এখানে বেশিক্ষণ থাকতে পারবো না আমরা, নরমস্বরে মনে করিয়ে দিলাম। তাকে। ওরা দেখে ফেলবে আমাদের। ট্যানাসের হাত ধরে টানতে, থেমে পরে নিজের অস্ত্রের দিকে চেয়ে রইলো সে।
চলো, ওদের ঘোড়াগুলো দেখে আসি। তাগাদা দিলাম আমি। অবশেষে নিতান্ত অনিচ্ছায় এগুলো ট্যানাস। মেমননকে আরেক হাতে ধরে ক্যাম্পের চারপাশে বৃত্তকারে ঘুরে খুঁটিতে বাধা ঘোড়াগুলোর কাছে এগিয়ে গেলাম।
ঘোড়ার পালের কাছে পৌঁছুতে অনেকটা ট্যানাসের মতোই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়লাম আমি, ঠিক যেমন নীল তলোয়ার দেখে হয়েছিলো ও। হিকসস্ ঘোড়ার থেকে সম্পূর্ণ আলাদা এরা। অনেক দীর্ঘ, অসাধারণ সুষমা তাদের দেহের শক্তিশালী পেশিতে। মাথা-ঘাড় অনেক বেশি সুন্দর, নাকের ফুটো চওড়া। উজ্জ্বল, বুদ্ধিদীপ্ত টলটলে চোখ।
কী সুন্দর, আমার পাশ থেকে বলে উঠলো মেমনন। দ্যাখো, কী সুন্দর বাঁকানো গ্রীবা!
ট্যানাসের তলোয়ারের প্রতি মোহ আমাদের ঘোড়ার প্রতি আকর্ষণের চেয়ে নিঃসন্দেহে কম।
ও রকম একটা মদ্দা শুধু যদি আমাদেরন মাদী-ঘোড়ার সঙ্গে রাখা যায়, শ্রবণরত কোনো দেবতার উদ্দেশ্যে যেনো আবেদন জানালাম আমি। একটা মাত্র ও রকম ঘোড়া পেলে পুনরুজ্জীবনের আশা ছেড়ে দিতে রাজী আমি!
এমন সময়, একজন ঘোড়া-পরিচর্যাকারী কী যেনো বললো তার পাশের জনকে। রুরে, আমাদের অবস্থানের দিকে তাকিয়ে সোজা এদিকেই আসতে লাগলো সে। এবারে আর আমার তাগাদার প্রয়োজন হলো না, পাথরের আড়ালে ঝট করে মাথা নামিয়ে ধীরে বুকে হেঁটে পিছিয়ে আসতে লাগলাম তিনজনে। নদীর আরো ভাটিতে লুকোনোর ভালো একটা জায়গা পাওয়া গেলো। একবার সেখানে স্থান করে নিতেই নিজেদের মধ্যে তর্কে লিপ্ত হলাম।
ওখানে ফিরে গিয়ে এক হাজার ডেবেন স্বর্ণ সাধবো আমি তাকে, কঠিন স্বরে বললো ট্যানাস। ওই তলোয়ার পেতেই হবে আমাকে।
প্রথমেই তোমাকে মেরে ফেলবে সে। দ্যাখে নি, কেমন আদর করে ধার দিচ্ছিলো ফলায়?
ঘোড়াগুলো! মেমনন এবারে স্বপ্নলু স্বরে বলে উঠে। এমন সুন্দর প্রাণী কেবল স্বপ্নেই দেখা পাওয়া যায়। নির্ঘাত হোরাসের রথ টানে এরা।
এদের দু জনকে তো লড়তে দেখলে, সতর্ক করে দিয়ে বললাম আমি। এরা রক্তপিপাসু বর্বর। কিছু বলার আগেই তোমার পেট ফেঁড়ে ফেলবে। আর তাছাড়া, কী দেবে ওদের? এই মুহূর্তে আমরা ভিক্ষুক বৈ কিছু নই।
রাতের অন্ধকারে তিনটি ঘোড়া চুরি করে সমভূমিতে ফিরে যেতে পারি আমরা, নির্বিকার স্বরে বললো মেমনন। যদিও চিন্তাটা আকর্ষণীয় ছিলো, তথাপি কঠোর স্বরে আমি প্রত্যুত্তর করলাম, তুমি মিশরের রাজপুত্র চুরি তোমার কাজ নয়।
আমার উদ্দেশ্যে দাঁত বের করে হাসলো সে। ও রকম একটা ঘোড়ার বিনিময়ে যে কোনো কিছু করতে রাজী আমি।
এই যখন তর্ক চলছিলো, হঠাৎই নদীর তীর ধরে কাদের যেনো আগমনের শব্দ পাওয়া গেলো। সাথে সাথেই ভালো করে আড়াল নিলাম আমরা।
কাছে চলে এসেছে কণ্ঠস্বর । একদল মেয়ে আমাদের দৃষ্টিপথের মধ্যেই পানির কিনারায় এসে থেমে দাঁড়ালো। তিনজন বয়স্কা মহিলা, সঙ্গে এক তরুণী। মহিলাগুলোকে দেখে পরিচারিকা বলে মনে হলো আমার।
তরুণী মেয়েটা লম্বা, হালকা-পাতলা গড়নের। তার হাঁটার ভঙ্গিটা অনেকটা নীলের মৃদুমন্দ বাতাসে নাড়া খাওয়া প্যাপিরাসের ঝারের মতো মসৃণ। দামী উলের খাটো আলখাল্লা পরনে, হলুদ আর আকাশী সবুজের ডোরাকাটা-হাঁটু পর্যন্ত কাপড় তোলা মেয়েটার। যদিও পায়ে চামড়ার জুতো আছে–আমি নিশ্চিত অত্যন্ত সুন্দর পা জোড়া।
আমাদের লুকোনোর জায়গার ঠিক নিচেই এসে দাঁড়ালো সে। একজন মহিলা তার পরনের কাপড় খুলে দিতে লাগলো। অপর দুইজনে মিলে কাদামাটির পাত্রে তুলে নিতে লাগলো নীলের জল। তখনো দারুন স্রোত নীল নদে, বরফ-শীতল সেই পানিতে নামার সাহস কারো হবে না।
মাথা গলিয়ে মেয়েটার পোশাক খুলে নিলো মহিলা–একেবারে নগ্ন সে এখন। মেমননের শ্বাস আটকে রাখার শব্দ শুনতে পেলাম আমি। তাকিয়ে দেখি, ঘোড়ার কথা। বেমালুম ভুলে গেছে সে।
দুইজন বয়স্ক স্ত্রী লোক পাত্র থেকে জল ঢেলে দিতে থাকলো তরুণীর নগ্ন দেহে। অপরজন ভাঁজ করা কাপড় দিয়ে গা ডলে দিতে লাগলো। মাথার উপরে দুই হাত তুলে ঘুরে ঘুরে দেহের সমস্ত অংশ পরিষ্কার করে দেওয়ার সুযোগ করে দিলো তরুণী। ঠাণ্ডা পানিতে গা শিরশির করে উঠায় চিৎকার করে হাসলো সে। পালিশ-করা চকচকে রুবী পাথরের মতো তার বুকের বৃন্তু দুটো দৃঢ় হয়ে উঠলো পানির স্পর্শে। নিখুঁত গোলাকার, উদ্ধত স্তন দারুন মসৃণ।
চুলগুলো ঘন কোঁকড়া একটা জঙ্গল। একাশিয়া গাছের ভেতরের কাণ্ডের মতো তার গায়ের রঙ, তেল চকচকে। পাহাড়ি এলাকার ঝকঝকে সূর্যালোকে ঝিলিক দিয়ে উঠছে।
সরু, পাতলা নাক; নরম-পূর্ণ ঠোঁট কিন্তু ভারী নয়। বড়ো বড়ো গাঢ় দু চোখ, উঁচু গালের হাড়ের উপর যেনো নিখুঁত মাপে বসান। এতো ভারী পাঁপড়ি যেনো জট পাকিয়ে গেছে। অসামান্য সুন্দরী এই মেয়ে। আর কেবল একজন মানবীর কথা জানি আমি–যে এরচেয়ে বেশি সুন্দরী।
এই সময়, কিছু একটা বললো সে মহিলাদের উদ্দেশ্যে। তারা সরে দাঁড়াতে, লম্বা লম্বা নগ্ন পায়ে ঠিক আমাদের উদ্দেশ্যে এগিয়ে আসতে লাগলো। কিন্তু আমাদের আড়াল-নেওয়া জায়গার আগেই, কাছের একটা বোল্ডারের আড়ালে এসে থামলো সে। এখন আর মহিলারা দেখতে পাবে না মেয়েটাকে। কিন্তু আমাদের পূর্ণ দৃটিসীমার ভেতর রয়েছে সে এখনো। চারিদিকে দ্রুত একবার তাকিয়ে নিলো রূপসী, আমাদের অবস্থান টের পায় নি। সম্ভবত ঠাণ্ডা পানির ফল বসে পড়ে জল-বিয়োগ করতে লাগলো সে।
