*
এখন আমার হাতে দ্বীপে পরে থাকা গাছের কাঠ আছে, যা দিয়ে নানান পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে পারি।
একাশিয়া গাছের কাণ্ড অত্যন্ত ঘাতসহ এবং শক্তিশালী। আমার রথের জন্যে সেরা কাঠ দিয়ে চাকার স্পোক তৈরি করলাম
এখানে। দ্বীপে জন্মানো গাছ আর বাঁশের সহায়তায় নতুন করে সমস্ত রথ তৈরির জন্যে লাগিয়ে দিলাম মিস্ত্রিদের। কিছু দিনের মধ্যেই বিশাল সমভূমিতে প্রশিক্ষণের উদ্দেশ্যে চলাচল শুরু করলো নতুন রথ। এখনো, খুব বেশি দ্রুত চললে চাকা ভেঙ্গে যায়, কিন্তু আগের মতো ঘন ঘন হয় না ব্যাপারটা। এক পর্যায়ে এসে জোর করে রথের পাদানীতে উঠতে বাধ্য করলাম ট্যানাসকে।
একই সময়ে গাছের কাণ্ড দিয়ে প্রথম প্রান্ত-বাকানো ধনুক তৈরি শেষ করলাম আমি। গজ-দ্বীপ থেকেই ওটা নিয়ে কাজ করছিলাম। লানাটার মতো সেই একই বস্তু দিয়েই তৈরি এটা, কিন্তু আকৃতিতে ভিন্ন। আমার অনুরোধে পুব তীরে সার বেঁধে দাঁড় করানো নিশানার উপর নতুন ধনুক পরখ করে দেখতে রাজী হলো ট্যানাস। বিশটি তীর ছোঁড়ার পর ও মুখে কিছু না বললেও, আমি নিশ্চিত, এর পাল্লা আর নিখুঁত নিশানাভেদে চমকে গেছিলো সে। ট্যানাসকে হাড়ে হাড়ে চিনি আমি। সব সময়ই অত্যন্ত রক্ষণশীল মানুষ ও। লানাটা ছিলো তার প্রথম ভালোবাসালসট্রিসের মতোই। কাজেই নতুন কিছু গ্রহণ করতে একটু সময় লাগবে ওর। চাপ না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম আমি।
এসময়ই প্রহরীরা ঘোষণা করলো, মরুর দিক থেকে ওরিক্সের পাল আসছে। প্রথম জলপ্রপাত অতিক্রমের পর এই অসাধারণ প্রাণীর ছোটো কয়েকটি পাল আমাদের চোখে পড়েছে। জাহাজ দেখলেই দৌড়ে মরুতে ফিরে যেতো তারা। যখন প্রহরীরা জানালো দলে দলে ফিরে আসছে ওরিক্সের দল; চিন্তিত হয়ে পড়লাম আমি। এ আমি আগেও দেখেছি। সাধারণত কোনো বজ্রপাতসই মরুঝড়, যা বিশ বছরে একবার হয়, এমন ঘটার পূর্বাভাস পেলে পালে পালে মরু থেকে পালিয়ে আসে জীবজন্তু।
সজীব দ্বীপের মাটিতে অল্প কয়েকদিনের মধ্যেই চড়ে বেড়াতে লাগলো বিশাল ওরিক্সের পাল। কাজেই, শিকার এবং রথ-চালানোর অজুহাত পেয়ে গেলাম আমরা।
প্রথমবারের মতো আমার রথে আগ্রহ দেখালো ট্যানাস। কেননা, পায়ে হেঁটে এতো দ্রুতগামী প্রাণী শিকারের আশা বৃথা। রথের পাদানীতে, আমার পাশে যখন শেষমেষ চড়লো সে; লক্ষ্য করলাম, লানাটা নয়, ওর কাঁধে ঝুলছে নতুন প্রান্ত বাঁকানো ধনুক। কিছুমাত্র না বলে রথ চালানোয় মন দিলাম আমি।
বাহিনীতে এখন পঞ্চাশটি রথ, ভারী চাকার মালামাল বহনকারী আরো কিছু বাহন রয়েছে। দুই সারিতে এগুলাম আমরা সামনে থাকলে দুটি করে রথ। কিছুপথ এগুতেই সামনের পাথর খণ্ডের আড়াল থেকে বেরিয়ে এলো ছোট্ট একটা অবয়ব।
হোয়া! ঘোড়াগুলোর লাগাম টেনে ধরলাম আমি। জাহাজ থেকে এতোদূরে কী করছো তুমি?
গত সন্ধ্যার পর আর দেখিনি রাজপুত্রকে, ভেবেছিলাম হয়তো পরিচারিকাদের কাছে নিরাপদে আছে। এখানে, এই উন্মুক্ত ময়দানে ওর দেখা পেয়ে দারুন হকচকিয়ে গেছি। রাগে কর্কশ শোনালো গলা। তখন ছয় বছরও হয়নি মেমননের বয়স, কাঁধে খেলনা ধনুক ফেলে ঠিক বাপের মতোই একরোখা চেহারায় দাঁড়িয়ে আছে সে।
আমি তোমাদের সাথে শিকারে যাচ্ছি, ঘোষণা করলো মেমনন।
না, মোটেও তা নয়, আমি বললাম কঠোর চেহারায়। এই মুহূর্তে মায়ের কাছে ফেরত পাঠাচ্ছি তোমাকে। যে সব ছোট্ট বাচ্চা পালিয়ে বাইরে চলে আসে, তাদের উপযুক্ত সাজা ওর জানা আছে।
আমি মিশরের রাজপুত্র, একরোখা ভঙ্গিতে বললো মেমনন। ঠোঁট কাঁপছে তার। কেউ আমাকে নিষেধ করতে পারে না। প্রয়োজনের সময় আমার লোকেদের সঙ্গে থাকবো আমি।
বিপদজনক দিকে মোড় নিয়েছে কথা-বার্তা। রাজপুত্র তার অধিকার-সম্মানের প্রসঙ্গে জানে; আমি নিজেই তাকে শিক্ষা দিয়েছি। কিন্তু এতো দ্রুত এ বিষয়ে কথা বোলবে ও–ভাবিনি। মরিয়া হয়ে একটা কিছু বলতে চাইলাম।
আগে আমাকে বলো নি কেননা, শিকারে আসতে চাও?
কারণ, বললেই মায়ের কাছে নিয়ে যেতে তুমি, সরল সতোর সাথে বললো রাজকুমার । আর, উনি তোমার কথায় সায় দিতেন, যেমন সবসময় দেন।
আমি তো এখনো রানির কাছে যেতে পারি, হুমকির স্বরে বললাম। পিছু ফিরে, দূরে খেলনার মতো আকৃতির জাহাজগুলোর দিকে তাকালো মেমনন। আমার মতো সেও জানে, এতোদূর পথ আবার ফিরতে হলে অনেক সময় অপচয় হবে।
দয়া করো আমাকে সঙ্গে নাও, টাটা, গলার সুর পাল্টে ফেলে বললো ছোট্ট রাজকুমার। তখনি, একটা ফাঁক পেয়ে গেলাম আমি। লর্ড হেরাব হলেন এই অভিযানের নেতা। তার কাছ থেকে অনুমতি নিতে হবে তোমাকে।
রাজপুত্র নিজের পিতাকে জানতো তার শিক্ষক আর সেনাবাহিনীর অধিনায়ক হিসেবে। যদিও ট্যানাসকে ভালোবাসতো সে, ভয়ও পেতে কিছুটা।
পরস্পরের দিকে তাকিয়ে রইরো বাপ-ব্যাটা। হাসি চেপে রাখতে হিমশিম খাচ্ছে ট্যানাস টের পেলাম ।
লর্ড হেরাব, আনুষ্ঠানিক ভঙ্গিতে অনুমতি প্রার্থনা করলো রাজপুত্র। আমি আপনার সাথে শিকার অভিযানে আসতে চাই। আমি মনে করি, আমার জন্যে দারুন একটা অভিজ্ঞতা হবে সেটা। যাই হোক, একদিন তো আমাকেই এই সেনাবাহিনীর নেতৃত্ব দিতে হবে! ঠিক আমার দেওয়া শিক্ষা মোতাবেক যুক্তি দিয়ে কথা বলতে শিখে গেছে সে।
রাজকুমার মেমনন আপনি কি আমাকে নির্দেশ দিচ্ছেন? হাসি চেপে রেখে হুঙ্কার দিয়ে উঠলো ট্যানাস। মেমননের চোখে অশ্রু টলমল করছে।
