নদীর পানিতে মাছের কোনো অভাব নেই। জলপ্রপাতের নিচে আমাদের লোকেরা হাজার বছর ধরে মাছ ধরে আসছে। এই দিকের পানিতে কোনো মানুষের হাত বা মাছ-ধরা জাল পড়েনি। বিশাল বিশাল মাছ ধরলাম আমরা, এর এক একটির গোঁফ আমার বাহুর সমান লম্বা। এতে ওজন জাল ছিঁড়ে যেতে চায়। পানি থেকে উঠানোর পর বর্শা গেঁথে মারতে হলো ওগুলোকে ঠিক জলহস্তির মতোই। পঞ্চাশ মানুষ খাওয়ানো যায় এমন আকারের মাছ দিয়ে। আগুনের ধারে নিয়ে যাওয়ার সময় ঝরঝর করে চর্বি ঝরলো মাছের কাটা মাংস থেকে।
পানির উপরের পাথুরে ধারে বসবাস ঈগল আর শকুনের। সারাক্ষণ আমাদের জাহাজবহরের উপরে বৃত্তাকারে উড়ে চললো ওগুলো।
উঁচু পাথুরে পথে ভাবগম্ভীরতার সাথে আমাদের যাত্রা অবলোকন করলো পাহারী ছাগলের দল। ট্যানাস তার ধনুক নিয়ে শিকারে গিয়েছিলো, কিন্তু বহু সময় লাগলো একটা মাত্র পাহারী ছাগলের দেখা পেতে।
জীব-জন্তুর প্রতি আমার আগ্রহের কারণে পাহারী ছাগলের চামড়া ছাড়ানোর পর ওর শিং আর চামড়া আমাকে দিয়েছিলো ট্যানাস। মাথাটা পরিষ্কার করে, আমাদের গ্যালির মাস্তুলে টানিয়ে দিলাম ওটা। ওদিকে প্রতিদিনই অজানার উদ্দেশ্যে এগিয়ে চলেছি আমরা।
*
মাসের পর মাস পেরিয়ে যেতে লাগলো। আমাদের জাহাজে খোলের তলায় নদীর পানি কমে গেলো শেষ হয়ে গেছে এই বছরের বন্যা। চারপাশের কঙ্কালসার পাহাড়ের গায়ে গতবছরের বন্যায় সৃষ্ট জলের উচ্চতা অনুযায়ী দাগ পরে আছে।
প্রতিরাতে মেমনন এবং আমি জাহাজের ভোলা পাটাতনে শুয়ে। আকাশের তারা পর্যবেক্ষণ করতাম–অন্তত যতক্ষণ পর্যন্ত না রাজপুত্রের মা তাকে ডেকে নেয়। এ রকমই এক দিন তারাদের গতিপথ পর্যবেক্ষণ করে বুঝলাম, এখন আর সরাসরি দক্ষিণে নিয়ে যাচ্ছে না আমাদের নদী। এই বিষয়টি ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করলো আমাদের পণ্ডিত আর বিজ্ঞজনদের মাঝে।
নদী আমাদের সরাসরি পশ্চিমের স্বর্গের মাঠে নিয়ে যাচ্ছে, মন্তব্য করলেন ওসিরিসের মন্দিরের প্রধান পুরোহিত। এ হলো সেথএর চাল। আমাদের বিভ্রান্ত করাই তার লক্ষ্য। এবারে বললেন হাপির মন্দিরের পুরোহিত আমাদের বাহিনীতে ইতিমধ্যেই অসাধারণ জনপ্রিয়তা অর্জন করে ফেলেছেন উনি। নদীর এহেন গতিপথ পরিবর্তনে দারুন নাখোশ পুরোহিতবর্গ। খুব দ্রুতই আবার দক্ষিণে মোড় নেবে নদী। একবাক্যে উচ্চারণ করলো তারা। খুবই আশ্চর্য লাগে মাঝে-মধ্যে, নির্বোধ মানুষজন কী অবলীলায় নিজের আকাঙ্ক্ষাকে দেবতাদের উপর চাপিয়ে দিতে চায় ।
এই তর্ক-বিতর্ক যখন চলছে, দ্বিতীয় জলপ্রপাতে পৌঁছুলাম আমরা।
এই হলো সেই স্থান যেখান পর্যন্ত কোনো সভ্য মানুষের পা পড়েছে। এর পর আর কেউ অগ্রসর হতে পারেনি কখনো। জলপ্রপাতের প্রকৃতি পরীক্ষা-পর্যবেক্ষণ করে বুঝলাম কেননা এখানে নৌ চালনা করা সম্ভব হয়নি।
বিশাল এলাকা জুড়ে নীলের জলধারা বিভক্ত হয়ে আছে বিশাল দ্বীপপুঞ্জ আর অপেক্ষাকৃত ছোটো পাথুরে কাঠামো দিয়ে। পানি একেবারেই অগভীর–এখানে সেখানে নদীর তলানি চোখে পড়ে। আমাদের সামনে যততদূর চোখ যায়, পাথুরে খণ্ডে পরিপূর্ণ খাল এঁকে বেঁকে এগিয়ে গেছে।
কেমন করে বুঝবো, এর পরেও আর কোনো জলপ্রপাত নেই; কিংবা তার পরে আরো একটা? অল্পতেই উৎসাহ হারিয়ে ফেলে এমন কেউ মন্তব্য করলো। ক্রমশ শক্তি ক্ষয় করে শেষমেষ জলপ্রপাতের মধ্যখানে চিরদিনের জন্যে আঁকা পড়ে যাবো আমরা সামনে এগোনো যাবে; না পারবো পিছু হটতে। আরো দেরি হওয়ার আগেই ফিরে যাওয়া উচিত।
আমরা চলতে থাকবো, আদেশ জারী করলেন রানি। যারা থেকে যেতে চায় এখানে, থেকে যেতে পারে। কিন্তু কোনো জাহাজ বা ঘোড়া রেখে যাওয়া যাবে না । নিজের পায়ে হেঁটে ফিরতে হবে আমি নিশ্চিত, দারুন অভ্যর্থনা জানাবে হিকসস্ বাহিনী।
এমন একজনও পাওয়া গেলো না, যে থেকে যেতে চায়। পরিবর্তে, পায়ে হেঁটে আশে পাশের উর্বর দ্বীপে উঠলো তারা। দুই তীরের ভয়াবহ মরুর বিপরীতে বানের পানি আর পলিমাটির প্রভাবে ঘন সবুজ বনে পরিণত হয়েছে এক একটি দ্বীপ। পানিতে ভেসে আসা বীজ অনুকূল পরিবেশ পেয়ে বেড়ে উঠেছে লকলক করে; এতো লম্বা গাছ আমরা জীবনেও দেখিনি। দ্বীপের গ্রানাইটের ভিত্তির উপর মাতা নীলের পলিমাটিতে জন্মেছে সেই বৃক্ষ।
পরবর্তী বন্যার আগে এই খাড়া জলপ্রপাত পেরুনো সম্ভব নয় আমাদের পক্ষে। বহুমাস বাকি বন্যা আসতে।
দ্বীপে পৌঁছে সাথে করে নিয়ে আসা বীজ বপন করতে লাগলো আমাদের কৃষকেরা। অল্প কয়েকদিনের মধ্যেই চারাগাছ গজালো বীজ থেকে। কয়েক মাসের মধ্যেই ফসল তোলার সময় এসে গেলো ধুররা শস্যের মিষ্টি ফলমূল আরা তাজা শাক-সজি দিয়ে প্রাণভরে আহার করতে পারলাম আমরা, যা এতোকাল মিশরে পাইনি। যা কিছু অস্বস্তি ছিলো আমাদের লোকেদের মনে, উবে গেলো সেটা।
মূলত, এতো আকর্ষণীয় আর উর্বর ছিলো সেই দ্বীপ, অনেকেই এখানে পাকাপাকিভাবে থেকে যাওয়ার কথা বলাবলি করতে লাগলো। আমন রার পুরোহিতেরা রানির কাছে আর্জি নিয়ে গেলো, এখানে দেবতাদের জন্যে একটা মন্দির নির্মাণ করতে চায় তারা। উত্তরে আমার কর্ত্রী বলেছিলো, আমরা কেবল অভিযাত্রী হিসেবে এসেছি এখানে। মিশরে ফিরে যাবো আমরা। এ আমার প্রতিজ্ঞা। কাজেই, স্থায়ী কোনো স্থাপনা বা মন্দির আমরা নির্মাণ করবো না। যতোদিন না মিশরে ফিরছি, যাযাবর বেদুঈরের মতোই তবু বা কুঁড়েতে বসবাস করবে মিশরীয়রা।
