এমনকি, মিশরের জ্ঞানী-গুণী মহৎপ্রাণেরাও নিজেদের মধ্যে আলাপ করতো, এই ভয়ঙ্কর খাড়া জলপ্রপাতের এপাশে আটকে গেছি আমরা। আর নদীর ভাটিতেও ফিরে যেতে পারবো না। দেরি হয়ে যাওয়ার আগেই ফিরে যাওয়া উচিত।
একবার, রাজসভায় শুনলাম একজন লর্ড বোলছেন, এখন যদি এগোই, নির্ঘাত মরুতে মারা পড়বে সবাই। কোনো দিনও মুক্তি পাবে না আমাদের আত্মা।
ধীরে দানা বেঁধে উঠলো অসন্তোষ। তরুণদের নেতৃত্ব দিলো লর্ড মারসেকেটের কনিষ্ঠ পুত্র লর্ড আকের। সে সবাইকে সংঘবদ্ধ করতে লাগলো। একবার শুনলাম, আকের ঘোষণা করছে, মৃত রাজার এই বেশ্যা স্ত্রীর হাতে পড়ে শেষ হয়ে যাচ্ছি আমরা। এই মুহূর্তে একজন শক্ত পুরুষ শাসনকর্তার প্রয়োজন। ওই মেয়ের হাত থেকে মুক্তি পেতেই হবে আমাদের।
ট্যানাস আর লসট্রিসকে এ সমস্ত কথা খুলে বলতেই নদীর তীরে জরুরি সভা ডাকা হলো।
রানি লসট্রিস তার ভাষণের শুরুতে বললেন, আমি জানি, নিজের মাটির জন্যে কেমন খারাপ লাগছে আপনাদের। এই দীর্ঘ যাত্রা নিয়ে আপনাদের উদ্বেগের কথাও আমার অজানা নয়। আমি নিজেও সবার মতোই থিবেসে প্রত্যাবর্তনের স্বপ্ন দেখি।
কটাক্ষপূর্ণ দৃষ্টি বিনিময় কোররো আকের এবং বিদ্রোহী তরুণেরা।
যাই হোক, রানি বলে চলেন, হে মিশরের জনগণ, যা মনে হয়, অবস্থা ততো খারাপ নয় মোটেও। হাপি তাঁর প্রতিজ্ঞা অনুযায়ী আমাদের রক্ষা করবেন। আপনাদের ধারণার চেয়েও কাছাকাছি আছি আমরা থিবেস নগরীর। ফিরতি পথে ঠিক যেভাবে এসেছি, সেই দুর্গম পথ অতিক্রম করতে হবে না আমাদের। আবারো এইসব ভয়ঙ্কর জলপ্রপাত পেরুতে হবে না।
হতবুদ্ধি ভাব ফুটে উঠলো আকের সহ সবার চেহারায়। রানি ব্যাখা করে জানালেন, কেমন করে রথের চাকার চিহ্ন থেকে অতিক্রান্ত পথের দূরত্ব হিসাব করে রাখছি আমি। এরপর, সভাষদের সামনে এসে আমার বক্তব্য পেশ করার আহ্বান জানালেন।
মেমননের সহায়তায় নদীর গতিপথ বিশটি স্লোলে নকল করে রেখেছি আমি। নয় বছর বয়স তখন রাজপুত্রের, ততোদিনে দারুন লিখতে শিখে গেছিলো সে।
মাই লর্ড, এই গতিপথ দেখে নিশ্চই বুঝতে পারছেন, দ্বিতীয় জলপ্রপাত অতিক্রমের পর থেকে প্রায় এক হাজার মাইল পথ পাড়ি দিয়েছি আমরা, কিন্তু এই মুহূর্তে ঠিক যে স্থান থেকে যাত্রা শুরু করেছিলাম, সেই স্থান থেকে কয়েক শ মাইলের বেশি দূরত্বে নেই আমরা।
আমার শেখানো মতো উঠে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলো ক্ৰাতাস। তার মানে, মরুর উপর দিয়ে সংক্ষিপ্ত কোনো পথে দ্বিতীয় জলপ্রপাতের ধারে পৌঁছুনো যাবে? এতে করে নিশ্চই সময়ও অনেক কম লাগবে?
ওর দিকে ফিরলাম আমি। এর অর্থ হলো, এখান থেকে কয়েকমাসের মধ্যেই গজ-দ্বীপে ফিরে যাওয়া সম্ভব, কেবলমাত্র আসূনের প্রথম জলপ্রপাত অতিক্রম করতে হবে সেক্ষেত্রে।
আশ্চর্য হয়ে নদীর গতিপথের মানচিত্র পর্যবেক্ষণে মন দিলো প্রত্যেকে। চারিদিকে বিস্ময়ের গুঞ্জন।
এই ক্রীতদাসের হিসাব কতোটা সঠিক? আক্রমণাতৃক স্বরে বলে উঠলো আকের। কাগজের উপরে আঁকি-ঝুঁকি কাটা এক কথা; আর মাইলের পর মাইল মরু পাড়ি দেওয়া একেবারেই ভিন্ন ব্যাপার। এইসব যে সত্য, তার কী প্রমাণ আছে এই দাসের কাছে?
সাহসী যোদ্ধা আকের ভালো কথা বলেছে, আমুদে স্বরে বলে উঠলো আমার কর্ত্রী। মরুর উপর দিয়ে এই পথের উপযুক্ততা পরীক্ষার জন্যে বীর সৈনিকদের একটা দল পাঠানোর অভিপ্রায় আছে আমার রূপসী থিবেসে ফিরে যাওয়ার পথ দেখে ফিরে আসবে তারা। সাথে সাথেই মুখের জ্যোতি নিভে এলো আকেরের। মিসট্রেসের উদ্দেশ্যে বুঝতে পেরে বসে পড়লো সে। কিন্তু লসট্রিস বলে চললো, আমি ভাবছিলাম, কাকে দেওয়া যায় এই দায়িত্ব। কিন্তু এই বিষয়ে নিজের প্রজ্ঞা আর দুশ্চিন্তার কথা প্রকাশ করে লর্ড আকের সেই চিন্তা থেকে মুক্তি দিয়েছেন আমাকে। কী বলেন? এহেন সরাসরি প্রস্তাবে অমত করার সুযোগ নেই আকেরের জন্যে।
আমরা আপনার কাছে কৃতজ্ঞ লর্ড আকের। যতো লোকবল, যা কিছু প্রয়োজন সাথে নিতে পারেন আপনি। আগামী পূর্ণিমার আগেই রওনা হয়ে যাওয়ার হুকুম করছি আমি। এতে করে চাঁদের আলোয় রাতে পথ-চলা সহজ হবে। নক্ষত্র দেখে পথ চিনতে পারে, এমন লোক দিচ্ছি সাথে। একমাসের মধ্যেই আশা করি দ্বিতীয় জলপ্রপাতের কাছে পৌঁছে আবার ফিরে আসতে সক্ষম হবেন আপনি। সেক্ষেত্রে, আমি নিজে বীরশ্রেষ্ঠের পদক পরিয়ে দেবো আপনার গলায়।
হা করে চেয়ে রইলো আকের। আমি নিশ্চিত ছিলাম, কোনো না কোনো অজুহাতে অভিযান এড়িয়ে যেতে চাইবে সে, কিন্তু শেষপর্যন্ত আমাকে অবাক করে দিয়ে দল গঠনের জন্যে আমার পরামর্শ চাইতে এলো আকের। হয়তো আমিই ভুল ভেবেছিলাম তাকে।
আমাদের সেরা কয়েকজন সৈনিক আর ঘোড়া দিয়েছিলাম তাকে। সাথে সেরা পাঁচটি রথ । পূর্ণিমার আগেই বেশ চনমনে, আশাবাদী মনে ঘুরে ফিরতে লাগলো আকের। ওদিকে, দূরত্বের হিসাব কম করে বলায় আত্মদংশনে ভুগছিলাম আমি।
যাত্রার রাতে চাঁদের আলোয় বিদায় জানালাম অভিযাত্রী দলকে। উত্তর দিগন্তের তারাভরা আকাশে ওরা হারিয়ে যাওয়ার আগ পর্যন্ত দাঁড়িয়ে থাকলাম।
চতুর্থ জলপ্রপাতের পাদদেশে যতো দিন ছিলাম, সব সময় আকের এবং তার দলের কথা ভেবেছি আমি। মনে মনে প্রার্থনা করেছি, আমার দেওয়া মানচিত্র যেনো খুব বেশি ভুল না হয়। যা-ই হোক, অন্তত এতে করে বিদ্রোহ তো দমন করা গেছে।
