করুণ চেহারায় মাথা এপাশ-ওপাশ নাড়লো সে। না, মাই লর্ড। শিকারে যেতে আমার খুবই ভালো লাগবে।
রানি আমাকে ফাঁসিতে চড়াবেন এ জন্যে, ট্যানাস বলে। যা হোক, এখানে, আমার সামনে এসে বসো।
এক হাত বাড়িয়ে দিতে, লাফ দিয়ে ট্যানাসের পাশে রথের পাদানীতে চড়লো মেম।
চলো! ধৈৰ্য্য আর ফলার উদ্দেশ্যে চেঁচালো সে। একজন বার্তাবাহককে দিয়ে রাজকুমারের খবর জাহাজে পাঠিয়ে তবেই রওনা হলাম আমরা। সবুজ বিশাল বিস্তৃতির উদ্দেশ্যে এগিয়ে চললাম। সামনে শিকারী রথ পেছনে ভারী ওয়াগন-টানা রথ।
দূরের পাহাড়ের পাদদেশ পর্যন্ত ছড়িয়ে রয়েছে ওরিক্সের পাল। দশ বা একশটির মতো রয়েছে এক একটি দলে; আবার বুড়ো মদ্দাগুলো একা একা ঘুরে ফিরছে। কোনো কোনো পালে কতটি ওরিক্স আছে–তা গুনে শেষ করার নয়। সমভূমির উপর মেঘের ছায়ার মতো লাগছে প্রাণীগুলোকে। মনে হলো, আফ্রিকার সমস্ত ওরিক্স যেনো জড়ো হয়েছে এখানে।
দিগন্তে দাঁড়িয়ে রইলাম আমরা। সামান্য কৌতূহল নিয়ে মাথা উঁচিয়ে আমাদের দেখলো কাছের প্রাণীগুলো। সম্ভবত আগে কখনো মানুষ দেখিনি এরা, কাজেই কোনো বিপদ আশা করছে না আমাদের থেকে। অতপর : রথ নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লাম আমরা ওরিক্সের পালের অভ্যন্তরে। জম্ভগুলোর খুঁড়ের ঘায়ে পাক খেয়ে উঠলো ধোঁয়ার মেঘ। একের পর এক লুটিয়ে পড়তে লাগলো প্রাণীগুলো, চলন্ত রথ থেকে ছোঁড়া তীরের আঘাতে।
অবশেষে যখন যথেষ্ট পরিমাণ মাংস সগ্রহ নিশ্চিত হলো, রথ থেকে নিচে নেমে গুনে দেখলাম আমি। তখনো মৃত্যু-যন্ত্রণায় পা ছুঁড়ছিলো কিছু ওরিক্স। রথে ফিরে এসে রাজপুত্রের চেহারার দিকে তাকিয়ে দেখলাম কান্নায় ভেজা তার চোখ, ওরিক্সের খুঁড়ের ঘায়ে ছুটে আসা মাটির ঢেলায় লেগে কেটে গেছে কপাল; অসহায় প্রাণীগুলোর প্রতি দরদ উথলে উঠছে চেহারায়। আমার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলো সে, যেনো চোখের পানি দেখতে না পাই। গর্ববোধ করলাম ওর জন্যে। একজন সত্যিকারের শিকারীর অবশ্যই তার শিকারের জন্যে মায়া থাকবে।
কোঁকড়া-চুলে ভরা মাথাটা আমার দিকে ঘুরিয়ে খুব আলতো করে পরিষ্কার করলাম রাজপুত্রের মাথার ক্ষতটা। এক ফালি লিনেন দিয়ে বেঁধে দিলাম ।
সেই রাতে ফুলের ঝাড়ের ধারে ক্যাম্প ফেললাম আমরা। তাজা রক্তের গন্ধ ছাপিয়ে রাতের বাতাসে মৌ মৌ করলো বুনো ফুলের সুবাস।
চাঁদ ছিলো না আকাশে। কিন্তু অসংখ্য তারা ভরে রেখেছে পুরো আকাশ। স্নান রুপালী আভায় স্নান করছে দিগন্তের পাহারশ্রেণী। আগুনের ধারে বসে ওরিক্সের ঝলসানো কলিজা আর হৃদপিণ্ড খেলাম তৃপ্তি সহকারে। প্রথমটায় আমার আর ট্যানাসের মাঝে বসেছিলো মেমনন, কিছু সময়ের মধেই যোদ্ধারা তার মনোযোগ জয় করে নিলো। ধীরে ধীরে সহজ হয়ে উঠলো রাজপুত্র, নির্ভয়ে এক দল থেকে অপর দলের যোদ্ধাদের মধ্যে ঘুরে ফিরতে লাগলো সে।
কপালের পট্টি দেখে দারুন মুগ্ধ সৈনিকেরা। তুমি এখন থেকে সাচ্চা সৈনিক, ওরা বললো রাজপুত্রকে। ঠিক আমাদের মতো। নিজেদের দেহের বিভিন্ন ক্ষত মেমননকে একে একে দেখাতে লাগলো তারা।
ওকে শিকারে আসতে দিয়ে সঠিক কাজটাই করেছো, ট্যানাসকে উদ্দেশ্যে করে বললাম। এর চেয়ে ভালো প্রশিক্ষণ আর কিছু হতে পারে না।
হুমম। সৈনিকেরা এখনই ভালোবেসে ফেলেছে ওকে। একমত হলো ট্যানাস। একজন সমরনায়কের দুটো জিনিস চাই–এক, ভাগ্যের সহায়তা, অপরটি হোলো নিজের বাহিনীর সদস্যদের আনুগত্য।
খুব বেশি বিপদের আশঙ্কা না থাকলে মেমননকে আগামী সমস্ত অভিযানে নিয়ে যাওয়া উচিত। আমার এই কথায় ট্যানাস হাসে।
ওর মাকে তুমি বোঝাবে তাহলে! ওটা আমার ক্ষমতার বাইরে।
ওদিকে, আগুনের অপর পাশে বসে নীল বাহিনীর রণ-সংগীত শেখাচ্ছে ক্ৰাতাস, মেমননকে। মিষ্টি, পরিষ্কার গলা ওর হাত তালি দিয়ে ঐকতানে গাইতে লাগলো যোদ্ধারা। রথে তৈরি করা অস্থায়ী বিছানায় শোয়ানোর জন্যে যখন নিয়ে যেতে চাইলাম ওকে; যোদ্ধারা তো বটেই, এমনকি ট্যানাস পর্যন্ত আপত্তি জানালো।
আরো কিছুক্ষণ থাকুক বাচ্চাটা, তার নির্দেশে মধ্যরাতের পরও অনেক সময় পর্যন্ত আগুনের ধারে রইলো মেমনন। অবশেষে, ওকে নিয়ে বিছানায় শুইয়ে ভেড়ার পশমের চাদরে ঢেকে দিলাম আমি।
টাটা, লর্ড ট্যানাসের মতো কখনো তীর ছুঁড়তে পারবো আমি? ঘুম জড়ানো স্বরে জানতে চায় রাজপুত্র।
আমাদের এই মিশরের শ্রেষ্ঠ সমরনায়ক হবে তুমি। একদিন তোমার সমস্ত কীর্তি পাথরে খোদাই করে লিখে রাখবো আমি পৃথিবীর সবাই যেনো জানতে পারে।
কিছু সময় এ নিয়ে চিন্তা করে দীর্ঘশ্বাস ফেললো মেম। কোন্ দিন একটা সত্যিকারের ধনুক তৈরি করে দেবে আমার জন্যে?
যেদিন তুমি ওটা টানতে পারবে, প্রতিজ্ঞা করলাম আমি।
ধন্যবাদ, টাটা। ওটা যেনো আমার পছন্দ মতো হয়, বলে দিলাম। এরপর সাথে সাথেই ঘুমিয়ে পড়লো মেম।
*
ওয়াগন ভর্তি ওরিক্সের লবণ-দেওয়া শুকনো মাংস নিয়ে উল্লাসের সাথে জাহাজের কাছে ফিরে এলাম আমরা। রাজপুত্রকে শিকারে নিয়ে যাওয়ায় আমার কপালে বিস্তর গাল-বকুনি আছে–এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। আমিও অবশ্য তৈরি। সমস্ত দোষ ট্যানাসের চওড়া কাঁধে চাপিয়ে দেবো এ যাত্রা।
কিন্তু, স্বাভাবিকের চেয়ে সংযত আচরণ করলো লসট্রিস। মেমননকে একটু বকুনি দিয়ে বুকের সাথে জড়িয়ে ধরে রাখলো অনেকক্ষণ। আমার দিকে ফিরতেই, সাথে সাথে লম্বা এক গল্প ফেঁদে বসলামস্ট্যানাসের কী ভূমিকা ছিলো এখানে, এই অভিযানের ফলে প্রশিক্ষণে কী কী সুবিধা হলো রাজকুমারের ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু লসট্রিস মনে হয় ভুলেই গেছে ও কথা।
