প্রতিবারের মতোই, নৌবহর নোঙর করে, বন্যার অপেক্ষায় নদী তীরে ফসল বুনলো আমাদের কৃষকেরা। কিন্তু বসে না থেকে, বিশাল তৃণভূমির উপর দিয়ে দূর-দূরান্তে রথ ছোটালাম আমরা। দক্ষিণে বড়ো বাহিনী পাঠিয়ে হাতি শিকার করে আইভরি সংগ্রহের নির্দেশ দিলেন রানি। এখন আর অসাবধান নই আমরা, শিখে গেছি কেমন করে উন্মত্ত হাতির পাল থেকে বেঁচে থাকতে হয়। পঞ্চম জলপ্রপাতের ধারে, প্রথম দিনেই একশ সাতটি হাতি শিকার করতে সমর্থ হয়েছিলো আমাদের বাহিনী। মাত্র তিনটি রথ ধ্বংস হয়েছিলো সেই অভিযানে।
পরদিন জাহাজের পাটাতন থেকে যেদিকে দৃষ্টি গেলো, হাতির পালের দেখা পাওয়া গেলো না। দেখা গেলো, বহুদূর পথ অতিক্রম করে দিনের পর দিন ধাওয়া করেও হাতির নাগাল পাওয়া সম্ভব হচ্ছে না। যা দেখে মনে হয়েছিলো অনন্ত আইভরি প্রাপ্তির সমূহ সম্ভবনা, তা মূলত ছিলো ভুল ধারণা। প্রথম শিকার অভিযানে বলা মেমননের একটা কথা মনে পড়ে আজো। ও বলেছিলো, যা মনে হয়, হাতি শিকার ততোটা সহজ কাজ নয়।
তবে দক্ষিণ ঘুরে ফিরে আসা রথ বাহিনী হাতির দাঁতের চেয়েও মূল্যবান সংবাদ নিয়ে এলো আমাদের ক্যাম্পে। মানুষের দেখা পেয়েছে তারা। আমি অবশ্য বহুমাস ধরে ক্যাম্পের বাইরে যাই নি তখন। অনেক দিন ধরেই কাজ করছিলাম রথের চাকা নিয়ে, অবশেষে একটা সমাধান বের করতে পেরেছি। বিভিন্ন কাঠের তক্তা দিয়ে চেষ্টা করে শেষমেষ চূড়ান্ত করেছিলাম ত্রুটিবিহীন চাকা। সেই চাকায় তৈরি আমার প্রথম দশটি রথ দিগ্বিদিক বেকায়দায় ছুটিয়েও চাকা ফাটাতে পারলো না কাতাস আর রেমরেম। ওরা ছিলো আমাদের বাহিনীর সবচেয়ে জঘন্য রথ-চালক।
সেই সেময়েই, বীর আকেরের নেতৃত্বে হাতির পাল ধাওয়াকারী দল ফিরে এলো দক্ষিণ থেকে। তারা জানালো, অনেক দক্ষিণে মানুষের বসতির দেখা পেয়েছে তারা।
প্রথম জলপ্রপাত অতিক্রমের পর থেকেই আফ্রিকান গোত্রভুক্ত লোকের দেখা পাওয়ার আশায় ছিলাম। শত বছর থেকেই কুশ দেশীয় ক্রীতদাস বিকোতে মিশরের বাজারে। নিজ-গোত্রের মানুষেরাই তাদের ধরে অন্যান্য দ্রব্যাদি, যেমন আইভরি, অসট্রিচের পালক, গণ্ডারের শিং আর স্বর্ণের গুঁড়ো সমেত সম্রাটের সীমান্তবর্তী এলাকায় বিক্রি করতো। রানি লসট্রিসের দুটি দাসী মেয়েও একইভাবে গজ-দ্বীপের বাজারে পৌঁছেছিলো।
এখনো একটা ব্যাপার বুঝতে পারি না, কেনো এর আগেই মানুষের দেখা পাইনি আমরা। হয়তো যুদ্ধ বা দাস বিদ্রোহের কারণে আরো ভেতরের অঞ্চলে চলে গিয়েছিলো তারা, ঠিক যেমন হাতির পাল শিকার করে ওগুলোকে আফ্রিকার গভীরে চলে যেতে বাধ্য করেছি আমরা।
সঙ্গে সঙ্গেই পুরোদস্তুর বাহিনী পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিলো ট্যানাস। নিজে নেতৃত্বে রইলো সে। যেহেতু আমি ছাড়া আর কারো রথ-চালনার প্রতি আস্থা নেই তার, আমিও গেলাম সঙ্গে। মেমনন নিজে রইলো একটা রথের দায়িত্বে।
নদী তীরে প্রথম গ্রামে পৌঁছলাম আমরা। জলপ্রপাতের উপর দিয়ে তিনদিনের যাত্রা শেষে। ঘাসের চাপড়া দিয়ে তৈরি অস্থায়ী আবাসগুলোকে আসলে কুঁড়ে বলার যো নেই। সন্ধ্যার দিকে পুরো বাহিনী নিয়ে গ্রাম ঘিরে ফেললাম আমরা। আশ্রয় ছেড়ে বেড়িয়ে আসা মানুষগুলো এতোটাই ভীত আর বিস্মিত ছিলো, কোনো রকম বাধা না দিয়ে ধরা দিলো তারা। পুরুষগুলো লম্বা, পাতলা অবয়বের। আমাদের বাহিনীর যে কারোর চেয়ে অনেক লম্বা তারা, এমনকি ট্যানাসকেও বেশ খাটো মনে হলো তাদের কাছে। ধীরে কয়েকটি দলে ভাগ করতে লাগলো ট্যানাস, ধরা-পড়া কালো লোকগুলোকে।
তাদের মেয়েমানুষগুলোও অত্যন্ত শক্তিশালী এবং স্বাস্থ্যবতী । শক্ত পাছা, ঝকঝকে সাদা সমান দাঁত। প্রাপ্তবয়স্ক প্রতিটি মহিলার কোলে একটা বাচ্চা, হাতে ধরে রেখেছে আরো একজন। এরা ছিলো আমার দেখা সবচেয়ে জংলী মানুষ। কি নারী কি পুরুষ–গায়ে কোনো রকম কাপড় পরে না তারা। কেবল তরুণী মেয়েগুলো কোমড়ে অসট্রিচের পালক জড়িয়ে রাখতো। আমি লক্ষ্য করেছিলাম, প্রতিটি প্রাপ্তবয়স্ক নারীকে জঘন্য বর্বরতার পরিচয় দিয়ে অঙ্গহানী করা হয়েছে। পরে জেনেছিলাম, ছুরির খোঁচায় বা তীক্ষ্ণ বাঁশের ডগা দিয়ে সারা হতো সেই ভয়ঙ্কর অস্ত্রোপচার। তাদের মেয়েদের ক্ষতের দাগ-অলা, কুৎসিত নারী যোনী ছিলো এক একটি গর্তের মতো। তাতে রুপা না হয় হাতির দাঁতের তৈরি গহনা পড়তো তারা। তরুণী মেয়েগুলোকে তখনো অস্ত্রোপচার করা হয় নি। সাথে সাথে সিদ্ধান্ত নিলাম, অদূর ভবিষ্যতে বন্ধ করতে হবে এই জঘন্য আচার । জানি, অনায়াসে মিসট্রেসের সমর্থন পাবো এই ব্যাপারে।
যখন রাজপুত্র মেমনন এদের ধরে নিয়ে আসার অধিকার সম্পর্কে প্রশ্ন তুলেছিলো, আমি উত্তরে বলেছিলাম, এরা জংলী বর্বর, আর আমরা সভ্য জাতি। একজন বাবার যেমন সন্তানের প্রতি দায়িত্ব আছে, তেমনি আমাদেরও দায়িত্ব এদের শিক্ষা দান করা, প্রকৃত দেব-দেবীর পরিচয় দেয়া। নিজেদের পরিশ্রমের বিনিময়ে আমাদের ঋণ ফিরিয়ে দিচ্ছে তারা।
লসট্রিসের দুটি দাসী মেয়েকে নিয়ে আসা হয়েছিলো অভিযানে। প্রায় ভুলতে বসা জংলী ভাষায় আমাদের পক্ষ থেকে প্রথম কোনো রকম যোগাযোগ স্থাপন করলো তারা আফ্রিকার গোত্রভুক্ত জণগোষ্ঠীর সঙ্গে। এতে করে কিছুটা হলেও শান্ত হলো তারা। এমনিতেও সুর ভালো ধরতে পারি আমি, আর তাছাড়া ভাষা নকল করার স্বাভাবিক ক্ষমতা আছে আমার। কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই এদের ভাষা বলতে শিখলাম আমি। জানা গেলো, এরা নিজেদের শিলুক বলে পরিচয় দেয়। কেবল মাত্র পাঁচশো শব্দ আছে। এদের ভাষায়। একটা ফ্রোলে সেগুলো লিখে রাখলাম আমি। পরে ট্যানাসের দাস শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দিলাম সেই ভাষায়। অচিরেই নিজের দাস-বাহিনী থেকে রথ চালনার উপযুক্ত কয়েকজন পেয়ে গেলো ট্যানাস।
