সবার শেষে আমাকে ডাকলেন রানি। তার সামনে কুর্নিশ করতেই, ফিসফিসিয়ে, কেবল আমি শুনতে পাই, এমন স্বরে বলে উঠলেন, তোমার অবদান কেমন করে ভুলে যাই, বিশ্বস্ত, প্রাণপ্রিয় টাইটা? তোমার সাহায্য আর প্রজ্ঞা ছাড়া এ পর্যন্ত আসা সম্ভব হতো না কখনোই। আলতো করে আমার চিবুকে আঙুল ছোঁয়ালো লসট্রিস। এরপর প্রশংসার স্বর্ণ শেকল পরিয়ে দিলো গলায়। পরে, ওজন করে দেখেছিলাম ওটা পুরো ত্রিশ ডেবেন, ফারাও আমাকে যে হার দিয়েছিলেন তার তুলনায় পাঁচ ডেবেন বেশি।
এরপর, জলপ্রপাতের পাথুরে ধার ধরে যখন হেঁটে চললো মিসট্রেস, ওর মাথার উপরে অসট্রিচের পালকে তৈরি ছাতা ধরে রাখলাম আমি। দু একবার আমার উদ্দেশ্যে হাসলো ও, প্রতিটি হাসি আমার কাছে গলার ওই প্রশংসার স্বর্ণ শেকলের চেয়ে বহুগুনে মূল্যবান।
পরদিন সকালে হোরাসের প্রশ্বাসে অবস্থান নিলাম আমরা। গলুই ঘুরিয়ে দক্ষিণের উদ্দেশ্যে রওনা হলো জাহাজ। শুরু হলো দীর্ঘ এক যাত্রা।
*
নদীর রূপ আর চরিত্র বদলে যেতে লাগলো প্রতিদিন। এ আর কোনো শান্ত, বিশাল জলরাশি নয় যা আমাদের চিরকাল স্বাচ্ছন্দ দিয়ে এসেছে। এই নীল নদ উন্মত্ত, বন্য–যেনো নিজস্ব খেয়াল খুশি আছে তার। অনেক সরু আর গভীর এখানে পানি। দুই তীরের স্থলভূমি অত্যন্ত বন্ধুর, কর্কশ। খাড়া ঢাল বেয়ে এখানে-সেখানে নেমে আসছে ঝর্ণাধারা। কুঞ্চিত দ্রু-যুগলে আমাদের উদ্দেশ্যে যেনো তাকিয়ে আছে উঁচু-নিচু পাথুরে ঢাল। কোনো কোনো স্থানে পরিসর এতো সংকীর্ণ, একসারিতে পেরুতে হলো ঘোড়ার পাল আর সৈনিকদের। আবার কোথাও কোথাও পায়ে চলাচলের জন্যে কোনো পথ নেই; বিশাল গ্রানাইটের পাহাড় মুখ ব্যাদান করে নীল নদের তীর প্রহরা দিচ্ছে। এমন একটা স্থানে এসেই আর সামনে এগুনো অসম্ভব হয়ে পড়লো ঘোড়ার পালের পক্ষে। বাধ্য হয়ে ঘোড়াগুলোকে সাঁতরে পার করে, অপরদিকের তীরের সবুজ বিস্তৃতিতে নিয়ে এলো হুই।
সপ্তাহের পর সপ্তাহ পেরিয়ে গেলো, কোনো জন-মানুষের দেখা পেলাম না আমরা। মাঝে-মধ্যে আমাদের প্রহরীরা অবশ্য তীরের ধারে পরিত্যক্ত কুঁড়ের দেখা পেলো; ধ্বংসপ্রাপ্ত ক্যানু চোখে পড়লো কখনো কখনো। কোনো ধরনের ব্যবহার্য দ্রব্য বা শিল্পকর্ম পেলাম না পরিত্যক্ত কুঁড়েগুলোতে, যা থেকে এখানকার অধিবাসীদের সম্পর্কে অনুমান করা সম্ভব।
কুশ দেশের অধিবাসীদের দেখা পেতে মরিয়া হয়ে আছি আমরা, এই মুহূর্তে দাস প্রয়োজন আমাদের। আমাদের পুরো সভ্যতা টিকে আছে দাস-প্রথার উপর, আর এই যাত্রায় সামান্য কয়েকজন মিশরীয় ক্রীতদাস নিয়ে আসতে পেরেছিলাম। জাহাজবহরের বহু সামনে প্রহরী দল পাঠিয়ে দিলো ট্যানাস, যাতে করে মানুষের দেখা পেলে আগেভাগেই জানাতে পারে তারা। এছাড়া, আমাদের দাস-ধরা লোকগুলোর প্রস্তুতির ব্যাপারও আছে। চিরজীবন একজন দাস হিসেবে বসবাস করেও এই শ্রেণীর মানুষ ধরে আনার ব্যাপারে বহু পরিকল্পনা করেছি আমি–এতে অবশ্য লজ্জার কিছু দেখি না।
সমস্ত সম্পদই চারভাগে ভাগ করা যায় ভূখণ্ড, স্বর্ণ, ক্রীতদাস এবং হাতির দাঁত। আমাদের ধারণা, সামনের ভূখণ্ড এই সমস্ত ধন-দৌলতে ভরপুর। শক্তিশালী হয়ে মিশরে ফিরে হিকসস্দের তাড়িয়ে দিতে পারলেও আবার এখানে ফিরে দুর্গম এই দেশ ঘুরে দেখা উচিত আমাদের।
নদীর ধারের পাহারের গুহায় স্বর্ণের খোঁজে লোক পাঠালেন রানি। খাড়া পাথুরে পথ বেয়ে উঠে, শুকনো ঝর্ণার তলায়, পাথরের খাজে স্বর্ণ খুঁজে ফিরলো তারা। তাদের সাথে গেলো রাজ-শিকারীর দল। এতো বড়ো একটা দলের আহারের জন্যে পর্যাপ্ত মাংস পেতে হলে শিকার প্রয়োজন। বিশাল দৈত্যাকার মাথায় মূল্যবান আইভরি বহনকারী সেই তামাটে রঙের প্রাণীর খোঁজও করলো তারা। জীবনে কখনো হাতি দেখেছে এমন লোকের খোঁজে পুরো নৌবাহিনী তন্নতন্ন করে ফেললাম আমি। যদিও সভ্য জগতে ওগুলোর দাঁত খুবই স্বাভাবিক বস্তু, কিন্তু জীবনে এমনকি নিহত হাতিও দেখেছে এমন লোক খুঁজে পেলাম না।
হাতি ছাড়াও আরো বহু প্রাণী রয়েছে এই ভূখণ্ডে। এর কিছু কিছুর সাথে আমাদের পরিচয় আছে, কিছুকিছু আবার একেবারেই নতুন।
নদীর তীরে যেখানেই নল-খাগড়া জন্মেছে, বিশাল গ্রানাইটের বোল্ডারের মতো স্থির শুয়ে আছে জলহস্তির দল। জলপ্রপাতের উপরের জলহস্তিও কী পবিত্র প্রাণী কি না, এই নিয়ে বেশ এক দফা তর্ক হয়ে গেলো আমাদের মধ্যে। হাপির মন্দিরের পুরোহিতদের মতে এরা দেবীর ভক্ত পবিত্র প্রাণী; অপরদিকে মাংস আর চর্বির লোভে প্রাণ আঁই-ডাই করতে থাকা আমরা অন্য দলে।
একেবারেই দৈবাৎ ঘটনা বলতে হয়, হঠাৎ দেবী আমার স্বপ্নে দেখা দিলেন। হাসিমুখে নদীবক্ষ থেকে উঠে এসে আমার কর্ত্রীর হাতে ছোট্ট আকারের একটা জলহস্তি তুলে দিতে দেখলাম আমি তাঁকে। সকালে উঠে আর দেরি না করে মিশরের শাসনকর্ত্রীর কাছে খুলে বললাম আমার স্বপ্নের কথা। আজকাল আমার স্বপ্ন-দর্শনের দারুন ভক্ত হয়ে গেছেন রানি।
সেই সন্ধায়, জাহাজ নোঙর করে, তীরে আগুন জ্বালিয়ে জলহস্তির ঝলসানো মাংস প্রাণভরে খেলাম আমরা সবাই। এহেন স্বপ্নের কারণে বাহিনীতে আমার ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তার কোনো সীমা-পরিসীমা রইলো না। অবশ্য, স্বাভাবিক কারণেই হাপির পুরোহিতেরা সেই চোখে দেখলেন না আমাকে।
