পুরো অর্ধেক রাত তর্কাতর্কি শেষে আমি তাকে বোঝাতে সমর্থ হলাম, এই ধরনের নিরাসক্ত লোকেদের সাথে না নেয়াই বরঞ্চ আমাদের জন্যে ভালো। শেষমেষ, রানি লসট্রিস একটি প্রত্যাদেশ জারি করলেন যে, যার ইচ্ছে সে গজ-দ্বীপে থেকে যেতে পারে। তবে সেই ঘোষণায় নিজের কিছু ছাপও রাখলো আমার কর্ত্রী। গজ-দ্বীপের রাস্তায়-রাস্তায়, বন্দরে জোরে জোরে পঠিত হলো সেই ঘোষণা।
.
আমি, রানি লসট্রিস, এই মিশরের শাসক, রাজপুত্র মেমননের মাতা, দ্বৈত-মুকুটের একমাত্র উত্তরাধিকারী, এই মর্মে এই দেশের অধিবাসীদের কাছে আমার শপথ ব্যক্ত করছি।
সমস্ত দেবতাকে সাক্ষী রেখে শপথ করছি; শপথ করছি রাজপুত্রের জনপ্রিয়তার নামে এইখানে, এই গজ-দ্বীপে ফিরে এসে তাকে রাজার সিংহাসনে প্রতিষ্ঠিত করে দ্বৈত-মুকুট তার শিরে অর্পণ করবো, যাতে করে চিরকাল সুখ-শান্তিতে সে এই দেশের জনগণকে শাসন করতে পারে।
রানি লসট্রিস, এই মিশরের শাসনকর্ত্রী ।
.
এই ঘোষণার ফলে কয়েকগুন বেড়ে গেলো রানির জনপ্রিয়তা। আমাদের ইতিহাসে কোনো ফারাও এতো জনপ্রিয় ছিলেন বলে মনে হয় না।
অবশেষে, আমাদের সাথে যারা জলপ্রপাতের ওপারে অজানার উদ্দেশ্যে যাত্রাসঙ্গী হবে তাদের নামের তালিকা পেলাম। স্বাভাবিকভাবেই, রানির প্রতি অনুগত এবং চৌকষ লোকেরাই আসছে সাথে। যারা আসবেন না, তাদের আমরা রেখে যেতে পেরেই বরঞ্চ আনন্দিত। পুরোহিতদের একটা বড়ো দল এই শ্রেণীর অন্যতম।
পরবর্তীতে অবশ্য সময়ের নিরিখে প্রমাণিত হলো, গজ-দ্বীপে রয়ে যাওয়া জনগোষ্ঠী ভীষণ উপকারে এসেছিলো আমাদের। নিব্যাসনের বেশ ক বছরে এরাই মানুষের মনে রানি লসট্রিস, রাজকুমার মেমননের স্মৃতি জ্বালিয়ে রেখেছিলো। রানির ফিরে আসার প্রতিজ্ঞা কখনো ভুলে যায়নি তারা।
হিকসস্ শাসনের দীর্ঘ বছরগুলোতে মনের ভিতরে রাজকুমারের প্রত্যাবর্তনের আশা সুপ্ত রেখেছিলো তারা। একটা সময় পুরো মিশরে সেই প্রথম জলপ্রপাত থেকে মহান ডেল্টায়, নীল নদের সাতটি মুখ পর্যন্ত সবাই বিশ্বাস করতো একদিন ফিরে আসবে রাজপুত্র। তারই জন্যে প্রার্থনা করতে তারা প্রতিদিন।
৭. ঘোড়ার পাল
পশ্চিম তীরে ঘোড়ার পাল দেখাশোনা করায় একটুও গাফিলতি করেনি হই। প্রতিদিন সেখানে পরিদর্শনে যেতাম আমি আর মেমনন। ততোদিনে নিজের পছন্দের প্রাণীগুলোর নাম জেনে গেছে রাজপুত্র, ওর হাত থেকে খেতে শিখে গেছে ঘোড়াগুলো। একদিন সাহস করে ধৈর্য্যের পিঠে একা চড়ে ঘুরে বেড়ালো মেমনন।
আমাদের যাত্রাপথের পরবর্তী বাধা সম্পর্কে হুইকে অবগত করলাম আমি। জলপ্রপাত পেরুনোর ব্যাপারে ঘোড়াগুলোর ভূমিকা সম্বন্ধেও আলোচনা করলাম আমরা। হুই এবং রথ চালকদের দায়িত্ব দিলাম, ঘোড়ার হারনেস খুলে সেগুলোকে পিটিয়ে হালকা পাতের আকারে তৈরি করতে।
সুযোগমতো আমি আর ট্যানাস গিয়ে পরিদর্শন করে এলাম নদীর উজানে অবস্থিত প্রথম জলপ্রপাত। পানি এতো কম এখন সমস্ত ডুবো দ্বীপ দৃশ্যমান। কোনো কোনো জায়গায় এক মাথা সমান পানিও নেই। বহু মাইল পর্যন্ত বিস্তৃত সেই জলপ্রপাত উজ্জ্বল, জলের আচড়ে মসৃণ গ্রানাইটের খণ্ড আর সরীসৃপের মতো পিচ্ছিল জলের ধারা এঁকে-বেঁকে এগিয়ে গেছে সামনে। সামনে কী কাজ পড়ে আছে, দেখে এমনকি আমি পর্যন্ত নিরাশ হলাম। ওদিকে ট্যানাস তার স্বভাবগত শক্ত মানসিকতা বজায় রাখলো।
তলা না ফাটিয়ে এমনকি একটা ছোট্ট নৌকাও পার করতে পারবে না এখান দিয়ে। আর, পেটভর্তি মালামাল সহ একটা গ্যালি কী করে পেরুবে? তোমার সেই হতচ্ছাড়া ঘোড়ার পিঠে চড়ে? কর্কশ হাসি হেসে বললো সে।
গজ-দ্বীপের উদ্দেশ্যে ফিরতি পথে আমি বুঝলাম, গ্যালি ছেড়ে পায়ে হাঁটা ছাড়া জলপ্রপাত পেরুনোর আর কোনো উপায় নেই। এতে করে যে কী পরিমাণ কষ্ট হবে, তা বর্ণনাতীত তবে, একবার জলপ্রপাতের ওপারে চলে গেলে, নদী তীরে নতুন করে তৈরি করা যাবে নৌ-বাহিনী।
গজ-দ্বীপে পৌঁছেই রানিকে পরিদর্শনের ফলাফল জানাতে রাজপ্রাসাদে চললাম আমরা দু জন। সবকিছু শুনে মাথা নাড়লো লসট্রিস।
এতো তাড়াতাড়ি দেবী আমাদের ছেড়ে গেছেন এ আমি বিশ্বাস করি না, এই বলে, দ্বীপের দক্ষিণ অংশে হাপির মন্দিরে পুরো সভাষদ নিয়ে চললো সে, পূজো দিতে।
সারারাত ধরে প্রার্থনায় রত হলাম আমরা দেবী হাপি যেনো সঠিক পথ দেখান। কিছু ছাগল কোরবানী দিয়ে অথবা পাথুরে বেদীতে আঙুর ফল দান করে কোনো দেব দেবীর আনুকূল্য পাওয়া যায় এ আমি বিশ্বাস করি না; তথাপি সারারাত ধরে প্রধান পুরোহিতের সাথে আমিও প্রার্থনা করে চললাম। সকালে দেখি, পাথরের মেঝেতে বসে থেকে থেকে পাছা ব্যথা হয়ে গেছে!
সকালের প্রথম সূর্যরশ্মি যখন মন্দিরের ছাদ গলে মূর্তির বেদী আলোকিত করলো, নাইলোমিটারের সুড়ঙ্গে পাঠালো রানি আমাকে। শেষ ধাপ পর্যন্ত পৌঁছনোর আগেই দেখি গোড়ালি ডুবে গেছে!
হাপি আমাদের প্রার্থনা মঞ্জুর করেছেন। সময়ের বেশ ক সপ্তাহ আগেই বান ডেকেছে নীলের জলে ।
*
ঠিক যেদিন বান ডাকলো নীলের জলে, সেদিনই উত্তর থেকে বাতাসের গতিতে ছুটে এলো ট্যানাসের একটি প্রহরী গ্যালি। আবারো এগিয়ে আসছে হিকসস্ বাহিনী। এক সপ্তাহের মধ্যেই গজ-দ্বীপে চলে আসবে তারা।
সাথে সাথেই নিজের বাহিনী নিয়ে জলপ্রপাত প্রতিরক্ষায় ছুটলো ট্যানাস। লর্ড মারসেকেট এবং আমার উপর দায়িত্ব রইলো সমস্ত লোকজনকে জাহাজে উঠানোর। এইবার অবশ্য থিবেসের মতো এলোমেলো, ছত্রভঙ্গ অবস্থা হলো না। সঠিকভাবে এবং কম সময়ের মধ্যেই জলপ্রপাতের লেজের উদ্দেশ্যে পাল তুললো নৌ-বহর।
