শেষ কবে তুমি আর আমি মাছ ধরতে গিয়েছিলাম, টাইটা? জানতে চাইলো আমার কী। যাও, মাছ ধরার সরঞ্জাম নিয়ে এসো। ছোটো একটা নৌকা নেবো আমরা শুধু আমি আর তুমি। সেই পুরোনো দিনের মতো নদীতে মাছ ধরবো আজ দু জনে মিলে।
বিলক্ষণ জানা আছে, মাছ ধরা না ছাই। মূলত আমার কাছে নিভৃতে কিছু একটা বলতে চায় সে; আর কেউ শুনে ফেলার ভয় নেই এমন কোথাও। নিঃসন্দেহে, বড়ো রকমের গণ্ডগোল হয়েছে একটা।
শুকনো নদীর স্থির সবুজ পানিতে দাঁড় বেয়ে চললাম আমি যতক্ষণ পর্যন্ত না বাকের আড়ালে হারিয়ে গেলো আমাদের জাহাজ-বহর। কোনো কথা বলছে না মিসট্রেস। অগত্যা বাঁশি তুলে নিলাম হাতে। লসট্রিসের অত্যন্ত প্রিয় কয়েকটি গানের সুর বাজিয়ে শোনালাম। ওর মুখ খোলার অপেক্ষায় আছি।
শেষমেষ যখন আমার পানে তাকালো ও, দেখলাম, উদ্বেগ আর আনন্দের মিশ্র অনুভূতি খেলা করছে দু চোখে।
টাইটা, আমার মনে হয় আমি আবারো মা হতে যাচ্ছি।
এতে অবশ্য অবাক হওয়ার কিছু নেই। গজ-দ্বীপ ছাড়ার পর থেকে প্রতিরাতে নিজের শয্যা প্রকোষ্ঠে গোপন প্রণয়ে লিপ্ত হতো লসট্রিস; তার সেনাপ্রধানের সঙ্গে। আমি, টাইটা, ছিলাম প্রহরীর ভূমিকায়। কিন্তু এতোটাই ভয় পেলাম, বাঁশি-ধরা হাতটা যেনো জায়গায় জমে গেলো আমার। গান আটকে গেছে গলায়।
মাই লেডি, লতাগুলোর যে মিশ্রণ দিয়েছিলাম তোমাকে, ওগুলো খেয়েছো ঠিকমতো? সতর্কভঙ্গিতে জানতে চাইলাম।
মাঝে-মধ্যে খেয়েছি; আবার কখনো কখনো বাদ পড়েছে। লাজুক হাসলো মিসট্রেস। ট্যানাস খুবই অধৈৰ্য্য মানুষ। একদম অপেক্ষা করতে পারে না। ওসব খাওয়ার চেয়ে জরুরি কাজ পরে থাকে ওর জন্যে সব সময়।
যেমন- রাজ-পিতা ছাড়া সন্তান উৎপাদন?
খুব জটিল সমস্যা–তাই না?
মনের মধ্যে উত্তর তৈরি করতে করতে একটা সুর ধরলাম। জটিল সমস্যা? আমার মনে হয়, এতে করে কিছুই প্রকাশ হয় না। যদি একটা জারজ সন্তান জন্ম দাও তুমি, অথবা, কাউকে স্বামী হিসেবে গ্রহণ করো এখন, মিশরের শাসনক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হবে। ওটাই নিয়ম। লর্ড মারসেকেট থাকবেন শাসনকর্তা হওয়ার তালিকায় এক নম্বরে; তবে এই নিয়ে বিরাট একটা বিশৃঙ্খলা হওয়ার আশঙ্কা আছে। শাসনক্ষমতা ছেড়ে দিলে সবচেয়ে বঞ্চিত হবে রাজকুমার। আর আমাদের মিশর কেঁপে উঠে থেমে গেলাম আমি।
আমার বদলে ট্যানাস শাসন করতে পারে; আর সেক্ষেত্রে আমি ওকে বিয়ে করতে পারি, উজ্জ্বল মুখে জানালো লসট্রিস।
মনে করো না, ওটা নিয়ে ভাবিনি আমি, শক্তভাবে বললাম ওকে। এতে করে আমাদের সবার সমস্যার সমাধান হতে পারে। কিন্তু ট্যানাস কি মানবে?
আমি অনুরোধ কোরলে, হাসিমুখে মেনে নেবে ট্যানাস আমি নিশ্চিত, স্বস্তির সাথে বললো মিসট্রেস। আমি ওর স্ত্রী হবো। একসাথে থাকার জন্যে এভাবে আর লুকোচুরি খেলতে হবে না আমাদের।
ও রকম হলে ভালোই হতো। কিন্তু কখনো এটা মানবে না ট্যানাস। ও—
রাগে জ্বলে উঠলো মিশরের রানি। এর মানে কী? কেননা মেনে নেবে না সে?
সেই রাতে, যখন দেশদ্রোহিতার অভিযোগে ওকে আটক করার জন্যে সৈনিক পাঠিয়েছিলেন ফারাও, আমি ওকে ক্ষমতা দখলের জন্যে চাপ দিয়েছিলাম। কাতাস এবং তার যোদ্ধারা তাদের আনুগত্য প্রদর্শন করেছিলো তখন। প্রাসাদে গিয়ে ট্যানাসকে সিংহাসনে বসাতে প্রস্তুত ছিলো তারা।
তাদের কথা শুনলো কেননা ট্যানাস তখন? অসাধারণ একজন রাজা হতে পারতো সে; আমরাও অনেক সমস্যার হাত থেকে বেঁচে যেতাম!
ট্যানাস তার যোদ্ধাদের ভৎর্সনা করেছিলো সেই রাতে। ঘোষণা করেছিলো, সে বিশ্বাসঘাতক নয়, মিশরের সিংহাসনে তার কোনো অধিকার নেই।
সে তো অনেক আগের কথা। এখন অনেক কিছু পাল্টেছে, মরিয়া হয়ে বলে উঠলো আমার কর্ত্রী।
না, কিছুই পাল্টে নি। সেদিন হোরাসকে সাক্ষী রেখে শপথ করেছিলো ট্যানাস। ও শপথ করেছিলো, কোনোদিনও মিশরের মুকুট কেড়ে নেবে না।
কিন্তু এখন ওই শপথের কোনো মূল্য নেই। ওটা ধরে বসে থাকতে পারে না সে।
হোরাসের শপথ কেটে ভঙ্গ করতে পারবে তুমি? জানতে চাইলাম। হতাশায় কাঁধ ঝুলে পড়লো লসট্রিসের।
না, ফিসফিস করে বললো ও, পারবো না।
ওখানেই বাঁধা পড়েছে ট্যানাস। যা তুমি নিজে করতে পারবে না, ওকে অনুরোধ করার কোনো মানে হয় না। জানোই তো, এ সম্ভব নয় ওর দ্বারা।
কিছু সময় চুপ থাকলো লসট্রিস। অবশেষে কথা বলে উঠলো সে, আমি নিজে বরঞ্চ মরে যাবো, কিন্তু কিছুতেই যে সৃষ্টি ট্যানাস আমার গর্ভে দিয়ে গেছে, তা নষ্ট করতে পারবো না। পেটের এই শিশু ওর আর আমার ভালোবাসার চিহ্ন কখনোই নষ্ট করবো না আমি।
সেক্ষেত্রে, আমার কিছুই করার নেই, ম্যাজেস্টি।
পরি পুর্ণ আস্থা আর আত্মবিশ্বাস নিয়ে আমার উদ্দেশ্যে হাসলো এবারে লসট্রিস। গা শিরশির করে উঠলো আমার, মনে হলো, যেনো শ্বাস নিতে পারছি না। আমি নিশ্চিত সব সময়ের মতো এবারেও কোনো না কোনো উপায় খুঁজে বের করবে তুমি, টাইটা।
কাজেই, একটা স্বপ্ন দেখলাম আমি।
*
আমাদের এই মিশরের সমস্ত রাজকীয় সভাষদের উপস্থিতিতে সেই স্বপ্নের বৃত্তান্ত বর্ণনা করলাম।
হোরাসের প্রশ্বাসের চালকের প্রকোষ্ঠে উঁচু স্থানে সিংহাসনে উপবিষ্ট ছিলো আমার কর্ত্রী, কোলে মেমননকে নিয়ে। নীল নদের
পশ্চিম তীরে নোঙর করা আছে জাহাজ। তীরের বেলাভূমিতে, রানির নিচে সমবেত সমস্ত অভিযাত্রী।
