সেই রাতে যখন ঘুমোনোর তোরজোর করছিলাম, আমাকে ডেকে পাঠালো মিসট্রেস। এতো নিখুঁত ছিলো তোমার স্বপ্ন, আর এতো সুন্দর করে বলেছো ফারাও এসে পড়েন এই ভয়ে রাতে আমার ঘুম হবে না! ভালো করে দরোজা পাহারা দাও। ফিসফিস করে বললো লসট্রিস।
একটা কথা বলতে পারি, এমন একজন একরোখা ব্যক্তি আছে, যে তোমার রাতের শান্তিতে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে, তবে সে ফারাও মামোস নয়–এ ব্যাপারে আমি নিঃসন্দেহ। যদি কোনো মূর্খ বীর তোমার কোমল আর দয়ালু স্বভারে সুযোগ নিতে চায়, কী করা উচিত আমার?
খুব করে ঘুমাবে তখন, প্রিয় টাইটা, আর কান বন্ধ রেখো। প্রদীপের আলোতেও লক্ষ্য করলাম, লজ্জায় লাল হয়ে গেছে লসট্রিসের গাল।
সত্যিই, রাতের ঘটনাবলি সম্পর্কে আমার পূর্বানুমাণ সঠিক প্রমাণিত হলো। সেই রাতে আমার কর্ত্রীর শয্যাপ্রকোষ্ঠে একজন দর্শনার্থী এসেছিলো বটে, তবে সেটা ফারাও
মামোসের ভূত নয়। রানির নির্দেশ মতোই কাজ করেছিলাম আমি তখন, কান বন্ধ রেখে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম।
*
আবারো বান ডাকলো নীল নদে, আমাদের মনে করিয়ে দিলো এক বছর অতিক্রান্ত হয়েছে দেশ ছেড়েছি। সমভূমিতে কৃষকদের বপন করা শস্যের ফসল ঘরে তোলার সময় হয়ে গেছে। রথ-ভেঙে ঘোড়াগুলোকে জড়ো করলাম সবাই মিলে। তারপর তাঁবুর ভেতর জমা করে রাখলাম শস্য। প্রস্তুতি সম্পন্ন হতে, দড়ি-টানা লোক থাকলো বেলাভূমিতে; ঘোড়া আর মানুষের সম্মিলিত পরিশ্রমে আবারো শুরু হলো জলপ্রপাত অতিক্রমের কাজ।
এক মাসের হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম শেষে সেই ভয়ঙ্কর জলপ্রপাত অতিক্রম করতে সক্ষম হয়েছিলাম আমরা। মোলোজন মানুষ ডুবে মরেছিলো, পাঁচটি গ্যালি হারিয়েছিলাম। শেষমেষ, জলপ্রপাত পেরিয়ে উপরের শান্ত জলরাশির উপর দিয়ে তরতর করে ভেসে চললো গ্যালি বহর।
সপ্তাহ, মাস পেরিয়ে যেতে লাগলো, আমাদের জাহাজের খোলের তলায় ধীরে বাঁক নিতে শুরু করেছে নীল নদ। গজ-দ্বীপ ছাড়ার পর থেকেই নদীর গতিপথ লিখে রাখছিলাম আমি। সূর্য আর তারাদের সহায়তা নিয়েছিলাম। কিন্তু অতিক্রান্ত পথের দূরত্ব পরিমাপ করতে দারুন অসুবিধার সম্মুখীন হতে হোচ্ছিলো।
তারপর, হঠাৎ করেই একদিন সমাধান হয়ে গেলো এই সমস্যার। লক্ষ্য করলাম, রথের চাকা একবার ঘুরলে ঠিক তার পরিধির সমান দূরত্ব অতিক্রম করে। এরপর থেকে একটি রথ সব সময় জাহাজের পিছন পিছন তীর ধরে চলতো। চাকায় আঁকানো চিহ্ন দেখে চালক হিসেব রাখতো, কতোবার ঘুরেছে ওটা। আমি টের পেলাম, বিরাট একটা বাঁক ঘুরে নদী আবারো দক্ষিণে নিয়ে চলেছে আমাদের ঠিক হাপির পুরোহিতেরা যা ধারণা করেছিলেন।
ব্যক্তিগত আলাপচারিতার সময় লসট্রিস সব সময় গুরুত্ব দিতো গতিপথের হিসেব রাখার ব্যাপারে। ও বলতো, ভালো করে হিসাব রেখো, টাইটা। ফিরে যাওয়ার সময় রাস্তা খুঁজে পাওয়ার জন্যে বিশ্বস্ত কারো সাহায্য চাই আমাদের। কিন্তু নদীর তীরে কোনো রকম মন্দির বা স্থাপনা তৈরিতে নিজের নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখলো মিশরের রানি।
এভাবেই, অসীম মরুর বুক চিরে ছুটে যাওয়া নীল নদে ভেসে চললো আমাদের কাফেলা। জীবন এগিয়ে চললো উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে। আমাদের অভিযাত্রীরা বেশিরভাগই বয়সে তরুণ। নদীর তীরে নীলের জল ভর্তি পাত্র ভেঙ্গে বিয়ে বসলো অনেকেই। আমাদের চোখের সামনেই বেড়ে উঠতে লাগলো নতুন দিনের সন্তানেরা।
দুর্ঘটনাবশত বা প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মে আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন অনেক বৃদ্ধ-বৃদ্ধা। তরুণ প্রাণও ঝড়ে গেলো কিছু।
উৎসব, পালা-পার্বণ সবই পালন করতাম আমরা নদী তীরে। দেব-দেবীর আরাধনা, সংগীত, আমোদ-ফুর্তি, জ্ঞান-অন্বেষণ কিছুই বাদ গেলো না।
বছর অতিক্রান্ত হওয়ার আগেই দক্ষিণগামী নীল নদের গতিপথে আবারো বাঁধা হয়ে দাঁড়ালো তৃতীয় একটি জলপ্রপাত। আগেরবারের মতোই, তীরে উঠে গেলাম আমরা। সমভূমি পরিষ্কার করে ফসল বপন করলাম। আগামী বন্যা পর্যন্ত এখানেই অপেক্ষা করতে হবে আমাদের।
*
তৃতীয় সেই জলপ্রপাতের সন্নিকটেই আরো একটি আনন্দ জীবন ভরিয়ে দিলো আমার।
নদীর তীরে লিনেন-ঘেরা তাঁবুতে আমার পরিচর্যায় রাজকুমারী তেহুতির জন্ম দিলো লসট্রিস–যে ছিলো মৃত ফারাও মামোসের স্বীকৃত সন্তান।
আমার চোখে যে কোনো অত্যাশ্চর্য ব্যাপারের মতোই অসামান্য সুন্দরী ছিলো রাজকুমারী। যখনই সময় পেতাম, তার দোলনার পাশে বসে মুগ্ধ হয়ে দেখতাম ছোট্ট ছোট্ট হাত-পার নড়াচড়া। ওর ক্ষিধে পেলে মাঝে-মধ্যে কড়ে আঙুল ধরতাম ঠোঁটের সামনে–মায়ের দুধের বোটা মনে করে খুব করে চাবাতো ওটা তেহুতি!
অবশেষে, বন্যার পানিতে উঁচু হলো নদীর পানি। জলপ্রপাত অতিক্রম করলাম আমরা। ধীরে, পুব দিকে বাঁক নিলো নদী, বিশাল এক বাঁক ঘুরে।
বছর শেষের আগেই আরো একবার আমার বিখ্যাত স্বপ্ন দেখতে হলো, কেননা আবারো আমারর কর্ত্রী ঐশ্বরিক কোনো শক্তির প্রভাবে গর্ভবতী হয়ে পড়লো। মৃত ফারাও-এর ভূত এবারেও ধরনা দিয়েছিলো রানির শয্যাকক্ষে।
চতুর্থ জলপ্রপাতের কাছে যতদিনে পৌঁছলাম আমরা, ততোদিনে বিশাল বপুর অধিকারী হয়ে গেছেন রানি। এর আগে যতোগুলো জলপ্রপাত পেরিয়ে এসেছি, এর চেয়ে বিপদজনক নয় কোনোটিই। কুমিরের দাঁতের মতো পাথর-খণ্ডের উপর ঝরে পড়ছে তুমুল জলরাশি–এর ভয়াবহ রূপ দেখে দমে গেলো মিশরীয় বাহিনী। তারা বলাবলি করতে লাগলো, এই পাথুরে প্রতিবন্ধক আমাদের ঘিরে ফেলেছে। দেবতারাই নদীর উপর এ বাধা দিয়েছেন, যাতে করে আর সামনে না যাই আমরা।
