পঞ্চাশ হাজার মিশরীয় নাগরিক নদীর দুই তীরে দাঁড়িয়ে জল-ভরা চোখে বিদায় জানালো আমাদের। তাদের ঠোঁটে ছিলো দেবী হাপির নৈবেদ্য। ছোট্ট রাজপুত্রকে পাশে নিয়ে হোরাসের প্রশ্বাসের গলুইয়ে দাঁড়িয়ে হাত নেড়ে বিদায় জানালো রানি। একুশ বছর বয়সে, আমার কর্ত্রী তখন তার সৌন্দর্য্যের শিখড়ে অবস্থান করছিলো। ওর সৌন্দর্য্যের স্বর্গীয় দ্যুতি ধর্মীয় ভক্তি জাগিয়ে তোলে। সেই একই সৌন্দর্য প্রতিফলিত হচ্ছিলো রানির পাশে দাঁড়িয়ে থাকা শিশুপুত্রের অবয়বে। ছোট্ট, সংকল্পবদ্ধ হাতে রাজ্যের প্রতীক চিহ্ন ধরে রেখেছে মেমনন।
আমরা ফিরে আসবো, জনতার উদ্দেশ্যে বললো আমার কর্ত্রী, রাজপুত্রের কণ্ঠে তারই প্রতিধ্বনি, আমরা ফিরবো। অপেক্ষা করো, আমরা অবশ্যই ফিরবো।
সেইদিনই, আমাদের দুর্গত, শোষিত জনপদের ভাগ্যাকাশে যখন দুর্যোগের ঘনঘটা, মাতা নীলের তীরে জন্ম হলো একটি কিংবদন্তির, বহুকাল যা ছিলো আমাদের লোকেদের সঙ্গী।
*
পরদিন দুপুরে জলপ্রপাতের লেজের অংশে পৌঁছুলাম আমরা। নদীর জীবনচক্রের এই দশা আমাদের অভিযানের জন্যে সবচেয়ে উপযোগী। পানির উচ্চতা আমাদের জাহাজগুলো পার হয়ে যাওয়ার জন্যে যথেষ্ট, কোনো গ্যালিই নদীর তলায় ঠেকে যাবে না। তবে বন্যার পানি তখনো এতো তীব্র স্রোত অর্জন করেনি যে, ঠেলে জলপ্রপাতে উঠতে বাধা দেবে জাহাজগুলোকে। ট্যানাস নিজে জাহাজগুলোর নিরাপদ পারাপার দেখভালের দায়িত্বে রইলো, ওদিকে আমি এবং হুই লর্ড মারসেকেটের অধীনে তীরের লোকজনের তত্ত্বাবধানে ব্যস্ত থাকলাম।
ভারী লিনেনের দড়ির সাথে জুড়ে দেওয়া হলো আমাদের দশ ঘোড়ার এক একটি দল। একবারে দশটি দল–অর্থাৎ একশো ঘোড়া পার করা সম্ভব হলো। ঘোড়া ছাড়াও, প্রায় দুই হাজার লোক থাকলো দড়ির প্রান্তে। নদীর জলবাতাসেই বেড়ে উঠেছে আমাদের লোকজন, নদী আর নৌকার আচরণ তারা নিজেদের স্ত্রীদের চেয়ে ভালো জানে। মসৃণগতিতে, বিশেষ ঝুট-ঝামেলা ছাড়াই একশো ঘোড়া আর দুই হাজার লোকের টানে ধীরে জলপ্রপাতের খাড়া ধার বেয়ে উঠে আসতে লাগলো হোরাসের প্রশ্বাস। অবশেষে যখন জলপ্রপাত পেরিয়ে ওপাশের ঘন সবুজ শান্ত পানিতে পড়লো ওটা, খুশিতে চেঁচিয়ে উঠলাম আমরা।
কিন্তু এখনো ছয় মাইল পথ পাড়ি দিতে হবে। জলপ্রপাতের মাথায় চড়েছি কেবল। ঘোড়া এবং লোকবল পরিবর্তন করে আবারো টেনে নিয়ে চললাম আমরা হোরাসের প্রশ্বাসকে। এদিক-ওদিক জেগে আছে ডুবো পাথরের মাথা, এর যে কোনো একটায় বাড়ি লাগলে চুরমার হয়ে যাবে জাহাজের খোল। কিন্তু ঘোড়া আর মানুষের প্রাণান্ত প্রচেষ্টায় নিরাপদে সামনে এগিয়ে গেলে হোরাসের প্রশ্বাস, ছিড়লো না লিনেনের তৈরি দৃঢ় দড়ি।
ঘর্মাক্ত সৈনিকদের পাশে পাশে, তীরে হেঁটে চললো আমার কর্ত্রী । সেদ্ধ হওয়ার মতো গরমওে ফুলের মতো সজীব আর সুন্দর ও লসট্রিসের উৎসাহব্যঞ্জক হাসি কর্মউদ্দীপনা দ্বিগুণ করলো যোদ্ধাদের। নতুন উদ্যমে দড়ি টেনে চললো তারা।
সবার সামনে, ঘোড়ার পালের সঙ্গে ধৈর্য্যের পিঠে চড়ে থাকলো মেমনন। গ্যালির চালকের আসনে বসা নিজের পিতার উদ্দেশ্যে গর্বের সাথে হাত নাচালো সে।
অবশেষে, জলপ্রপাতের উপরের গভীর শান্ত নদীর মূল ধারায় উঠে এলাম আমরা; হাপির উদ্দেশ্যে প্রার্থনা সংগীতে ফেটে পড়লো মিশরীয় যোদ্ধা আর অভিযাত্রীরা।
গ্যালিতে চড়েই আমার কী খবর পাঠালো প্রস্তরশিল্পীদের। জলপ্রপাতের ধারের বিশাল গ্রানাইটের খণ্ডের উপর একটি ভাস্কর্য তৈরির নির্দেশ দিলো সে। যতক্ষণে বাহিনীর অন্য জাহাজগুলোকে প্রাণান্ত প্রচেষ্টায় পারাপার করা হলো, আগুন আর ছেনির সহায়তায় লম্বা, পাতলা একটা থাম তৈরি করে ফেলেছে মিস্ত্রিরা। রানির নির্দেশে ফারাও-এর বিশেষ হায়ারোগ্লিফিক্স ব্যবহার করে তার এবং রাজপুত্রের নামে বিশেষ বাণী খোদাই করতে লাগলো তারা।
*
একটি জাহাজ পার হয়ে যেতে এ ব্যাপারে দক্ষতা অর্জন করে ফেললাম আমরা।
হোরাসের প্রশ্বাসকে জলপ্রপাতের খাড়া ধার ধরে উঠাতে পুরো একদিন লেগেছিলো আমাদের। পরবর্তী সপ্তাহে, এর
অর্ধেকেরও কম সময়ে ছয়টি জাহাজ একই সাথে পার করা হলো। একটির পর একটি গ্যালি যেনো কোনো রাজকীয় শোভাযাত্রার মতো করে উঠে আসতে লাগলো জলপ্রপাতের উপরে। দশ হাজার সৈনিক এবং এক হাজার ঘোড়া যুগপৎ খেটে চললো দিন-রাত ।
অবশেষে, জলপ্রপাতের উপরে নীলে র ঘন সবুজ শান্ত জলে স্থির হলো আমাদের একশ জাহাজ। এই সময়ই আবারো আক্রমণে ঝাঁপিয়ে পড়লো হিকসস্ বাহিনী।
গজ-দ্বীপে লুটপাট চালাতে গিয়ে দেরি হয়েছে রাজা স্যালিতিসের। তারা ভাবতেও পারেনি, ফারাও মামোসের সিংহভাগ ধন-সম্পদ গ্যালিতে নিয়ে নদীর উজানে চলেছি আমরা। নদীর গতি-প্রকৃতি, চরিত্র সম্বন্ধে যা যা জানতো স্যালিতিস; বা ইনটেফ যা জানিয়েছেন তাকে, তাতে করে এমন একটা ধারণা বদ্ধমূল হয়ে গেছিলো হিকসস্দের মধ্যে যে, জলপ্রপাতের উপরে গ্যালি নিয়ে উঠে যাওয়া অসম্ভব। কাজেই, নিশ্চিন্ত মনে লুটপাট চালিয়েছে হিকসসেরা, সময় নষ্ট করেছে নিজেদের অজান্তেই।
রাজকুমার আর সমাধি-সম্পদের খোঁজে পুরো গজ-দ্বীপ তছনছ করেছেন স্যালিতিস। কিন্তু একটিবারের জন্যেও মুখ খুলেনি কেউ, আমাদের পলায়নের সুযোগ করে দেওয়ার জন্যে নীরব থেকেছে।
