আমাদের সাথে সাথে এঁকে-বেঁকে খাড়া ঢাল ধরে, ঝর্ণার আকৃতিতে এগিয়ে চলেছে নীল নদও। সব সময় অবশ্য আমরা তার গতিপথ অনুসরণ করতে সক্ষম হলাম না। অবশেষে যখন পর্বতের অভ্যন্তরের ভিন্ন দেশে সম্পূর্ণ ঢুকে পড়লাম, কেবল তখনই এই বোকামীর প্রকৃত স্বরূপ বোধগম্য হলো।
দশটি মাল বহনকারী ঘোড়াসহ একশ জন লোক আমরা। অন্তহীন খাদের কিনারে ক্যাম্প ফেলেছিলাম, ট্যানাস আর মেমননের শিকার করা নিত্য-নতুন জন্তুর দেহ বিছিয়ে রাখতাম আগুনের ধারে। এতো বড়ো ছিলো সেই আইবেক্স-এর মাথা, দু জন দাস মিলেও উঁচু করে ধরতে কষ্ট হতো। এরপর, বৃষ্টি শুরু হলো হঠাৎ করেই।
আমাদের চারপাশ ঘিরে রাখা খাড়া দেয়ালের উপরের আকাশ কালো করে মেঘ জমলো প্রথমে। রৌদ্রজ্জ্বল দুপুর থেকে এক লহমায় যেনো গোধূলী নেমে এলো। ঠাণ্ডা, ঝড়ো বাতাসে আমাদের শরীর সিঁটিয়ে গেলো। ভয়ে জড়াজড়ি করে অপেক্ষায় রইলাম আমরা।
এরপর বিদ্যুত চমকের সাথে সাথে শুরু হলো বজ্রপাত। একের পর এক বিশাল পাথরখণ্ড গুড়ো হয়ে গেলো সেই বজ্রপাতে। চারিদিকে গন্ধকের কটু গন্ধ। পাথুরে দেওয়ালে লেগে প্রতিধ্বনি তুলতে লাগলো বজ্রপাতের আওয়াজ যেনো থামবে না কখনো। পায়ের নিচ ভীষণ রকম কাঁপতে লাগলো মাটি।
বৃষ্টি নেমে এলো তারপর। এ কোনো ফোঁটা নয়, মনে হলো নীল নদের গতিপথে অতিক্রম করা কোনো জলপ্রপাত যেনো ঝরে পড়ছে আমাদের উপর। শ্বাস নেওয়ার কোনো উপায় নেই, পানিতে ভরে গেছে নাকের ফুটো, ফুসফুস। আমরা যেনো ডুবে যাচ্ছি। এতো তীব্র বৃষ্টিতে এক হাত সামনে দাঁড়ানো মানুষ চেনার যো নেই। কাছাকাছি পাথরের খোড়লে আশ্রয় নিয়েছিলাম আমরা। বোধ-শক্তি যেনো অবশ হয়ে এলো।
ঠাণ্ডা কী জিনিস–সেদিন টের পেয়েছিলাম । কেবল লিনেন কাপড়ের পাতলা শাল পরে ঠকঠক করে কাঁপছিলাম আমরা। জোর করে চোয়াল চেপে রেখেও দাঁতে দাঁত বাড়ি খাওয়া ঠেকিয়ে রাখতে পারছিলাম না।
তখনই, বৃষ্টির শব্দ ছাপিয়ে নতুন একটা শব্দ ধরা পড়লো আমার কানে। পানির গর্জন ছিলো সেটা। সরু যে উপত্যকায় আমরা আশ্রয় নিয়েছিলাম, গাঢ় ধূসর জলস্রোতে হারিয়ে গেলো সেটা। সামনে যা কিছু পেলো, ভাসিয়ে নিয়ে গেলো সেই জলস্রোত।
উল্টে-পাল্টে, হাবুডুবু খেতে খেতে ভেসে চললাম আমিও। এক পাথর থেকে। অপর পাথরে বাড়ি খেয়ে যেনো প্রাণ বেরিয়ে যাবে; বরফ-ঠাণ্ডা পানিতে মুখ-ভরা। কালো অন্ধকার ঘিরে ধরলো হঠাৎ করেই, মনে হলো মারা গেছি।
আবছাভাবে মনে পরে, কয়েকজোড়া হাত মিলে পানি থেকে টেনে তুলেছিলো আমাকে। তীরে নিয়ে শুইয়ে দেওয়া হলো। রাজপুত্রের কণ্ঠস্বর চিনতে পারলাম আমি। চোখ মেলার আগে ধোয়ার গন্ধ পেলাম, আরাম দায়ক উষ্ণতা দেহের একপাশে।
টাটা, চোখ মেলো! কথা বলো! নাছোড়বান্দা কণ্ঠস্বরে অনেক কষ্টে চোখ খুললাম আমি। আমার মুখের উপর ঝুঁকে আছে মেমনন। চোখ খুলতে দেখে হাসি ফুটে উঠলো ওর ঠোঁটে। ঘাড় ফিরিয়ে, কাঁধের উপর দিয়ে চেঁচালো সে, জেগে উঠেছে ও, লর্ড ট্যানাস!
টের পেলাম, একটা গুহায় আছি আমরা। বাইরে রাত নেমেছে। সাতসতে কাঠের আগুনের ধারে হেঁটে এলো ট্যানাস। বসে পড়লো রাজপুত্রের পাশে।
কেমন আছো, বুড়ো বন্ধু? হাড়-গোড় ভেঙ্গেছে বলে মনে হয় না।
বার দুয়েক চেষ্টা করে উঠে বসলাম আমি। শরীরের সমস্ত অঙ্গ যেনো চিৎকার করে প্রতিবাদ জানালো। মাথা দপদপ করছে। শরীরের সবখানে ব্যথা। এছাড়া, দারুন ক্ষিধে পেয়েছে।
তবে তোমার কিছুই হয় নি, মুচকি হেসে বলে ট্যানাস। কিছুক্ষণ আগে ভাবছিলাম, আমরা কেউ বোধহয় বাঁচবো না। আরো কিছু ঘটার আগেই এই অভিশপ্ত পর্বত থেকে বেরিয়ে যেতে হবে। যেখানে আকাশ থেকে নদী ঝরে পড়ে তেমন একটা স্থানে শিকারে আসার চিন্তাই বোকামী।
বাকিদের কী হলো? জানতে চাইলাম।
মাথা নাড়লো ট্যানাস। সবাই ডুবে মরেছে। এক তোমাকেই পানির স্রোত থেকে টেনে তুলতে পেরেছিলাম আমরা।
আর ঘোড়া?
নেই, তিক্ত স্বরে বললো ট্যানাস। সব শেষ।
খাবার?
কিছু নেই। এমনকি আমার ধনুক পর্যন্ত হারিয়েছি। গায়ের কাপড় আর এই তলোয়ার কেবল সম্বল এখন।
*
সকাল হতে গুহার আশ্রয় ছেড়ে বেরিয়ে এলাম আমরা, ভয়ঙ্কর সেই উপত্যকায় ফিরে চললাম। খাড়া ঢাল ধরে নিচে নেমে আসার পথে আমাদের সঙ্গী ক জনের মৃতদেহ পাওয়া গেলো। বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পর ওখানেই পাথরের উপর এলোমেলো পড়ে আছে ক টা দেই। ঘোড়াগুলোর নিথর দেহও দেখতে পেলাম।
কিছু মূল্যবান সরঞ্জাম সংগ্রহ করা সম্ভব হলো সেখানে। যদিও পানিতে টইটুম্বুর, কিন্তু আমার ওষুধের বাক্সটা অক্ষতই আছে দেখে দারুন খুশি হলাম। ওটার সমস্ত দ্রব্য পাথরের উপর মেলে দিলাম শুকোনোর জন্যে, ঘোড়ার লাগাম কেটে চামড়ার ফিতে তৈরি করলাম কাঁধে ঔষধের বাক্সটা ঝুলানোর জন্য।
এরই মধ্যে নিহত ঘোড়ার দেহ থেকে সামান্য মাংস কেটে আগুনে ঝলসে নিয়েছে মেমনন। পেট ভরে খেয়ে বাকি মাংস সাথে করে নিয়ে নিলাম আমরা। ফিরতি পথে হেঁটে চললাম।
খাড়া পথ, উঁচু-নিচু প্রতিবন্ধক বারবার যাত্রাপথে বাধা হয়ে দাঁড়ালো। এ যেনো ভয়ঙ্কর এক দুঃস্বপ্ন–আমাদের পথচলা কখনো যেনো শেষ হবে না। রক্তাক্ত পা আর চলতে চায় না। এই বনের যেনো কোনো শেষ নেই। প্রতি রাতে সামান্য খড়-কুটো দিয়ে ধরানো ছোট্ট আগুনের পাশে বসে কাঁপতাম আমরা।
