অপেক্ষার দিনগুলোতে আগাছা পরিষ্কার করে দ্বীপের মাটিতে শস্য বপন করলাম আমরা। এখানকার জমিন অবশ্য বেশ খাড়া। শস্যের ক্ষেতে পানি দেওয়া বিশেষ কষ্টকর হয়ে উঠলো।
প্রতি সন্ধ্যাতেই রথ নিয়ে ঘুরে বেড়াতাম আমি আর মেমনন। শস্যের করুণ ফলনে চিন্তিত বোধ করছি। এখনো বহু মাইল পথ পড়ে আছে সামনে। কেমন করে খাওয়াবো আমাদের লোকদের? ঠিক মতো সেচকাজ না করতে পারলে দুর্ভিক্ষ দেখা দেবে শীঘ্রই।
জানি না, কেমন করে সেচের জল তোলার জন্যে চাকার কথা মাথায় এসেছিলো আমার। নদীর স্রোতে একদিন ভেসে গেলো আমাদের একটা নৌকা, দু জন লোক ডুবে মরলো। সেই দুর্ভাগ্যজনক ঘটনার সাক্ষী আমি আর মেমনন। এরপরই, রাজপুত্রকে স্রোতের জোর দেখানোর জন্যে রথের একটা চাকা পানিতে ছুঁড়ে দিয়েছিলাম আমি। সাথে সাথে স্রোতের টানে এমন বনবন করে ঘুরতে শুরু করলো
সেটা, দশ বছর বয়সী মেমনন মন্তব্য করেছিলো, টাইটা, চাকার ধারের সঙ্গে পাদানী যুক্ত কার থাকলে তো আরো দ্রুত ঘুরবে সেটা! অবাক বিস্ময়ে ওর দিকে তাকিয়েছিলাম সেদিন। কী অসাধারণ চিন্তাশক্তি অতোটুকু ছেলের।
পরবর্তী পূর্ণিমার আগেই নদীর স্রোতের জোরে ঘুর্ণায়মান চাকা থেকে ছোট্ট কাদামাটির পাত্রে জল তোলার ব্যবস্থা করলাম; উঁচু তীরের উপর তৈরি করা সরু খালের মাধ্যমে সেই জল চলে যাবে শস্যের ক্ষেতে।
ট্যানাস পর্যন্ত মুগ্ধ হলো এই ব্যবস্থায়। খুব চমৎকার, টাইটা। কিন্তু কবে তোমার বিখ্যাত চাকার মতো এটাও ফেটে যাবে হে? আমুদে স্বরে বললো সে। তখন কোনো চাকা ফেটে গেলেই সৈনিকেরা বলে উঠতো, টাইটা গেলো!
যা হোক, ধুররা শস্যের মাঠ ক্রমশই পর্যাপ্ত পানি পেয়ে ঘন সবুজে ভরে উঠলো; সোনালি শীষ নীলের সূর্যালোকে ঝকমক করতে লাগলো। চতুর্থ জলপ্রপাতের কাছে সেই ফসলই শুধু নয়, আরো কিছু পেলাম আমরা। আরো একজন রাজকুমারীর জন্ম দিলেন রানি লসট্রিস। এ যেনো তার বোনের চেয়েও সুন্দরী।
অদ্ভুত ব্যাপারই বলতে হয় রাজকুমারী বেকাথা জন্ম নিয়েছিলো এক মাথা লাল সোনালি চুল নিয়ে। তার স্বর্গত এবং ভূত পিতা, ফারাও মামোস বা মা লসট্রিস কারও চুলের রঙই ওটা নয়। এর কারণ না বুঝলেও, ওর সৌন্দর্যে সবাই মোহিত ছিলো।
রাজকুমারী বেকাথার দুই মাস বয়সে বন্যা এসে গেলো। ততোদিনে বার্ষিক জলপ্রপাত অতিক্রম অভিযানে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি আমরা। এই দুর্গম নদীকে বশে আনার সমস্ত কৌশলই জানা হয়ে গেছে।
*
জলপ্রপাত অতিক্রমের আগেই ভীষণ উত্তেজনার ব্যাপার ঘটলো আমাদের বাহিনীতে। রাজকুমার মেমনন এবং আমি ঘোড়াগুলোর তদারকি করছিলাম, ঠিক সেই সময় নদীর তীর থেকে ভেসে এলো শোরগোলের আওয়াজ।
দ্রুত নৌকায় চড়ে নদী পাড়ি দিয়ে পুব তীরে, ক্যাম্পে পৌঁছুলাম আমি আর মেমনন। দারুন উফুল্ল জনতার ভীড় ঠেলে সামনে এগুলাম, চারিদিকে ক্যাম্পের লোকেদের সাগত সঙ্গিতের মূৰ্ছণা। ভীড়ের কেন্দ্রে ভাঙ্গাচোড়া একটা ওয়াগন, আর কঙ্কালসার কয়েকটি ঘোড়া; সঙ্গে মরুর তাপে পুড়ে কালো হয়ে যাওয়া অভিজ্ঞ কিছু মুখ ।
তুমি আর তোমার ওই জঘন্য মানচিত্রের উপর সেথের অভিশাপ পড়ক, টাইটা! সামনের ওয়াগন থেকে চিৎকার করে আমার উদ্দেশ্যে বললো লর্ড আকের। একটা কথা যদি সত্যি বলতে! প্রায় দ্বিগুন দূরত্ব পাড়ি দিতে হয়েছে আমাদের!
সত্যিই কি নদীর বাঁকের উত্তর দিকে পৌঁছুতে পেরেছিলে? পাল্টা চিৎকার করলাম আমি। উত্তেজনায় কাঁপছি রীতিমতো।
হ্যাঁ, পৌঁছেছি এবং ফিরেও এসেছি! সন্তুষ্টির হাসি হাসলো আকের। নিজের অর্জনে দারুন পরিতৃপ্ত। দ্বিতীয় জলপ্রপাতের কাছেই ক্যাম্প ফেলেছিলাম আমরা, নীল নদ থেকে তাজা মাছ ধরে খেয়েছি। থিবেস প্রত্যাবর্তনের রাস্তা একেবারে নির্ঝঞ্ঝাট।
অভিযাত্রীদলের ফিরে আসা উপলক্ষ্যে ভোজের ঘোষণা দিলেন রানি। লর্ড আকের হলো দিনের আলোচ্য চরিত্র। উৎসবের শুরুতেই তার গলায় প্রশংসার স্বর্ণ শেকল পরিয়ে দিলো লসট্রিস। দশ হাজারের সেরা উপাধিতে ভূষিত করা হলো আকেরকে। এ-ই শুধু নয়, রথ বাহিনীর চতুর্থ বহরের নেতৃত্বও দেওয়া হলো তাকে; প্রতিশ্রুতি করা হলো থিবেস প্রত্যাবর্তনের পর নদীর তীরে একশ ফেদান জমিন দেওয়া হবে তাকে।
যদিও আমার কাছে একটু বাড়াবাড়ি মনে হলো মিসট্রেসের এই আচরণ, তথাপি ওর ধূর্ত রাজ্য পরিচালনায় মুগ্ধ হলাম। বিদ্রোহীদের নেতা, তার সবচেয়ে বড়ো শত্রু আকেরকে বিশ্বস্ত একজন ভূত্যে পরিণত করতে সক্ষম হয়েছিলো লসট্রিস। পরবর্তী দিনগুলোতে বহুবার আকের তার অপরিহার্য তার প্রমাণ দিয়ে রানির সেবায় নিয়োজিত থেকেছিলো। সত্যিই, মিসট্রেসের শাসনক্ষমতা ছিলো তুলানহীন।
লর্ড আকেরের বিদ্রোহের অঙ্কুরেই পরিসমাপ্তি এবং ফিরতি-পথের আবিষ্কার নিশ্চিত হওয়ার পর উত্তেজনা আর সাহসে টগবগ করতে থাকা মিশরীয় বাহিনী সাহসী হৃদয়ে চতুর্থ জলপ্রপাত অতিক্রমে মনোনিবেশ করলো।
*
জলপ্রপাত পেরিয়ে, এক মাসেরও কম সময় এগিয়ে চলবার পর আমরা বুঝতে পারলাম, আমাদের ভাগ্য পাল্টে গেছে। দেবী তার প্রতিজ্ঞা রেখেছেন।
একটা বিষয় পরিষ্কার হয়ে গেলো সবার কাছে, কঠিন দিন পিছনে ফেলে এসেছি আমরা। শেষমেষ, মরুভূমি পিছনে রয়ে গেছে। আমাদের সামনের নদী চওড়া, বিশাল; মসৃণ পানির ব্যাপক বিস্তার বয়ে চলেছে দক্ষিণে। এমন ভূখণ্ডে নিয়ে চলেছে আমাদের, যার সাথে পরিচিত নই আমরা।
