লর্ড মারসেকেট এবং অন্যান্য মহৎপ্রাণেরা রাজ্যের প্রতিনিধি হিসেবে রইলেন। আমন রা এবং ওসিরিসের পুরোহিতেরা থাকলেন ধর্মীয় প্রতিনিধি হিসেবে। লর্ড হেরাব, তাঁর পঞ্চাশ জন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা রইলো সামরিক প্রতিনিধিত্বকারী।
সিংহাসনের নিচে, খোলা পাটাতনে দাঁড়িয়ে জনতার মুখোমুখি হলাম আমি। আজকের দিনের জন্যে বেশ সাজ-গোজ করেছি। পরনে পরিপাটি পোশাক।
সম্মানিত সভাষদ, শুরু করলাম। আমার উদ্দেশ্যে এক গাল হাসলো মেমনন। এখনো ওর কপালে সেই পড়ি আছে। আমার ভ্রুকুটির সামনে দ্রুতই আরো একটু ভাবগম্ভীর হাবভাব ধরলো রাজকুমার।
সম্মানিত সভাষদ, গত রাতে এতো অদ্ভুত আর অসাধারণ স্বপ্ন দেখেছি, যা আপনাদের না বর্ণনা কোরলে দায়িত্বে অবহেলা করা হবে। আপনাদের অনুমতি পেলে শুরু করতে পারি।
উৎফুল্ল চিত্তে প্রত্যুত্তর করলেন রানি। আমাদের সবারই জানা আছে, অসাধারণ ঐন্দ্রজালিক শক্তির অধিকারী তুমি। ভবিষ্যতে উঁকি দেওয়ার ক্ষমতা আছে তোমার–এ তো আমার জানা। স্বপ্ন আর ভবিষ্যতের কথা দেখার মাধ্যমে দেব-দেবীদের অভিপ্রায় জেনে ফেলেছো এর আগেও । তোমার উপর পূর্ণ বিশ্বাস আছে আমার এবং রাজপুত্রের। বলো, কী রহস্য খোলার আছে তোমার?
মাথা ঝুঁকিয়ে, সভাষদের উদ্দেশ্যে আবারো ফিরলাম আমি।
গত রাতে, রাজকীয় কক্ষের দরোজায় প্রহরীর দায়িত্ব পালন করছিলাম। বিছানায় একাই শুয়েছিলেন রানি লসট্রিস; পাশের ছোট্ট বিছানায় রাজকুমার।
এমনকি, লর্ড মারসেকেট পর্যন্ত সামনে ঝুঁকে এলেন; চমৎকার গল্পের সূচনা টের পেয়ে গেছে সবাই।
রাতের তৃতীয় প্রহরে জেগে গেলাম আমি, সমগ্র জাহাজে এক অদ্ভুত আলো জ্বলছিলো। যদিও সমস্ত দরোজা আর ফাঁক-ফোকড় বন্ধ ছিলো, আমি অনুভব করলাম ঠাণ্ডা বাতাস ঝাঁপটা মারছে মুখে।
উৎসাহে নড়ে চড়ে বসলো শ্রোতারা। বুঝলাম, সঠিক ভূতুড়ে আবহ তৈরি হয়েছে।
এরপর, খোলা পাটাতনে পায়ের শব্দ শুনতে পেলাম ধীর, রাজকীয় পায়ে যেনো হেঁটে আসছে কোনো মানুষ। চারিদিকে সেই শব্দেরই প্রতিধ্বনি। নাটকীয় ভঙ্গিতে বিরতি দিলাম কথায়। সেই অপার্থিব পদ-শব্দ আসছিলো জাহাজের ভাড়ার থেকে।
আবারো, থেমে পড়ে সবাইকে গল্প গলাধঃকরণের সুযোগ করে দিলাম।
হাঁ, প্রিয় সভাষদ; সেই শব্দ ভেসে আসছিলো জাহাজের ভাঁড়ারে রাখা স্বর্ণের কফিন থেকে, যেখানে শায়িত আছেন ফারাও মামোস–ওই নামধারী অষ্টম ফারাও।
শ্রোতাদের মধ্যে কেউ কেউ শিউড়ে উঠলো, বাকিরা শয়তানের বিপরীতে চিহ্ন আঁকলো বুকে।
তারপর সেই পদশব্দ রানির শয্যাপ্রকোষ্ঠের দিকে এগিয়ে আসতে শুরু করলো, যার দরোজার কাছেই ঘুমিয়েছিলাম আমি। হঠাৎ সেই পবিত্র আলো যেনো আরো তীব্র হলো, ভয়ে কাঁপছি আমি; এমন সময় আমার সম্মুখে কারো অবয়ব দেখতে পেলাম। একজন মানুষের অবয়ব কিন্তু মানুষ নয়, কোনো মানুষের শরীর এমন পূর্ণিমার চাঁদের মতো জ্যোতি বিলোয় না; তার মুখমণ্ডল আমার চিরপরিচিত ফারাও মামোসের–দেবত্বের পবিত্রতায় উদ্ভাসিত।
নীরবতা নেমে এসেছে শ্রোতাদের মাঝে। একজন মানুষও নড়ছে না। উদ্বিগ্ন চোখে তাদের চেহারায় অবিশ্বাসের চিহ্ন খুঁজলাম আমি পেলাম না।
তখনই চিৎকার করে উঠে নিস্তব্ধতা ভেঙ্গে দিলো একটা কাঁচা কণ্ঠস্বর-রাজপুত্র মেমননের কণ্ঠ সেটা। বা কার! এ যে আমার পিতা! বা কার! উনি ছিলেন ফারাও স্বয়ং!
সেই চিত্তার ঠোঁটে তুলে নেয় হাজারো জনতা। বা কার! ফারাও স্বয়ং এসেছিলেন। তিনি চিরজীবি হোন!
নীরবতা নামার অপেক্ষায় রইলাম আমি; অবশেষে জনতার শোরগোল স্তিমিত হতে আবারো মুখ খুললাম।
আমার উদ্দেশ্যে হেঁটে এলেন ফারাও, নড়তেও যেনো ভুলে গেছিলাম আমি। আমাকে অতিক্রম করে, তার পবিত্র স্ত্রী, রানি লসট্রিসের শয্যাকক্ষে প্রবেশ করলেন তিনি। নড়তে-চড়তে ভুলে গেলেও যা ঘটছিলো, সবই দেখেছি আমি। ঘুমন্ত রানির উপর রাজকীয় ভঙ্গিমায় চড়লেন ফারাও; স্বামী হিসেবে তার পবিত্র প্রেমলীলা সম্পন্ন করলেন। ভালোবাসায় মত্ত হলো তাদের রাজকীয় দেহ–যেনো এক হয়ে গেলো।
এখনো, কারো মুখে একটুও অবিশ্বাসের চিহ্ন নেই। আমার কথার সম্পূর্ণ অর্থ হৃদয়ঙ্গম করতে দিতে আরো কিছু সময় চুপ থাকলাম, এরপর বলে চললাম, ঘুমন্ত রানির বুকের মধ্য থেকে উঠে এলেন ফারাও অবশেষে; তারপর আমার উদ্দেশ্যে বললেন–
যে কারো কণ্ঠস্বর এতো চমৎকারভাবে নকল করতে পারি আমি, অনেকেই ভয় পায়। এখন আমার কণ্ঠ আর আমার নয়, স্বয়ং স্বর্গত ফারাও মামোসের।
আমার দেবত্বের বীজ বপন করে গেলাম রানির অভ্যন্তরে। আমারই মতো এখন থেকে দেবত্ব লাভ করলো সে। আমি ছাড়া আর কারো নয় সে, চিরকাল আমারই থাকবে। রাজকীয় রক্তের সন্তান আবারো পেটে ধারণ করবে রানি। এতদ্বারা সমস্ত পুরুষ জেনে রাখুক, আমার ছায়া তাকে প্রহরা দিচ্ছে প্রতিনিয়ত।
সিংহাসনে উপবিষ্ট রাজ-জোড়ার উদ্দেশ্যে মাথা ঝোকালাম আমি। এরপর, আবারো জাহাজের মধ্য দিয়ে হেঁটে চলে গেলেন রাজা, স্বর্ণের সেই কফিনে ঢুকে পড়লেন ধীরে । বিশ্রাম প্রয়োজন হয়ে পড়েছিলো তার। এ-ই ছিলো আমার স্বপ্ন।
ফারাও চিরজীবি হোন! আমার শেখানো মতো হুঙ্কার দিয়ে উঠলো ট্যানাস, সাথে সাথেই জনতা চিৎকার করে উঠে।
জয় হোক রানি লসট্রিসের। তিনি চিরকাল বেঁচে থাকুন! জয় হোক সেই পবিত্র শিশুর, যাকে তিনি পেটে ধারণ করে আছেন! তার সব সন্তান চিরজীবি হোক!
