অবশ্য, অনির্দিষ্ট সময় ধরে হিকসস্ অত্যাচার সহ্য করা সম্ভব হয়নি কোনো অসহায় মিশরীয় নাগরিকের পক্ষে। অবশেষে, আমাদের পলায়নের খবর জানতে পেরে আবারো ঘোড়া তৈরি করে আক্রমণে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন স্যালিতিস; তার বাহিনী নিয়ে।
ট্যানাস তৈরি ছিলো এর জন্যে। তার নির্দেশে আসতেস, রেমরেম এবং ক্ৰাতাস সদা-সতর্ক অবস্থায় প্রহরা দিয়ে রাখছিলো রাত-দিন। প্রতিটি অভিযাত্রী একটু দম ফেলার সুযোগ পেতেই যুদ্ধে লাগিয়ে দেওয়া হলো তাদের।
এ আমাদের ভূমি। চিরপরিচিত ভূখণ্ডের সমস্ত সুযোগ নিলাম আমরা। খাড়া, পাথুরে দেয়াল বেয়ে নেমে এসেছে বিশাল জলপ্রপাত; উঁচু-নিচু তীরভূমি অত্যন্ত সংকীর্ণ। নদীর প্রতিটি বাঁকে উঁচু পাথুরে ধার অসংখ্য গুহার গোলকধাঁধা সেখানে আমাদের জন্যে প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা হিসেবে চমৎকার কাজে লাগবে সেগুলো।
জলপ্রপাতের উপরে রথ নিয়ে চড়া অসম্ভব। নদী ছেড়ে, মরুর উপর দিয়ে ঘুরে জলপ্রপাত পেরিয়ে আসাও সম্ভব নয় হিকসস্দের পক্ষে। নরম বালুতে তাদের ঘোড়ার পা যেমন ডেবে যাবে, তেমনি পানিবিহীন মরু গনগনে সূর্যের নিচে চলাফেরার অযোগ্য স্থান। এছাড়া, রথের চাকাও মরুতে চলবার উপযোগী নয়। বাধ্য হয়ে, জলপ্রপাতের নিচে সরু পাথুরে ধার ধরে একসারিতে উঠে আসতে লাগলো তারা। ঠিক এই প্রচেষ্টা রুখে দেওয়ার জন্যেই পাথুরে ঢালের উচ্চতায় তীরন্দাজদের মজুদ রেখেছিলো ক্ৰাতাস। হিকসসেরা উঠে আসার চেষ্টা করতেই উপরের সুরক্ষিত দেয়ালঘেরা স্থান থেকে তীরের বর্ষণ ছুটে এলো তাদের দিকে। পাথরের বড়ো বড়ো খণ্ড গড়িয়ে ফেললো আমাদের যোদ্ধারা মানুষ, রথ আর ঘোড়ার বিশৃঙ্খল এক জটলা উপর থেকে আছড়ে পড়তে লাগলো নীল নদের সবুজ পানিতে। উপর থেকে আমি আর কাতাস জলপ্রপাতের তীব্র স্রোতে অসহায় অবস্থায় হাবুডুবু খেতে দেখলাম হিকসস্ যোদ্ধাদের। তাদের আর্তনাদ প্রতিধ্বনি তুলতে লাগলো উঁচু পাথুরে দেওয়ালে লেগে। বর্মের ওজনের কারণে খুব দ্রুতই ডুবে গেলো তারা।
চিন্তিত হয়ে পড়লেন স্যালিতিস। তার একের পর এক বাহিনী পর্যদস্ত হয়ে প্রাণ হারাচ্ছে; ওদিকে আমাদের টিকিটিরও নাগাল পেলো না তারা। এই অসম যুদ্ধের কেবল একটা ফলাফলই হতে পারতো। জলপ্রপাতের খাড়াই ধরে অর্ধেক পথ উঠে আসার পর এই প্রচেষ্টায় ক্ষান্ত দিলো হিকসস্ বাহিনী। তারা যখন নিজেদের প্রত্যাহার করে জলপ্রপাতের ঢাল বেয়ে ফিরে যেতে লাগলো দলে দলে, ট্যানাস, আমি আর মিসট্রেস পাথুরে দেওয়ালে দাঁড়িয়ে দেখছিলাম। রথের ধ্বংসাবশেষ, নিহত-আহতের দেহ, আবর্জনা ফেলে রেখে পিছু হঠলো হিকসস্।
বিজয়ের দামামা বাজাও! ট্যানাসের নির্দেশে বেজে উঠলো সঙ্গিত। পলায়নরত শক্রদের পিছনে প্রতিধ্বনি তুললো সেই সুর। এতো উপর থেকেও রাজা স্যালিতিসের স্বর্ণ-মণ্ডিত রথ আর লম্বা অবয়ব চিনতে পারলাম আমি। উঁচু তামার তৈরি শিরস্ত্রাণ, বড়ো বড়ো দাড়ি টেনে পিছনে কাঁধে ফেলে রেখেছেন। হাতের ধনুক উঁচিয়ে আমাদের উদ্দেশ্যে ঝাঁকালেন রাখাল রাজা। হতাশা আর রাগের বহিঃপ্রকাশ ছিলো তার হাবভাবে।
এরপর দৃষ্টিসীমার বাইরে চলে না যাওয়া পর্যন্ত হিকসস্দের দিকে তাকিয়ে রইলাম আমরা। গজ-দ্বীপ পর্যন্ত তারা ফিরে যায় কি না দেখার জন্যে প্রহরী দল পাঠালো ট্যানাস। কিন্তু মনের গভীরে আমি ঠিকই জানি, রাজা স্যালিতিস আর আমাদের পিছু ধাওয়া করবে না। দয়াময়ী দেবী হাপি তার প্রতিজ্ঞা রেখেছেন, আবারো আমাদের আশ্রয় দিয়ে রক্ষা করেছেন তিনি।
ঘুরে, পাহাড়ি ছাগলের চলাচলের ফলে সৃষ্ট সরু, আঁকা-বাঁকা পথ ধরে আমাদের জাহাজগুলোর কাছে ফিরে চললাম তিনজন।
*
স্মারকচিহ্ন তৈরির কাজ সমাপ্ত করে ফেলেছে শিল্পীরা। তিনমানুষ সমান উচ্চতার একটা শ্যাফট ওটা নিরেট গ্রানাইট খোদাই করে তৈরি করা হয়েছে। কাটার আগে, বিরাট পাথুরে খণ্ডের উপর চিহ্ন এঁকে মাপ বুঝিয়ে দিয়েছিলাম আমি মিস্ত্রিদের। আমাদের বাহিনীর উপরে, আকাশের দিকে গর্বিত মাথা তুলে দাঁড়িয়ে এখন ওটা।
সমস্ত মিশরীয় জড়ো হলো সেই স্তম্ভের নিচে। নদীর দেবী হাপির উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করলেন রাণী লসট্রিস ওটাকে। পালিশ-করা পাথরের উপর শিল্পীদের খোদাই করা বানী জোরে জোরে পড়ে শোনালো ও—
.
আমি, রানি লসট্রিস, এই মিশরের শাসনকর্ত্রী এবং ফারাও মামোসের বিধবা পত্নী, যিনি ছিলেন ওই নামধারী অষ্টম ফারাও; আমার পরে যে এই দুই রাজ্য শাসন করবে সেই রাজকুমার মেমননের মাতা, এই স্তম্ভ তৈরির নির্দেশ দিয়েছি।
এই স্থাপত্য, মিশরের অধিবাসীদের প্রতি আমার শপথের চিহ্ন–যে অজানা যাত্রায় আমি রওনা হয়েছি জবরদখলকারী বর্বরদের দ্বারা তাড়িত হয়ে, সেখান থেকে অবশ্যই আবার ফিরে আসবো।
এই পাথুরে স্তম্ভ, আমার শাসনামলের প্রথম বছরে প্রস্তুতকৃত; ফারাও চিপস এর মহান পিরামিড তৈরির নয়শততম বছরে।
পিরামিডের মতোই এই স্থাপনাও অনড় থাকবে, যততদিন পর্যন্ত না আমি ফিরে আসবো।
এরপর, সমস্ত জনতার সামনে ট্যানাস, ক্ৰাতাস, আসতেস এবং রেমরেমের গলায় বীরশ্রেষ্ঠ খেতাব পরিয়ে দিলেন রানি যাদের প্রাণান্ত প্রচেষ্টার কারণেই মূলত জলপ্রপাত অতিক্রম করা সম্ভব হয়েছিলো।
