নরমস্বরে গুঙিয়ে উঠলো মেমনন। ইচ্ছেকৃত নয়, স্রেফ প্রতিক্রিয়া বশত; তীব্র আকর্ষণের এক দুর্বার যন্ত্রণা-মুখর কাতর ধ্বনি। চমকে লাফিয়ে উঠে সরাসরি ওর দিকে চাইলো মেয়েটা। ট্যানাস আর আমার থেকে একটু দূরে, একপাশে দাঁড়িয়ে তখন মেমনন। আমরা দু জনে আড়ালে পড়ে গেলেও, মেয়েটার দৃষ্টিপথে একেবারে সরাসরি সে।
পরস্পরের দিকে তাকিয়ে রইলো ওরা। বিশাল দুই চোখে ভয়, কাঁপছে তরুণী নগ্ন দেহে। আমি ভেবেছিলাম, হয়তো চিৎকার করে দৌড় দেবে সে। পরিবর্তে, কাঁধের উপর দিয়ে ষড়যন্ত্রীর মতো করে পিছনে চাইলো মেয়েটা, যেনো নিশ্চিত হয়ে নিতে চাইছে তাকে অনুসরণ করে আসে নি মহিলারা। এরপর, মেমননের দিকে ফিরে নরম মিষ্টি স্বরে কিছু একটা জানতে চাইলো; হাতের ভঙ্গিতে ফুটে উঠেছে আবেদন।
আমি বুঝছি না, অসহায়ের মতো ভঙ্গি করে ফিসফিসালো মেমনন।
এক পা এগিয়ে, আবারো সেই একই কথা বললো মেয়েটা। এরপরও যখন মাথা নাড়লো রাজপুত্র, এগিয়ে এসে ওর এক হাত ধরে ঝাঁকালো সে। দ্রুত, জরুরি ভঙ্গিতে স্বর উঁচালো। কিছু একটা চাইছে সে রাজপুত্রের কাছে।
মাসারা! একজন পরিচারিকা মেয়েটার গলার স্বর শুনে ফেলেছে। মাসারা! নিঃসন্দেহে, মেয়েটার নাম ওটা। দ্রুত চুপ থাকার নির্দেশ দিয়ে ফিরে যাওয়ার জন্যে ঘুরলো তরুণী। কিন্তু ততক্ষণে ঢাল বেয়ে উঠে এসেছে তার পরিচারিকারা। কলকল করতে করতে উদ্বিগ্ন অবয়বে উঠে এসেই মেমননকে দেখে থমকে দাঁড়িয়ে পড়লো তারা।
এক মুহূর্তের জন্যে নড়লো না কেউ। এরপর, একযোগে চিৎকার শুরু করলো তিনজন স্ত্রী লোক। নগ্ন মেয়েটাকে দেখে মনে হলো, হয়তো দৌড়ে মেমননের পাশে চলে আসবে সে, কিন্তু এক পা এগুতেই দুই পাশ থেকে তাকে ধরে ফেললো দুইজন। এবারে, চারজনে মিলে চেঁচাতে লাগলো তরুণী চেষ্টা করছে হাত ছাড়ানোর।
চলো, পালাই! আমার হাতে টান পড়তেই ট্যানাসের পিছন পিছন ছুটলাম।
নারীকন্ঠের চিৎকার পৌঁছেছে ক্যাম্পের কাছে। পিছনে তাকিয়ে দেখতে পেলাম দলে দলে ছুটে আসছে তারা। একই সঙ্গে লক্ষ্য করলাম, মেমনন আসে নি আমাদের পিছু পিছু। সুন্দরী সেই অচেনা তরুণীর পাশে প্রহরীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে সে।
পূর্ণ-বয়স্ক তিনজন মহিলার সাথে টানা-হেঁচড়ায় ঠিক পেরে উঠছে না মাসারা বা মেমনন।
ট্যানাস! চিৎকার করে ডাকলাম আমি। মেম বিপদে পড়েছে!
দু জনে পিছন ফিরে এসে টেনে নিয়ে চললাম রাজপুত্রকে। নিরাসক্ত ভঙ্গিতে সামনে চললো মেমনন। আমি তোমার জন্যে ফিরে আসবো। কাঁধের উপর দিয়ে মেয়েটার উদ্দেশ্যে চেঁচিয়ে বললো সে। সাহস রেখো। আমি ফিরে আসবো তোমার জন্যে ।
আজকাল যখন কাউকে বলতে শুনি, প্রথম দর্শনে প্রেম বলতে কিছু নেই আপন মনে হাসি আমি। আর মনে করি সেই দিনের কথা, যেদিন মেমনন প্রথম দেখেছিলো মাসারাকে।
মেমননকে ফিরিয়ে নিয়ে আসতে গিয়ে সময় নষ্ট করে ফেলেছিলাম আমরা। পিছুধাওয়াকারীরা বেশ কাছাকাছি চলে এসেছে এখন। সাঁ করে একটা তীর মেমননের কাঁধের পাশ দিয়ে বেরিয়ে গেলো । অল্পের জন্য রক্ষা পেলো রাজপুত্র।
সরু পথে এক সারিতে ছুটছিলাম আমরা। মেমনন সামনে, পেছনে ট্যানাস। সবার শেষে ছিলাম আমি, পিঠের ওষুধের বাক্সের ওজনে ছুটতে অসুবিধা হচ্ছিলো। ক্রমশ পিছিয়ে পড়ছিলাম ওদের থেকে। আরো একটা তীর উড়ে গেলো মাথার উপর দিয়ে, এরপর তৃতীয় একটা তীর সোজা আঘাক করলো আমার পিঠে। ওষুধের বাক্সের কারণে এফেঁড়-ওফোড় হওয়া থেকে রক্ষা পেলাম।
দৌড়াও, টাইটা! ট্যানাস চেঁচালো সামনে থেকে। ওই হতচ্ছারা বাক্সটা ফেলো এবারে! না হয় ধরা পড়ে যাবে!
ততক্ষণে আমার তেকে পঞ্চাশ গজমতো এগিয়ে গেছে সে আর মেমনন। কিন্তু কিছুতেই আমার প্রাণপ্রিয় ওষুধের বাক্স ফেলে রেখে যেতে পারবো না। ঠিক এ সময়ই, আবারো আঘাত হানলো তীর। এবারে আর রক্ষা নেই, উরুর মাংসল এলাকা ভেদ করে ঢুকে গেলো ওটা। উল্টে-পাল্টে পথের উপর পড়ে গেলাম।
টাইটা! ট্যানাস চেঁচিয়ে ডাকলো, তুমি ঠিক আছো? ঢালের গোড়ায় দাঁড়িয়ে পিছন ফিরে আমার অবস্থা দেখলো সে। মেমনন ততক্ষণে চুড়ো টপকে বাঁকের আড়ালে হারিয়ে গেছে।
তীর লেগেছে পায়ে! পাল্টা চেঁচালাম আমি। আমাকে ছাড়াই এগিয়ে যাও। আমি আর হাঁটতে পারবো না!
এক মুহূর্ত অস্বস্তি না করে, ঘুরে ফিরে আসতে লাগলো ট্যানাস। পিছু ধাওয়াকারী লোকেদেরে মধ্যে ইথিওপিয়ান সর্দারও ছিলো, ট্যানাস ফিরে আসতে দেখে গর্জে উঠলো সে। তলোয়ার মাথার উপরে ঘুরিয়ে দ্বন্দ্বযুদ্ধে আহ্বান জানাচ্ছে।
আমার কাছে পৌঁছে গেছে ট্যানাস, ধরে দাঁড় করানোর প্রাণপণ চেষ্টা করলো ও। কোনো লাভ নেই, খারাপ আঘাত পেয়েছি। বরঞ্চ নিজে বাচো! কিন্তু দেরি হয়ে গেছে ততক্ষণে। একেবারে গায়ের উপরে এসে পড়েছে ইথিওপিয়ানরা। আমাকে ফেলে রেখে এক হাতে তলোয়ার বাগিয়ে ধরে ট্যানাস।
ওরা দুই জন পরস্পরের দিকে উন্মত্তের মতো এগিয়ে যায় ট্যানাস আর ইথিওপিয়ার সর্দার। এই লড়াইয়ের ফলাফল সম্পর্কে অবশ্য আমার মনে কোনো সন্দেহ নেই। ট্যানাস মিশরের সেরা তলোয়ারবাজ। একবার যদি সর্দারকে সে মেরে ফেলে, আমাদের কাউকে ছেড়ে দেবে না এরা।
প্রথমে ট্যানাসের মাথা বরাবর ভীষণ এক আঘাত হানলো ইথিওপিয়ান সর্দার। সমমানের কোনো যোদ্ধার বিপরীতে এ বড়ো নাজুক কৌশল–আমি জানি, এবারে একহাতে আঘাত ঠেকিয়ে শরীরের সমস্ত শক্তি এক করে সর্দারের গলা বরাবর প্রিয় মার দেবে ট্যানাস।
