দ্বিতীয় দিনেই সবাই টের পেয়েছিলাম, পথ হারিয়েছি আমরা। এখন দিকচিহ্ন হারিয়ে উদভ্রান্তের মতো ঘুরে ফিরছি। আমি মোটামুটি নিশ্চিত এই অভিশপ্ত পর্বতে ক্লান্ত হয়ে প্রাণ হারাতে যাচ্ছি আমরা। এরপর নদীর শব্দ শুনতে পাওয়া গেলো। দুই খাড়াইয়ের মাঝামাঝি পৌঁছে দেখলাম, শিশু নীল নদ এঁকে-বেঁকে চলেছে নিচে। কেবল এ-ই সব নয়। নদীর ধারে কিছু রঙিন তাঁবু দেখা যাচ্ছে, ওগুলোর আশে পাশে মানুষের নড়াচড়া ঠাওর করা যায় দূর থেকে।
সভ্য মানুষ, সাথে সাথেই মন্তব্য করলাম আমি। ওই তাবুর কাপড় সেলাই করে তৈরি করা।
হ্যাঁ, ঘোড়াও দেখতে পাচ্ছি, সায় দিয়ে বললো মেমনন। দূরে, তাঁবুর ধারেই ঘুটিতে বাঁধা রয়েছে বেশ কিছু ঘোড়া।
দ্যাখো! ট্যানাস হাত উঁচিয়ে দেখায়। ওটা নির্ঘাত তলোয়ার নয়তো বর্শার গা থেকে ঠিকরে আশা সূর্যরশ্মির ঝলক। এরা ধাতু নিয়ে কাজ করে।
এরা কারা বুঝতে হবে আগে। এহেন দুর্গম ভূখণ্ডে কারা বসবাস করে, জানতে দারুন আগ্রহী আমি।
নির্ঘাত গলা কাটবে, ঘেৎ করে উঠে ট্যানাস। কেমন করে বুঝেছো, যে স্থানে বসবাস করে সেখানকার মতোই জংলী নয় এরাও? এরও বহু পরে আমরা জেনেছিলাম, তারা ছিলো ইথিওপিয়ার অধিবাসী।
ঘোড়াগুলো অসাধারণ! ফিসফিস করে বললো মেমনন। আমাদেরগুলো এমন লম্বা আর শক্তিশালী নয়। আমাদের উচিত নিচে নেমে একবার দেখে আসা। রাজপুত্র একজন জাত-ঘোড়সওয়ার।
ট্যানাস ঠিক বলেছে, ট্যানাসের সতর্কবার্তা আমার মধ্যে যুক্তি ফিরিয়ে এনেছে ততক্ষণে। হতে পারে, এরা বিপদজনক জংলী; সভ্য মানুষের জিনিসপত্র ব্যবহার করে।
সেই পর্বতের উপরে, পাথরে বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা তর্ক করলাম আমরা তিনজন। শেষপর্যন্ত, কৌতূহলেরই জয় হলো। গাছপালার আড়ালে ঢাল ধরে গুঁড়ি মেরে নেমে এলাম আমরা।
কাছাকাছি এসে পড়তে বোঝা গেলো, এরা লম্বা গড়নের মানুষ, শক্তিশালী; সম্ভবত মিশরীয়দের তুলনায় একটু ভারী। ঘন কালো চুল কোঁকড়া। এদের পুরুষেরা দাড়ি রাখে–আমরা নিয়মিত খৌরি করি। লম্বা ঢোলা আলখাল্লা পরে এরা, খুব সম্ভব উল দিয়ে বোনা ওগুলো উজ্জ্বল রঙের। আমরা সাধারণত খালি গায়ে থাকি, আর তাছাড়া আমাদের আঁটো জামার রঙ সাদা। আমাদের পাতলা স্যান্ডলের বিপরীতে এরা। চামড়ার তৈরি জুতো পরে; মাথায় রঙ-বেরঙের পাগড়ি।
তাঁবুর চারপাশে কাজ করতে থাকা মহিলারা বেশ হাসিখুশি, ঘোমটায় আবৃত নয়। গান গাইতে গাইতে নিজেদের মধ্যে কোনো এক বিচিত্র ভাষায় কথা বলছিলো তারা। দারুন মিষ্টি তাদের কণ্ঠস্বর ।
একদল লোক মিলে কোনো একটা খেলা খেলছে, দেখে আমার কাছে বাও খেলার মতোই মনে হলো। তারস্বরে চেঁচিয়ে বাজি ধরছে, পাথরের ঘুটি চালছে। এক পর্যায়ে দুইজন লোক উত্তেজিত হয়ে দাঁড়িয়ে কোমরে গোজা ছুরি বাগিয়ে ধরলো পরস্পরের দিকে। উন্মত্ত বেড়ালের মতোই লড়তে শুরু করলো তারা ।
এই সময়, এতক্ষণ ধরে একা বসে থাকা তৃতীয় এক ব্যক্তি অলস ভঙ্গিতে আড়ামোড়া ভেঙে উঠে দাঁড়ালো। ঠিক যেনো বিশ্রাম নিতে থাকা চিতার মতো। সামনে এগিয়ে নিজের তলোয়ারের বাড়িতে ছুরি দুটো ফেলে দিলো যুদ্ধরত দুই জনের হাত থেকে। সাথে সাথেই শান্ত হয়ে পড়লো দুই যোদ্ধা।
কোনো সন্দেহ নেই, এই লোকই গোত্রপ্রধান। ভীষণ লম্বা সে ঠিক পাহাড়ি ছাগলের মতো দুর্ধর্ষ আকৃতির। অন্যান্য কিছু বিষয়েও ছাগলের সাথে মিল আছে তার। এতো ঘন আর লম্বা তার দাড়ি, যেনো পাহাড়ি ছাগলের শিং; আকার আকৃতিতে কর্কশ; ভারী বাঁকা নাক, চওড়া মুখে নিষ্ঠুরতার ছাপ। আমার ধারণা, পাহাড়ি ছাগলের মতোই এর গায়েও দারুন গন্ধ আছে।
আচমকা আমার হাত চেপে ধরলো ট্যানাস, ফিসফিসিয়ে বললো, ওদিকে দ্যাখো!
সবার চেয়ে দামী পোশাক পরে আছে গোত্রপ্রধান। লাল এবং নীলের ডোরাকাট আচকান, কানে জ্বলছে মূল্যবান পাথর। কিন্তু কী দেখে উত্তেজিত হয়েছে ট্যানাস, প্রথমটায় ঠাওর করতে পারলাম না।
ওর হাতের তলোয়ার! হিসহিসিয়ে উঠলো ট্যানাস। তলোয়ারটা দ্যাখো একবার!
প্রথমবারের মতো ওটা ভালো করে দেখলাম আমি। আমাদেরগুলোর তুলনায় অনেক লম্বা ছিলো ওটা, হাতলটা নিঃসন্দেহে বিশুদ্ধ স্বর্ণের তৈরি, এতো সূক্ষ কারুকাজ করা, যা আমি এর আগে কখনো দেখি নি।
তবে ট্যানাসের দৃষ্টি কেড়েছে তলোয়ারের ফলা। গোত্রপ্রধানের বাহুর সমান দীর্ঘ–এমন কোনো ধাতু থেকে তৈরি, যা হলুদ তামা বা লাল কপার নয়। অদ্ভুত ঝকমকে রুপালি নীল ওটা ঠিক যেনো নীলের জল থেকে সদ্যতোলা মাছের আঁশের মতো। স্বর্ণের পাত মোড়া।
কী ওটা? ট্যানাস জানতে চায় রুদ্ধশ্বাসে। কী ধাতু এমন চমকায়?
জানি না।
নিজের ভাবুর সামনে আসনে বসলো সর্দার। কোলের উপর তলোয়ারটা ফেলে সামনে রাখা এক টুকরো আগ্নেয় শিলায় তৃপ্ত ভঙ্গিতে ঘষতে লাগলো ওটার ফলা। পাথরের স্পর্শে ঝনঝন আওয়াজ করে উঠলো সেটা–তামা কখনো এমন শব্দ করে না। এ যেনো বিশ্রামরত সিংহের মৃদু গরগর ধ্বনি।
ওটা চাই আমার, ফিসফিস করে বলে ট্যানাস। ওই তলোয়ার হাতে না পাওয়া পর্যন্ত স্বস্তি নেই আমার।
অবাত হয়ে ওর পানে তাকালাম-এমন কণ্ঠস্বরে কখনো কিছু বলতে শুনি নি। ট্যানাসকে। যা বোলছে ঠিক তাই চায় সে। ভীষণ এক আবেগে কাঁপছে তার সর্বাঙ্গ।
