এখানেই প্রথমবারের মতো বৃষ্টির দেখা পেলাম আমরা। যদিও নিম্ন-রাজ্যে বৃষ্টি পড়তে দেখেছিলাম আমি, আমাদের মধ্যে অনেকেই কখনো তা দেখেনি। অবাক বিস্ময়ে মুখ হা, মাথা উঁচিয়ে আকাশ পানে চেয়ে রইলো তারা সাদা বিদ্যুতের ঝলকানির সঙ্গে সঙ্গে আকাশ থেকে নেমে এলো জলের ধারা।
সেই বিপুল পরিমাণ নিয়মিত বৃষ্টির ফসল নতুন এক ভূখণ্ড উন্মোচিত হচ্ছিলো আমাদের সামনে। নীল নদের অপর তীরে বিশাল-বিস্তৃর্ণ তৃণভূমি গ্যালির পাটাতন থেকে যতদূর চোখ পড়ে কেবল সবুজ সমভূমি। সেই চমৎকার তৃর্ণভূমিতে চড়ে বেড়ালো আমাদের ঘোড়ার পাল। রথ নিয়ে যতোদূর ইচ্ছে, ছোটা যায় সেখানে। কোনো পাহাড়, টিলা বা পাথর খণ্ড পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়ে নেই।
কেবল এ-ই সব নয়। প্রচুর গাছ ছিলো সেখানে। সরু যে উপত্যকায় ক্যাম্প ফেলতাম আমরা, নিঃসন্দেহে কোনো কালে বন ছিলো সেখানে কেউ বলতে পারে না। আমরা, মিশরীয়দের কাছে কাঠ অত্যন্ত মূল্যবান। এখন যেখানেই তাকাই আমরা, কেবল গাছ আর গাছ। জলপ্রপাতের দ্বীপগুলোতে যেমন ঘন বনের আকারে জন্মাতো, এখানে তেমন নয়। বিশাল উঁচু গাছের শাখা-প্রশাখা ছড়িয়ে আছে অনেকটা জায়গা নিয়ে। এতো কাণ্ড পড়ে আছে, যা দিয়ে পৃথিবীর সমস্ত দেশের সব নৌবাহিনীর জাহাজ তৈরি করা সম্ভব। যে কোনো সভ্যতা তৈরির সমস্ত উপকরণ মজুত এখানে। আমরা যারা গবাদিপশুর বিষ্ঠায় তৈরি ইটের আগুনে রান্না করে অভ্যস্ত, কাঠের এহেন সহজলভ্যতায় বিস্ময়ে হা হয়ে গেলাম।
কিংবদন্তির সেই কুশ দেশে আমাদের জন্যে আরো বিস্ময় অপেক্ষা করছিলো।
দূর থেকে দেখে প্রথমে ওগুলোকে বিশাল গ্রানাইটের খণ্ড মনে করেছিলাম আমি। হলদেটে সবজ তৃণভূমির উপরে একাশিয়া গাছের ছায়ায় দাঁড়িয়েছিলো তারা। আচমকাই আমাদের দৃষ্টির সামনে নড়তে শুরু করলো পাথর-খণ্ডগুলো!
হাতি! যদিও এর আগে কখনো দেখিনি, কিন্তু এ ছাড়া আর কিছু হতে পারে না। ওগুলো। পাটাতনে দাঁড়িয়ে থাক যোদ্ধারা আমার কথা ঠোঁটে তুলে নেয়।
হাতি! আইভরি! এ হলো সেই সম্পদ, ফারাও মামোস তার সমস্ত সমাধি সম্পদ সত্ত্বেও যা স্বপ্ন দেখতেন। যেদিকে তাকাই, বিরাট হাতির পাল চোখে পড়লো।
হাজারে হাজারে হাতি, শিকারীর দৃষ্টিতে চারিদিকে তাকিয়ে দেখে বললো ট্যানাস। একবার কেবল তাকিয়ে দ্যাখো, টাইটা! এর কোনো শেষ নেই!
সমভূমিতে চড়ে বেড়ায় বহু বন্য প্রাণী। শুধু হাতির পাল নয়, সেখানে আছে অ্যান্টিলোপ হরিণ, গ্যাজেল; এদের কিছু কিছু আমাদের পরিচিত, বাকিদের জীবনেও কখনো দেখিনি। আরো অনেক পরে এই সব চমৎকার প্রাণিকুলের সবার নাম জেনেছিলাম আমরা। কিন্তু সে ভবিষ্যতের কথা। আর এখন, এই বিচিত্র অবাধ জীব জ দর্শনে শিকারের স্পৃহা তুঙ্গে উঠে গেলো ট্যানাসের।
জাহাজ থেকে রথের সরঞ্জাম নামাও, অধৈৰ্য্য ভঙ্গিতে গর্জে উঠে সে। ঘোড়া জুড়ো রথের সাথে। শিকারে যাচ্ছি আমরা!
যদি তখন জানতাম কী বিপদের মুখে পড়তে যাচ্ছি আমরা, কখনো মেমননকে রথের পাদানীতে, আমাদের সাথে নিতাম না। প্রথম হাতি শিকার অভিযানে চললাম আমরা। এদের সম্পর্কে একেবারেই অজ্ঞ আমাদের কাছে ধীর-আয়েশী গতির বোকা প্রাণী মনে হয়েছিলো ওগুলোকে। ভেবেছিলাম একেবারেই সহজ হবে শিকার অভিযান।
আর একটু হলেই চরম মূল্য দিতে হয়েছিলো এই বোকামীর জন্যে। রথ থেকে ছোঁড়া তীরের আঘাতে আহত মদ্দা হাতির দুর্দান্ত গতির ক্ষ্যাপাটে দৌড়ের কাছে দারুণভাবে পরাভূত হয়েছিলো আমাদের রথ। হাতির পায়ের তলায় অল্পের জন্যে চাপা পড়ে জীবন দেয়নি ট্যানাস। চরম বিপদের মুখে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অসীম সাহসিকতার সাথে পিতাকে বাঁচিয়েছিলো মেমনন সেদিন। তার নির্ভয় ঘোড়াচালনা আমাকেও তাক লাগিয়ে দিয়েছিলো। যখন হাতির উন্মত্ত দৌড়ের মুখে পড়ে পালাতে গিয়ে চাকা ফেটে ধ্বংস হয়ে গেছিলো আমাদের রথ; মেমনন নিজে লাগাম কেটে ধৈর্য্যের পিঠে চড়ে আমাদের দুইজনকে জীবিত ফিরিয়ে এনেছিলো।
শেষমেষ অবশ্য তীরের আঘাতে নিহত হলো মদ্দা হাতি। কিন্তু আমরা বুঝেছিলাম, অল্প সংখ্যক লোকবল নিয়ে সামান্য রথ ধনুক দ্বারা হাতি শিকার কোনো বুদ্ধিমানের কাজ নয়। মেমননের সেই বীরোচিত ভূমিকার সবটাই গ্যালির পাটাতন থেকে দেখেছিলো লসট্রিস। উদ্বিগ্ন চোখে পুরোটা সময় তাকিয়েছিলো সে।
অবশেষে যখন ফিরে এলাম আমরা, এক পা মচকে বেশ ক দিনের জন্যে অচল হয়ে পড়েছে ট্যানাস। কিন্তু পিতৃগর্বে উজ্জ্বল তার মুখাবয়ব।
পরদিন সমস্ত সভাষদের সামনে, হোরাসের প্রশ্বাসের পাটাতনে রানি ঘোষণা করলেন, শিকার অভিযানের বীরত্বপূর্ণ কার্যের জন্যে আজ থেকে নীল কুমির বাহিনীর একজন হিসেবে গ্রহণ করা হবে রাজকুমার মেমননকে। দ্বিতীয় শ্রেণীর একজন শিক্ষানবিশ হিসেবে নিজের দায়িত্ব পালন করবে সে। তার বীরত্বের জন্যে সাহসী-হৃদয় পদকে ভূষিত করলাম রাজপুত্রকে।
এই সম্মান যেনো আরো একনিষ্ঠ, আরো পরিশ্রমী করে তুললো মেমননকে। নিয়মিত অধ্যয়ন, আর শরীর কসরতে নিজেকে শক্ত করে গড়ে তুলতে লাগলো রাজকুমার। ভবিষ্যতের ফারাও হিসেবে ওর প্রস্তুতিতে কোনো কমতি রইলো না।
*
নদীপথে আরো একটি জলপ্রপাত পড়লো আমাদের সামনে, পরে বুঝতে পেরেছিলাম পঞ্চম সেই জলপ্রপাত ছিলো যাত্রাপথের সর্বশেষটি। কিন্তু, অপর চারটির মতো আমাদের যাত্রায় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারলো না ওটা। এখন আমাদের চারপাশে বিস্তীর্ণ তৃণভূমি, নদীপথে এগুতে আর বাধ্য নই আমরা।
