শিলুক পথ-প্রদর্শকদের কাছ থেকে জানা গেলো প্রতিবছরই এক স্থান থেকে কয়েকশ মাইল দূরের অপর কোনো চারণভূমিতে স্থানান্তরিত হয় অ্যান্টিলোপ। শিলুকরা এদের বলে নূ। এর কোনো শেষ নেই। প্রতিবছর কেবল বাড়ছে এদের সংখ্যা। রাজপুত্রকে জানালাম আমি।
তখন আমাদের কেউ বুঝতে পারে নি, এই অ্যান্টিলোপের পাল কত বড়ো সর্বনাশ ডেকে আনছে আমাদের জন্যে। অবশ্য, প্রাণীগুলোর নাকের শ্লেষা দেখে ব্যাপারটা বোঝা উচিত ছিলো আমার। অস্থির আচরণ করছিলো অ্যান্টিলোপের পাল।
যা হোক, জোড়া নদীর ধারে কেবুইয়ে ফিরে রানিকে ন্যূ-এর পালের চলাচলের বিষয়টা জানালাম আমরা। পরবর্তীতে তার নির্দেশে বেশকিছু অ্যান্টিলোপ শিকার করে মাংসের চাহিদা পূরণ করা হলো। এর ঠিক বারোদিন পর, একদিন আতনের সাথে বাও খেলায় বসেছিলাম, এমন সময় হুই ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটে এলো রথ নিয়ে।
টাইটা! একশ গজ দূর থেকে চেঁচিয়ে উঠলো সে। ঘোড়ার পাল! দেবী আইসিস আমাদের প্রতি সদয় হোন! ঘোড়ার পাল শেষ!
ওর কথা শুনতে যতো দেরি, ছুটে রথে চড়ে দ্রুত আস্তাবলে ফিরে চললাম। অর্ধেক ঘোড়া ততক্ষণে মাটিতে শায়িত। প্রথমেই দৌড়ে ধৈর্যের কাছে ছুটে গেলাম আমি। নাক দিয়ে শ্লেষা ঝরছিলো ওর, অবস্থা দেখে শিউড়ে উঠলাম। ঘাড় আর গলা ফুলে ঢোল স্বাভাবিকের দ্বিগুন আকৃতি পেয়েছে ওগুলো । মুখ দিয়ে গড়িয়ে পড়ছে হলুদ পুঁজের ধারা। এ সেই রোগ যা অ্যান্টিলোপের পালের ভিতর দেখেছিলাম আমি। তাপে গা পুড়ে যাচ্ছে ঘোড়াটার। আবেগাপ্লুত আমি বুঝে উঠছিলাম না, কী করা উচিত। ধীরে নিস্তেজ হয়ে আসছিলো ধৈৰ্য্য।
কেউ একজন ঝুঁকে এলো আমার পাশে। একজন শিলুক-গোত্র প্রধান, অত্যন্ত মনোযোগী মানুষ। আমি বন্ধু হিসেবে নিয়েছিলাম তাকে। এ হলো নৃ-দের রোগ, তাদের নিজস্ব ভাষায় সে জানালো আমাকে। অনেক ঘোড়া মরবে। ন্যূ বছর শেষে এলে আমাদের অনেক পশু মরে। যেগুলো বেঁচে যায়, তাদের আর এই রোগ হয়না। তারা নিরাপদ চিরজীবনের জন্যে।
অসুস্থদের বাঁচানোর জন্যে কী করতে পারি, হা বানি? আমার প্রশ্নের উত্তরে মাথা নাড়লো সে এপাশ-ওপাশ।
কিছুই করার নেই।
আমার কোলে মাথা রেখে গেলো ধৈৰ্য্য। সেই হলদেটে-ফাঁস রোগে আমাদের পালের সাত হাজার ঘোড়া মারা গিয়েছিলো সেবার। যেগুলো বেঁচে গেলো, সেগুলোও এতোটা দুর্বল হয়ে পড়েছিলো, বহু মাস ধরে রথ টানার মতো শক্তি ছিলো না। ধৈর্য্যের শাবকটা অবশ্য বেঁচে গেলো, আমার রথের ডানদিকের লাগামটা সে-ই টানতো পরে। এতে শক্তিশালী এবং সহ্যক্ষমতা ছিলো ওর, আমি নাম দিয়েছিলাম অজেয়।
এই মহামারীর ফলে আমাদের মিশরে ফিরে যাওয়ায় কেমন প্রভাব পড়বে? আমার কী জানতে চাইলো একদিন।
বহু বছর পিছিয়ে দিয়েছে ওটা আমাদের, সত্যি কথাটাই বললাম তাকে। আমাদের বেশিরভাগ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ঘোড়া মারা পড়েছে। আবারো রাজকীয়-আস্তাবল গড়ে তোলার জন্যে কাজ করতে হবে আমাদের। রথের সামনে থাকার জন্যে তরুণ ঘোড়াগুলোকে প্রশিক্ষণ দিতে হবে।
পরের বছর চরম আতঙ্ক নিয়ে অ্যান্টিলোপের পালের বার্ষিক স্থান পরিবর্তন অভিযানের জন্যে অপেক্ষা করছিলাম। কিন্তু হা বানির কথাই সত্যি প্রমাণিত হলো । কেবল অল্প কয়েকটি ঘোড়ার হলুদ ফাঁস রোগ দেখা দিয়েছিলো, তা-ও অতোটা ভয়াবহ আকারে নয়। সামান্য কয়েকদিনের মধ্যেই আবারো সুস্থ হয়ে উঠলো ওগুলো ।
সবচেয়ে অবাক করা ব্যপার, প্রথম ন্যূ-এর পালের আগমনের পরে জন্ম নেওয়া অনেক শাবকেরও রোগ দেখা দেয় নি। সম্ভবত মায়ের দুধের সাথে সাথে এই রোগপ্রতিরোধের ক্ষমতাও পেয়ে গেছিলো তারা। আর কখনো মহামারীর ভয়াবহতার সম্মুখীন হতে হয় নি আমাদের।
*
এখন ফারাও-এর সমাধি নির্মাণ তদারকি করেই দিন কাটে আমার। আট হাজার শিলুক শ্রমিকের হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রমে পর্বতের অভ্যন্তরের উপত্যকায় তৈরি হতে লাগলো ফারাও মামোসের সমাধি মন্দির। যখনই কাজ থেকে একটু বিশ্রাম পেতাম, পর্বতের দিকে তাকিয়ে দেখতাম আমি। ওটা যেনো হাতছানি দিয়ে ডাকতো আমাকে। কখনো একা, কখনো বা হুইকে সাথে নিয়ে পর্বতের আনাচে-কানাচে ঘুরে ফিরতাম। দুর্গম পাথুরে পথ, উপত্যকা, গুহা এ সমস্তই দারুনভাবে আকর্ষণ করে আমাকে।
পর্বতের অনেক উপরে যেবার প্রথম আইবেক্স-এর পাল দেখলাম, হুই ছিলো তখন আমার সাথে। এমন প্রজাতির প্রাণী আমি এর আগে দেখি নি। নীল নদের উপত্যকার বুনো ছাগলের চেয়ে দ্বিগুন লম্বা এরা, বৃদ্ধ মদ্দাগুলোর মাথার উপরের বাঁকানো শিং ভীষণ রকম লম্বা।
কেবুইয়ে, জোড়া-নদীর তীরে আমাদের কাফেলায় এই খবর পৌঁছে দিয়েছিলো হুই। অল্প কয়েক দিনের মধ্যেই ধনুক কাঁধে, মেমননকে পাশে নিয়ে ট্যানাস এসে হাজির হলো রাজার সমাধি উপত্যকায়। ঠিক বাপের মতোই শিকারে পারদর্শী হয়ে উঠেছে রাজপুত্র ততোদিনে। আর আমার কথা বললে, শিকারের চেয়ে বুনো-দুর্গম অঞ্চল ঘুরে দেখাতেই বেশি আগ্রহী ছিলাম আমি।
কেবল প্রথম শৃঙ্গ পর্যন্ত এগোনোই ছিলো আমাদের প্রাথমিক সিদ্ধান্ত, কিন্তু ওখানে চড়ে যে দৃশ্য দেখলাম, তাতে মাথা খারাপ হওয়ার জোগাড়। আরো বহু পর্বত গায়ে গায়ে লেগে দাঁড়িয়ে আছে আকাশ পানে তাকিয়ে। ওগুলোর কাছে আমাদের পর্বতশৃঙ্গ একেবারেই বামন আকৃতির। সিংহের মতো হলদেটে-সোনালি রঙ সেগুলোর। উপত্যকার পর উপত্যকা, খাড়াই, মালভূমি এর কোনো সীমা-পরিসীমা নেই।
