঠাণ্ডা জলস্রোতে খসে পড়লাম আমি আর সর্দার। পতনের ধাক্কায় মাথার ভেতরটা এমন ঝাঁকি খেলো, এক মুহূর্তের জন্যে জ্ঞান হারিয়ে ফেললাম আমি। কিছু সময়ের মধ্যেই কয়েকজোড়া কর্কশ হাত পানি থেকে টেনে তুললো আমাকে, তাদের এলোপাথারি মারের চোটে জ্ঞান ফিরে এলো। শেষপর্যন্ত গোত্রপ্রধানের হস্তক্ষেপে প্রাণে বেঁচে গেলাম। টেনে-হিঁচড়ে ক্যাম্পের দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছিলো ওরা আমাকে, এ সময় দেখতে পেলাম আমার ওষুধের বাক্সটা পড়ে আছে পথের উপর। কাঁধে ঝুলানোর ফিতেটা ছিঁড়ে গেছে।
ওটা নিয়ে এসো! যতোটা সম্ভব দৃঢ়তা দেখিয়ে আদেশ দিলাম আমাকে ধরে রাখা বর্বরদের। অট্টহাসিতে ফেটে পড়লেও, সদারের নির্দেশে বাক্সটা নিয়ে নিলো তারা।
আমার পক্ষে হাঁটা সম্ভব নয়। কিছু সময় পর পর বুকের পাজরে লাথি ঝেড়ে মনের ঝাল মিটাচ্ছিলো শয়তানগুলো। আমার উদ্দেশ্যে বা কোথা থেকে এসেছি–এই নিয়ে বিস্তর তর্ক-বিতর্ক চললো তাদের মধ্যে। অচিরেই, ট্যানাস আর মেমননকে ধাওয়া করা দলটা ফিরে এলো ব্যর্থ-মনোরথে। ওরা পালিয়ে যেতে পেরেছে জেনে মনের মধ্যে খুশির হাওয়া বইতে লাগলো আমার।
আরো কিছুক্ষণ লাথি-ঘুষি চললো আমার উপর। অবশেষে সর্দার নিরস্ত্র করলো তাদের। রক্তাক্ত-ক্ষতবিক্ষত অবস্থায় নিথর পড়ে রইলাম আমি। শরীরের শেষবিন্দু শক্তিও নিঃশেষিত।
সবচেয়ে বড়ো তাঁবুর সামনে, নিজের আসনে বসলো ইথিওপিয়ান সর্দার। তলোয়ারের ফলায় আলতো করে হাত বুলিয়ে কৌতূহলী চোখে আমাকে দেখতে লাগলো সে। যদিও মাঝে-মধ্যে বিড়বিড় করে কিছু বলছিলো নিজের লোকেদের, আমার মনে হলো বিপদজনক সময়টা পেরিয়ে এসেছি।
কিছু সময় অপেক্ষা করে, সরাসরি তার উদ্দেশ্যে মুখ খুললাম আমি । বাক্সটা প্রয়োজন আমার। ক্ষতের পরিচর্যা করতে হবে।
কথা না বুঝলেও ইঙ্গিতে আমার কথার ভাবার্থ বুঝে নিয়েছে সর্দার। একজন লোককে আমার ওষুধের বাক্সটা এগিয়ে দিতে নির্দেশ দেয় সে। তার সামনে বসে, বাক্সের ডালা খুললাম আমি। বাক্সের সমস্ত জিনিস মাটিতে ঢেলে তন্নতন্ন করে খুঁজলো সর্দার। যখনই কোনো বিষয়ে প্রশ্ন জাগলো তার মনে, হাতে তুলে ধরে দেখালো আমাকে। আমিও যতোটা পারি আকারে-ইঙ্গিতে বোঝালাম তাকে।
এক শল্যবিদের ছুরি ছাড়া আর কোনো বিপদজনক অস্ত্র বাক্সে নেই দেখে সন্তুষ্ট হলো সর্দার। আমার ধারণা, এগুলো যে চিকিৎসার সরঞ্জাম–এ কথা তার মাথায় আসেনি তখন। এরপর, ইশারায় তাকে দেখিয়ে দিলাম, তীরটা বের করতে হবে আমার পায়ের মাংস থেকে। তলোয়ারের উগা দিয়ে ক্ষতের মুখটা বড়ো করলো সর্দার; এরপর একটানে বের করে ফেললো তীরটা। শল্যবিদের ছুরির সাহায্যে তীরের আটকে যাওয়া মাথাটা ছাড়ালাম আমি। ততক্ষণে ক্যাম্পের অর্ধেক তোক আগ্রহ ভরে দেখছে আমার কাণ্ড।
যে কোনো যুগে, যে কোনো সমাজে চিকিৎসকের এক বিরল সম্মান রয়েছে। এতো চাতুৰ্য্যের সাথে আমাকে কাজ করতে দেখে পুরো ক্যাম্পের মনোভাব পাল্টে গেলো আমার প্রতি।
সর্দারের নির্দেশে একটা তাঁবুতে নিয়ে মাদুরের উপর শুইয়ে দেওয়া হলো আমাকে। মাথার কাছেই রাখা হলো ওষুধের সরঞ্জাম। একজন স্ত্রী লোক গমের তৈরি রুটি, মুরগির ঝোল আর ভারী টক দুধ নিয়ে এলো আমার জন্যে।
সকালে, যখন রওনা হলো পুরো গোত্র, ঘোড়ায় টানা একটা ভুলায় স্থান হলো আমার। বন্ধুর পথে আমাকে টেনে নিয়ে চললো ওয়াগন-টানা ঘোড়া। সূর্যের কোণ দেখে দুঃখে বুকটা ফেটে যেতে চাইলো। অসীম পর্বতের অভ্যন্তরের উঁচু বনাঞ্চলে চলেছে এরা, বুঝলাম চিরকালের জন্যে হয়তো আমার লোকেদের কাছ থেকে দূরে সরে যাচ্ছি। চিকিৎসক হওয়ায় হয়তো প্রাণে মারে নি, কিন্তু এতো মূল্যবান পেশার একজন লোককে কখনোই যেতে দেবে না গোত্র সর্দার। বুঝতে পারলাম, সত্যিই আজ একজন ক্রীতদাসে পরিণত হয়েছি।
৮. যাত্রাপথের ঝাঁকুনি
যাত্রাপথের ঝাঁকুনি সত্ত্বেও আমার পায়ের ক্ষত দ্রুত শুকিয়ে আসতে লাগলো। এতে করে আরো প্রভাবিত হলো গোত্রের লোকেরা। নিজেদের আহত লোকদের খুব শীঘ্রই আমার কাছে নিয়ে এলো তারা।
ছত্রাক সক্ৰমণ সারালাম একজনের। অপর এক বর্বরের হাতের ফোঁড়া কেটে দিলাম। মারামারি করে মাথা ফাটানো দু জনের চামড়া সেলাইও করলাম। এই ইথিওপিয়ানদের একটা সমস্যা হলো যে কোনো ঝামেলা এরা ছুরি হাতে লড়ে সমাধা করতে চায়। ঘোড়া থেকে আছড়ে পড়ে হাত ভাঙা একজনকে যখন সারিয়ে তুললাম, ততদিনে আমি দারুন জনপ্রিয় হয়ে গেছি তাদের মাঝে। সর্দার আমার দিকে শ্রদ্ধার দৃষ্টিতে তাকাতেন; দ্রুতই তার পাত্র থেকে খাবার অধিকার মিললো আমার।
