শিলুকদের যুদ্ধমত্ততার প্রমাণ তখনো পাই নি আমরা। হঠাৎই একদিন নদী তীরের একটা গ্রাম থেকে আমাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়লো তারা। ততোদিনে আমাদের ব্যাপারে সতর্ক হয়ে গেছিলো। নিজেদের বাচ্চা-কাচ্চা, মেয়েমানুষ, গবাদি-পশু লুকিয়ে রেখে কাঠের অস্ত্র হাতে নির্ভয়ে ধেয়ে এলো তারা।
সেথের কানের ময়লার দুর্গন্ধের কসম! তাড়া খেয়ে পিছু-হঠে আসা ক্ৰাতাস দাঁত বের করে হেসে ঘোষণা করলো, এই প্রত্যেকটি কালো মানুষ এক-একজন জন্ম যোদ্ধা!
প্রশিক্ষণ দিয়ে অস্ত্র হাতে তুলে দাও, পৃথিবীর যে কোনো দেশের পদাতিক সৈন্য পেরে উঠবে না এদের সাথে। একমত হলো ট্যানাস। তীর ছুঁড়ো না কেউ! যতোজন সম্ভব, জীবিত চাই আমার!
অবশেষে, বহু দৌড়ঝাঁপ শেষে ধরতে পারা গেলো কিছু জংলীকে। এদের মধ্যে সেরা লোকগুলোকে নিজের বাহিনীতে প্রশিক্ষণে লাগিয়ে দিলো ট্যানাস। অল্প কিছুদিনের মধ্যে সেও ওদের ভাষা শিখে গেলো। পরবর্তীতে দেখা গেলো, এখন আর তাড়া করে ধরতে হয় না, নিজেরাই গ্রাম থেকে দলে দলে বের হয়ে এসে বর্শা হাতে ট্যানাসের বাহিনীতে যোগ দিতে লাগলো শিলুকেরা।
লম্বা, তামার প্রান্তওয়ালা বর্শায় তাদের সজ্জিত করেছিলো ট্যানাস, হাতির চামড়া থেকে তৈরি বর্ম, আঁটো জামা আর অসট্রিচের পালকে তৈরি পাগড়িতে দারুন দক্ষ হয়ে উঠলো তারা।
সবাইকে অবশ্য সেনাবাহিনীতে নেওয়া হলো না। বাকিরা গ্যালির দাড়ী হিসেবে চমৎকার উতরে গেলো। আর কেউ কেউ নিয়োগ পেলো রাখাল হিসেবে।
খুব দ্রুতই আমরা জেনে গেলাম, আরো দক্ষিণে বাস করে এদের শত্রু দিকা এবং মান্দারি গোত্র। এরা আরো বর্বর, কিন্তু শিলুকদের মতো যোদ্ধার অনুভূতি নেই । কাজেই, মিশরীয় রথ-বাহিনীর সমর্থনে পায়ে হেঁটে দক্ষিণের গোত্রের সঙ্গে আনন্দের সাথে লড়তে যেতো শিলুকেরা। দিনকা এবং মান্দারি গোত্রের লোকেদের দলে দলে ধরে নিয়ে আসতে লাগলো তারা। ভারী মালামাল বহন এবং অপেক্ষাকৃত মোটা দাগের কাজে তাদের লাগিয়ে দিলাম আমরা।
*
পঞ্চম জলপ্রপাত বেয়ে উঠে এলো জাহাজবহর। সম্পূর্ণ কুশ দেশ এখন উন্মুক্ত আমাদের সামনে। শিলুকদের সহায়তায় এগিয়ে যেতে লাগলাম আমরা। নদীতীর ধরে বিভিন্ন অভিযানে অংশ নিতে লাগলো আমাদের রথ-বাহিনী। আইভরি আর দাস সগ্রহ করে ফিরে আসতো তারা। পুব থেকে আসা একটা শাখানদীর দেখা পেলাম আমরা, নীলের মূল প্রবাহের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। অবশ্য, পানি এখানে একদম কম ছোটো পুকুরের মতো। শিলুকেরা জানালো, মৌসুমের সময় প্রমত্তা নদী হয়ে উঠবে এটা, বন্যার সময় ভীষণ স্রোতস্বিনী এই নদী। আমার তার নাম রাখলাম আটবারা। শিলুক পথ-প্রদর্শনকারীদের সঙ্গে করে নদী ধরে দূর-দূরান্তে স্বর্ণের খোঁজে বাহিনী পাঠিয়ে দিলেন রানি। বেশিরভাগ সময়ই মেমননের রথ সবার আগে আগে চললো। যদিও আমি চাইছিলাম, আরো বেশি সময় পড়াশোনায় মনোনিবেশ করুক সে, কিন্তু তা হওয়ার নয়।
যা হোক, আমার দুই রাজকুমারীকে নিয়ে দুঃখ ভুলতে হলো। তেহুতি এবং বেকাথা প্রতিদিন যেনো আরো বেশি সুন্দরী হয়ে পড়ছে। একজন পিতার মতোই ওদের দেখভাল করতাম আমি। বেকাথার শেখা প্রথম বুলি ছিলো, টাটা। আর, রাতে গল্প না শুনলে তো ঘুমোতেই চাইতো না তেহুতি।
সেটা ছিলো আমাদের অভিযানের শ্রেষ্ঠ সময়। শীঘ্রই স্বর্ণের নমুনা সঙ্গে করে হাজির হলো বাহিনী। স্বর্ণকারেরা পরীক্ষা করে রায় দিলেন, বিশুদ্ধ স্বর্ণ রয়েছে সেই নমুনায়। অভিযাত্রীদের সঙ্গে করে আমি আর ট্যানাস দেখে এলাম আটবারা নদীর কোথা থেকে আসছে এই স্বর্ণ। দিনকা এবং মান্দারি গোত্রের হাজার হাজার দাস রাতদিন খেটে নদীর পানি থেকে নুড়ি-পাথর সংগ্রহ করে নিয়ে আসলো। তারই মধ্যে পাওয়া স্বর্ণ থেকে তৈরি হলো আংটি আর বিভিন্ন অলঙ্কার ।
*
আমাদের দক্ষিণযাত্রায় আরো একটি জলপ্রপাতের দেখা পেয়েছিলাম। ষষ্ঠ এই জলপ্রপাতে চড়তে অবশ্য একটুও সময় লাগলো না, অনায়াসে ওটা পেরিয়ে এলাম আমরা। রথ এবং ওয়াগনগুলো জলপ্রপাতের পাশ দিয়ে ঘুরে উপরের জমিনে উঠে এলো। শেষপর্যন্ত সেই রহস্যময় স্থানে পৌঁছুলাম আমরা, যেখানে দুইটি বিশাল নদী প্রবাহ এক হয়ে সৃষ্টি করেছে আমাদের প্রিয় নীল নদ।
এই সেই স্থান যেটা আমন রার ভবিষ্যতের ছবিতে দেখেছিলো টাইটা। এখানেই হাপি তার জলধারা ঢেলে দিচ্ছেন। এই হলো দেবীর পবিত্র স্থান। রানি লসট্রিস ঘোষণা করলেন। আমাদের যাত্রা শেষ হয়েছে। এইখানেই আমাদের শক্তিশালী করে দেবেন দেবী, যাতে করে মিশরে ফিরে যেতে পারি আমরা। আমি এর নাম দিলাম কেবুই উত্তুরে বায়ুর স্থান। কেননা, এই উত্তুরে বাতাসই তো এতোদূর পর্যন্ত নিয়ে এসেছে আমাদের।
এ হলো পবিত্র স্থান। ইতিমধ্যেই স্বর্ণ আর ভূত্য দিয়ে আমাদের তার আনুকুল্য প্রদর্শন করেছেন দেবী, একবাক্যে স্বীকার গেলো সভাসদ। আর এগুলো না আমরা। এখানেই যাত্রার পরিসমাপ্তি হোক।
এখন কেবল আমার স্বামী, স্বর্গত ফারাও মামোসের সমাধির উপযুক্ত স্থান খুঁজে বের করা বাকি, সিদ্ধান্ত জানালেন রানি। সমাধি নির্মাণ শেষ হতে যখন ফারাও চিরন্দ্রিায় শায়িত হবেন সেখানে, তার কাছে করা আমার শপথ পূর্ণ হবে। এরপর, খুশিমনে আমাদের মিশরে ফিরে যাবো আমরা। একমাত্র তখনই বর্বর হিকসস্দের বিরুদ্ধে লড়তে ফিরে যেতে পারবো আমরা।
