আমার ধারণা, অল্প কিছু লোকের মতো আমিও নিরাশ হয়েছিলাম এই সিদ্ধান্তে । আমি দেখতে চাইছিলাম, নদীর এই বাকের পরে কী আছে; কী আছে ওই পাহাড়ের চূড়ার ওপারে। ওদিকে বেশিরভাগ লোকই ততদিনে দীর্ঘযাত্রার ধকলে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলো। আমি আরো ঘুরে দেখতে চাইছিলাম। কাজেই আমার কর্ত্রী যখন ফারাও এর সমাধির উপযুক্ত স্থান খুঁজে বের করার জন্যে রাজকুমার মেমননের রথ-বাহিনীর সহায়তায় এগোনোর অনুরোধ করলো–খুব খুশি হয়েছিলাম। কেবল যাত্রা পথের আনন্দই নয়, রাজপুত্রের সান্নিধ্যও পাওয়া যাবে সেক্ষেত্রে।
চৌদ্দ বছর বয়সেই রাজপুত্র মেমনন সেই অভিযানের অধিনায়ক মনোনীত হয়েছিলো। এ অবশ্য কোনো অস্বাভাবিক ব্যাপার নয়। আমাদের ইতিহাসে অনেক ফারাওই এর চেয়ে কম বয়সে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। রথ-বহর তৈরি হতে রাজপুত্র নিজে পরীক্ষা করে দেখলো প্রতিটি বাহন, ঘোড়া। প্রত্যেকটি রথের জন্যে দুটি করে বাড়তি ঘোড়া বরাদ্দ করা হয়েছিলো, যাতে করে জানোয়ারগুলোকে পালাক্রমে বিশ্রাম দিয়ে দিন-রাত চলতে পারি আমরা।
এরপর আমরা দুজনে মিলে আলোচনায় বসলাম, কীভাবে, কততদূর পর্যন্ত যাওয়া যায়। নিশ্চই এমন একটা স্থান আমাদের খুঁজে বের করতে হবে, কোনোদিনই কোনো সমাধি-চোর যেনো তার নাগাল না পায়।
কুশ দেশে প্রবেশ করার পর থেকে এমন কোনো স্থান আমরা দেখি নি, যা এই কাজের জন্যে উপযুক্ত। সামনে কেমন ভূমি পাওয়া যাবে, তাই নিয়ে গবেষণা চললো । এখন যেখানে দাঁড়িয়ে রয়েছি আমরা, দুই নদীর সংযোগস্থল কেবুই-এ, তা ছিলো আমাদের দীর্ঘ যাত্রাপথের সবচেয়ে মনোরম স্থান।
মনে হয়, পৃথিবীর সমস্ত পাখি যেনো জড়ো হয়েছিলো সেখানে। কি অলঙ্কারপূর্ণ মাছরাঙা, কি রাজকীয় নীল সারস; সূর্যকে আড়াল করে ফেলা বুনোহাঁসের ঝাঁক, বৌ কথা-কও পাখিএর যেনো কোনো শেষ নেই। রুপালি একাশিয়া গাছের ছায়া, দিগন্ত বিস্তৃত সাভান্নাহ্ যেখানে চড়ে বেড়ায় অসংখ্য অ্যান্টিলোপ। মনে হয় এ যেনো সত্যিই কোনো পবিত্র স্থান, যা দেবী নিজে মনোনীত করেছেন। মুক্ত নীল আফ্রিকার আকাশের নিচে নীলের স্রোতধারায় মাছের কোনো অভাব নেই।
ঠিক যেমন একই গর্ভের মাতার দুই সন্তানের আচরণ ভিন্ন হয়, তেমনি এই জোড়া নদীর চরিত্র আর ব্যবহারও একেবারেই ভিন্ন। ডান দিকের শাখা হলদেটে, ধীর; পরিমাণে বেশি জল ধারণ করছে, কিন্তু অপরটির মতো এতো বর্ণনাবহুল নয়। পূর্বদিকের শাখা ছিলো ধূসর-নীল রঙের, উন্মত্ত, স্রোতস্বিনী নিজের সহোদরের সঙ্গে মিলে যাওয়ার জন্যে ছুটে এসেছে যেনো। বহুদূর পর্যন্ত তার সত্তা আলাদা করা যায় মূল নদীর মধ্য থেকে।
কোন্ নদী ধরে যাবো আমরা, টাটা? মেমননের প্রশ্নের উত্তরে শিলুক পথ প্রদর্শনকারীদের ডেকে পাঠালাম আমি।
হলদেটে নদী এসেছে বিশাল, মশা-মাছি ভরা জলাভূমি থেকে যার কোনো শেষ নেই। কোনো মানুষ সেখানে প্রবেশ করতে পারে না। কুমির, জলহস্তি আর বিষাক্ত পোকা-মাকড়ের দেশ সেটা। এমন জ্বর হয় সেই স্থানের বাতাসে, মানুষ চিরকালের জন্যে হারিয়ে যায়, জানালো শিলুকরা।
আর, অন্য নদীটা? আমরা প্রশ্ন করলাম।
গাঢ় রঙের নদী পড়েছে আকাশ থেকে, ভীষণ উঁচু সেই মেঘ-ছোঁয়া পর্বতের উপর থেকে। ওইখানে চড়ে, এমন সাধ্যি নেই কোনো মানুষের।
আমরা বাম দিকের গাঢ়-রঙা নদী ধরেই এগোবো, সিদ্ধান্ত নিলো রাজপুত্র। পাথুরে পর্বতে আমার পিতার চিরন্দ্রিার জন্যে কোনো না কোনো জায়গা অবশ্যই পাওয়া যাবে।
কাজেই, পুব দিকে চললাম আমরা যততক্ষণ পর্যন্ত না দিগন্তে দেখা দিলো পর্বতশৃঙ্গ। এমন উঁচু প্রতিবন্ধক কেউ জীবনেও দেখে নি। যতোই এগুলাম আমরা, প্রতিমুহূর্তে আমাদের দৃষ্টির সামনে আরো উঁচু হতে লাগলো সেই পর্বতশ্রেণী।
কোনো মানুষের পক্ষে ওখানে পৌঁছুনো সম্ভব নয়, চমৎকৃত মেমনন মন্তব্য করে। ওটা নিঃসন্দেহে দেবতাদের বাসস্থান।
পর্বতের উপরে বিদ্যুৎ চমকাতে দেখলাম আমরা। চারপাশের খাড়া পাহাড়ে লেগে ভারী গুমগুম প্রতিধ্বনি তুললো সেই শব্দ। যেনো কোনো পাহাড়ি সিংহ গর্জাচ্ছে।
সেই ভীষণ পর্বতের পাদদেশ পর্যন্ত যেতে পারলাম আমরা। এরপর আর রথ নিয়ে এগুনোর কোনো উপায় নেই। পর্বতের পাদদেশে, খাড়া দেয়ালঘেরা একটা লুকোনো উপত্যকা আবিষ্কার করেছিলাম আমরা। পুরো বিশদিন ধরে আমি এবং রাজপুত্র মিলে পরীক্ষা করে দেখলাম সেই দুর্গম স্থান, এরপর কালো দেয়ালের সামনে দাঁড়িয়ে নরম স্বরে মেমনন বললো, এইখানেই আমার পিতার নশ্বর দেহ চিরকাল শায়িত থাকবে। স্বপ্নপুর, রহস্যময় চোখে উপরে তাকালো সে। মনে হয়, যেনো আমার মাথার ভেতর কথা বোলছেন। তিনি এখানে ভালো থাকবেন।
কাজেই, জায়গাটা পর্যবেক্ষণ করে পাথুরে দেয়ালের গায়ে চিহ্ন এঁকে রাখলাম আমি; পথের নির্দেশনা এবং উপত্যকায় প্রবেশদ্বারের কৌণিক দূরত্ব হিসেব করে রাখলাম রাজমিস্ত্রিদের সুবিধার্থে। এই সমস্ত কাজ শেষ হতে, উপত্যকার গোলকধাঁধা ছেড়ে বেরিয়ে এলাম আমরা। নীলের তীরে, আমাদের নৌবহরের উদ্দেশ্যে ফিরে চললাম।
*
কেবুই থেকে অল্প কয়েকদিনের দূরত্বে সমভূমির উপর রাতের মতো ক্যাম্প ফেললাম আমরা। রাতে ঘুম ভেঙে গেলো অ্যান্টিলোপ হরিণের বিশাল পালের চলাচলের শব্দে। দলে দলে আসছে হরিণের দল, এর যেনো কোনো শেষ নেই। একটির সঙ্গে অপটির অবয়বে কিছুমাত্র অমিল নেই। এ অবস্থায় ঘুমোনো বিপদজনক। তাই গোল হয়ে রথের চারধারে দাঁড়িয়ে রাত পার করলাম আমরা। সকাল হতে দেখা গেলো, হরিণের পালের ধাক্কায় মাটির সাথে মিশে গেছে বেশ কিছু রথ।
